লকডাউন ডায়েরি – ১২ এপ্রিল, ২০২০

১২.‌০৪.‌২০২০। রবিবার

ভোর ৪.‌১৪

হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল। কোনও স্বপ্ন–টপ্ন দেখে নয়। জাস্ট এমনিই। খানিকক্ষণ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ঝিরঝির করে হাওয়া দিচ্ছিল। কাছে বা দূরে কোথাও একটা কোকিল ডাকছিল। বহুদিন পর কোকিলের ডাক শুনলাম। রাতচরা কুকুরগুলোও ডাকছে না। ক্লান্ত হয়ে পড়েছে নিশ্চয়ই। চারদিক থমথম করছে। কোনও আওয়াজ নেই। সম্ভবত সেইজন্যই কোকিলের ডাকটা আরও তীক্ষ্ণ হয়ে কানে বাজছিল।

নিশুতির মধ্যে কোকিলের ডাকটা শুনে শীর্ষেন্দু’দার আত্মজৈবনিক উপন্যাসটার কথা মনে এল। সেখানে তিনি লিখেছিলেন ময়মনসিংহের বাড়িতে এক কোকিলের ডাকের কথা। লিখেছিলেন, ওইরকম প্রাণ হু–হু করে ওঠা ডাক তিনি আগে কখনও শোনেননি। আজও তাঁর মনে আছে সে ডাক। যেমন আমার মনে হচ্ছিল। হয়ত এই হাহাকার মেশানো ডাকটা আমারও আজীবন মনে থেকে যাবে। এই ভোররাত, এই নৈঃশব্দ্য, এই দমকা হাওয়া আর ওই কোকিলের ডাক একটা ফ্রিজ ফ্রেম হয়ে থেকে গেল জীবনে।

বারান্দার একেবারে গায়ে রাস্তার উপর একটা অতিকায় সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্প। ফটফট করছে আলো। বছর পনেরো আগেও এখানে একটা বিশাল নিমগাছ ছিল। হাওয়ায় মাথা দোলাত। ভারী ভাল লাগত। নিমগাছটার ঝাঁকড়া মাথায় আলোটা খানিক আড়াল হতো। গাছটা কেটে ফেলা হয়। তাতে বারান্দাটা উদোম হয়ে গিয়েছিল। তাই নিয়ে বাবা–মায়ের সঙ্গে বহু রাগারাগিও করেছি। আজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছিল, গাছটা না থেকে ভালই হয়েছে। অন্ধকারের সঙ্গে ভয়ের একটা অনুষঙ্গ আছে। অন্ধকারে গাছের ছায়া চিরে কোকিলের ডাকটা আর্ত চিৎকারের মতো শোনাত। সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পটা তা–ও খানিক আলো ছড়াচ্ছে। বোধহয় বলছে, এখনও পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়নি চারদিক।

সকাল ৯.‌১৩

করোনা সংক্রমণে মৃত্যুর সংখ্যায় ইতালিকে ছাড়িয়ে গেল আমেরিকা। কার্ভ অনুযায়ী দু’দেশ এখন প্রায় সমান সমান। কিন্তু মৃতের সংখ্যা আমেরিকায় বেশি। আরও বেশি হবে নিশ্চিতভাবে। কে জানে কোথায় গিয়ে থামবে এই মিছিল!‌

ইতালি বলতে মনে পড়ল, কাল একটা ফিচলেমি করেছি। গৌরবের স্ত্রী চৈতালির জন্মদিন ছিল। ফেসবুকে ওকে উইশ করতে গিয়ে হঠাৎ খেয়াল হল, ওর নামের ইংরেজি বানানের শেষ পাঁচটা অক্ষর মিলে ‘ইতালি’ হয়। শুভেচ্ছার সঙ্গে সেটাও লিখে দিলাম। বললাম, ‘এটা নিয়ে চিন্তা কোর না।’ খানিক পরেই গৌরবের জবাব এল, ‘এটা এই প্রথম রিয়ালাইজ করলাম!‌’ খুব একচোট হাসাহাসি হল।

ইয়ার্কি থাক। দুই মানবসন্তান এবং একটি ল্যাব্রাডর ‘সিম্বা’কে নিয়ে একে ওরা থাকে বিলেতে। যেটা এখন করোনার ডেন!‌ তার উপর গৌরব আবার ডাক্তার। ভাল থাক ওরা সকলে। সুস্থ থাক।

কাল গভীর রাতে বাবাইয়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা হল। অনেকদিন পর। পৃথিবীর কিছু গভীর বিষয় নিয়ে আলোচনা হল। যার মধ্যে অন্যতম নেটফ্লিক্সে সাম্প্রতিকতম হিট ওয়েবসিরিজ ‘মানি হেইস্ট’। বাবাইকে আমি ‘বাডি বলে ডাকি। বাবাইয়ের বয়স ১৬।

সকাল ৯.‌২০

আজ কি প্রধানমন্ত্রী আমাদের আরও দু’সপ্তাহের লকডাউনের গাইডলাইন দেবেন?‌ কে জানে!‌ মনে বড় চিন্তা। আজ মাসের ১২ তারিখ। উনি কি বলবেন, রাত ১২টায় ১২ মিনিট দেশবাসীকে নিঃশ্বাস বন্ধ করে রাখতে?‌ তাতে যদি করোনা ভাবে সকলে মরে গিয়েছে। তার আর ভারতে কোনও কাজ নেই। এই ভেবে হয়তো আশপাশের দেশে চলে গেল। যাহ্‌, এটা হতে পারে না। নেহাতই রসিকতা করছি। করেই ভয় হল। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে ফাজলামি করলে জেলে ভরে দেয় যদি?‌

সকাল ৯.‌২৮

সনৎ ফেসবুকে লম্বা স্টেটাস লিখেছে। অর্থাৎ, ওর দাঁতের ব্যথা সহ্যসীমার মধ্যে আছে। অর্থাৎ, আমার প্রেসক্রিপশন ওরও কাজে লেগেছে। গুড!‌

দুপুর ১২.‌৩১

আজ জম্পেশ করে গাড়ি ধুলাম। শুকনো লাল শালু দিয়ে যখন গাড়িটা মুছছি, একটা ছেলে তাকাতে তাকাতে গেল আর আমার ধাঁ করে ২০ বছর আগের ঘটনাটা মনে পড়ে গেল। সেদিনও এইরকম শর্টস আর একটা ল্যালব্যালে টি–শার্ট পরে এই বাড়ির সামনে ঠিক এইরকমভাবেই গাড়ি ধুচ্ছিলাম। একটি প্রায় সমবয়সী ছেলে এসে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কিছু বলছিল না। অস্বস্তি হচ্ছিল। জিজ্ঞাসা করে ফেললাম, কিছু বলবেন?‌ ছেলেটি বলল, ‘তুমি এই বাড়িতে গাড়ি ধোও?‌’
— হ্যাঁ। কেন?‌
‘আসলে আমার গাড়িটা ধোওয়ার একটা লোক খুঁজছি। তুমি কাজটা করবে?’
‌— হ্যাঁ। আপনি বললে করব। কোথায় থাকেন?‌ ‌কী গাড়ি আপনার?‌
‘এই তো দুটো গলি পরেই থাকি। মারুতি জেন গাড়ি। কত নেবে?‌’
— এই বাড়িতে তো মাসে ২০০ টাকা দেয়। আপনিও ওটাই দেবেন না হয়।
মনে আছে, ছেলেটা খুশি হয়ে ঠিকানা–টিকানা দিয়ে চলে গেল। যখন বাইরের রাস্তায় এই কথোপকথন হচ্ছে, তখন আমার পিতৃদেব বিস্ফারিত নেত্রে একতলার বারান্দায় স্থাণুবৎ দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁর করিতকর্মা পুত্রের সম্ভাব্য এমপ্লয়ার বিদায় নেওয়ার পর সম্বিত ফিরে পেয়ে গলা–টলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘এটা তুমি কী করলে?‌’ আমি একটা আমুদে হাসি হাসলাম। বিশ বছর আগে বাবার প্রতাপ দোর্দণ্ড ছিল।অনেকটা বাংলা সাদা-কালো ছবিতে কমল মিত্রের মতো। তাঁর দাপটে আমি এবং মা একই ঘাটে জল খেতাম। ফলে তিনি নিদান দিলেন, এই ধরনের বেয়াড়াপনা যেন আর না করি। পাড়ায় তো একটা মানসম্মান আছে!‌

তার পর থেকে রোজ গাড়ি ধোওয়ার সময় রিস্টওয়াচ পরে থাকতাম। যাতে ঘামে ভেজা টি–শার্ট আর শর্টস পরা থাকলেও আমাকে একেবারে চাকরবাকর মনে না হয়। এখন অবশ্য গাড়ি ধোলাইকারীদের হাতে বাহারি ঘড়ি থাকে। পকেটে স্মার্টফোন। আজ অবশ্য তেমন কোনও ভ্রান্তিবিলাস হয়নি। ছেলেটি সম্ভবত তাকাতে তাকাতে ভেবেছে, করোনার প্রকোপ কমলে এই মাঝবয়সীকে ‘কর্মবীর’ উপাধি দেওয়া যেতে পারে।

দুপুর ১.‌০০

গাড়ি ধোওয়া শেষের মুখে পাশের বাড়ির কাকিমার সঙ্গে দেখা হল। ছেলে–বউমা মুম্বইয়ে থাকে। এখানে উনি একা থাকেন। তার মধ্যে আবার হাত ভেঙে বসেছেন!‌ প্লাস্টার কাটার সময় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় কাটাবেন। এই করোনার বাজারে কে আর প্লাস্টার কাটতে সময় দেবে। সত্যি, এই মানুষগুলোর যে কী হবে!‌

দুপুর ১.‌১২

বাবা–মা’কে খেতে দিয়ে বাবার ঘরটা ভাল করে ঝাড়পোঁছ করলাম। বিছানা ঝেড়ে, তোয়ালে–টোয়ালে সব গুছিয়ে রাখলাম। এটা বেশ কিছুদিন ধরেই প্ল্যান করছিলাম। অবশেষে আজ হল। বাবার কিছু জামাকাপড় কাচতেও হবে। দেখলাম, বিস্তর বাজে জিনিস জমেছে ঘরে। সেগুলোকে বিদায় করতে হবে তাল বুঝে। বুড়ো টের পেলেই বেজায় আপত্তি করবে।

দুপুর ১.‌২২

বেশ তরিবত করে খেলাম। যাকে বলে ‘ভোজন’। যেমন রবিবারের দুপুরে খায় বাঙালি মধ্যবিত্ত। তফাতের মধ্যে বাঙালি খায় বড় বড় আলু দিয়ে পাঁঠার মাংসের ঝোল–ভাত। আর আমার মেনু নিকষ্যি ভেজ। আদি অকৃত্রিম ডালসেদ্ধ, ভাত, আলুসেদ্ধ আর ডিমসেদ্ধ। একটা কাঁচা লঙ্কা আর পেঁয়াজ থাকলে জমে যেত। কিন্তু লকডাউনের বাজারে ওসব বিলাসিতা না দেখানোই ভাল। খেতে খেতে মনে পড়ল, বিলেতে পড়াকালীন রোজ এই এক মেনু ছিল। মাসের পর মাস। কারণ, এছাড়া আর কিছু তখনও বানাতে পারতাম না। ফিরলাম যখন, মুখটা একটা পাঁচনম্বরী ফুটবলের মতো হয়ে গিয়েছিল। মিঠু এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে গিয়েছিল। একঝলক দেখে চিনতে পারেনি!‌

দুপুর ২.‌২১

একটু আগে অফিসে পৌঁছেছি। এইমাত্র ঢুকল বিপ্লব। ঢুকেই সটান আমার ঘরে এসে বলল, ‘বালি ব্রিজ হয়ে এলাম। ব্রিজের উপর থেকে দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গার ঘাটে ‌নজর করে দেখলাম, মানুষ তো দূরের কথা। একটা কাকও নেই!‌’ হতে পারে। তবে বিপ্লব প্র্যাকটিক্যাল জোক করতে ওস্তাদ। নইলে কি খুব সিরিয়াস মুখে জুনিয়র কলিগদের ভয় দেখিয়ে বলতে পারে যে, খবর পেয়েছে রাজ্য সরকার এরপর সকলের পিছনে জিপিএস ফিট করে দেবে। কে কোথায় যাচ্ছে, সব দেখা যাবে কন্ট্রোলরুম থেকে। লকডাউন ভাঙলেই জিপিএস ট্র্যাকার ধরে ফেলবে। তারপর তাদের কান ধরে সর্বসমক্ষে ওঠবোস করাবে পুলিশ। পারেও বটে!‌

আজ আর কাল নবান্নে স্যানিটাইজেশন হচ্ছে। ফলে দু’দিন রাজ্য প্রশাসনের সদর দফতর বন্ধ থাকছে।

রবিবার দিনটা অফিসে খুব চাপ থাকে। আজ এই এন্ট্রির পর যে আবার কখন লিখতে পারব কে জানে!‌

দুপুর ৩.‌০৫

সাঙ্ঘাতিক খবর। পাঞ্জাবের পাটিয়ালায় লকডাউন ভাঙায় বাধা পেয়ে একদল লোক এক পুলিশ অফিসারের একটি হাত তলোয়ারের এক কোপে নামিয়ে দিয়েছে!‌ তারপর ব্যারিকেড–ট্যারিকেড ভেঙে ঢুকেছে গিয়ে একটা গুরুদোয়ারায়। পুলিশ তারপর গুলির লড়াই চালিয়ে অ্যারেস্ট করেছে তাদের। আর পিজিআই চণ্ডীগড়ে অফিসারের কাটা হাত জোড়া দেওয়ার অপারেশন চলছে। এটারই ভয় পাচ্ছিলাম। এ হল লকডাউনের গাদ। এতদিন ধরে জমছে। এবার ফেটে পড়তে শুরু করেছে।

বিকেল ৫.‌৩৩

গগনে গরজে মেঘ!‌ কিন্তু ওই মেঘই শুধু। কথাই তো আছে, যত গর্জায় তত বর্ষায় না। ফলে অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ব্যাঙের মূত্র বিসর্জনের মতো ছিটেফোঁটা বৃষ্টিই দেখতে হল। অন্তত সল্টলেকের এই বিজন কোনে। তবে সামনের দীঘল ঘাসজমি থেকে উঠে আসা সোঁদা গন্ধটা নাকে এল। এই বাজারে সেটুকুই বা কম কী?‌ জনশ্রুতি, কলকাতার কিছু এলাকায় নাকি শিলাবৃষ্টি হয়েছে। আর উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার কিছু এলাকায় নাকি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। হতে পারে।

সন্ধ্যা ৬.‌০৬

রাজধানী দিল্লিতে ভূমিকম্প!‌ রিখটার স্কেলে মাত্রা ৩.‌৪। নট ব্যাড। ভূমিকম্পের উৎসস্থল ভূপৃষ্ঠ থেকে সাড়ে ৬ কিলোমিটার গভীরে। যাঁরা লকডাউনে বাড়িতে ছিলেন, তাঁরা প্রাণ বাঁচাতে হুড়মুড়িয়ে রাস্তায়। লোকজন প্রবল কনফিউজ্‌ড। বাড়িতে থাকবেন? না রাস্তায়?‌ দুর্ভাগ্য কখনও একা আসে না। ঠিকই।

সন্ধ্যা ৬.‌৩৫

তিন রাত আইসিইউয়ে কাটানোর পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন অবশেষে করোনা–মুক্ত হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছেন।

রাত ৯.‌০১

নরেন্দ্রপুরের এক ব্যাচ সিনিয়র শুভম’দা মেসেঞ্জারে একটা অ্যাটাচমেন্ট পাঠিয়েছে। খুলে দেখি, চমৎকার হাতের লেখায় একটা আন্তরিক চিঠি। ‘লকডাউন ডায়েরি’ নিয়ে। যে পাখিটা এসে দরজার কাচে ঠোকর মারছিল, তার একটা পরিচয়ও দিয়েছে। লিখেছে, ‘ ভাল কথা, সেই পাখিটা কি আর ফিরে এসেছিল ? কোনওভাবে ওটা কি রেড হুইস্কারড বুলবুল ( বাংলায় সিপাহি বুলবুল) ? আসলে এই মার্চ-এপ্রিল মাসটা রিটার্ন মাইগ্রেশনের সময়।অনেক আনইউজুয়াল পাখি দেখা যায়।’ সায়নের মতো শুভম’দাও বার্ড ওয়াচ করে। চিঠিটা একনিঃশ্বাসে পড়ে উঠলাম। বহুদিন পর হাতের লেখায় চিঠি। মেসেঞ্জারেই লিখলাম, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। আই শ্যাল ট্রেজার দিস।’

এক লহমায় জবাব এল, ‘ডিলাইটেড অ্যাজ ওয়েল অ্যাজ ওভারহোয়েলম্‌ড।’

রাত ৯.‌০৬

এ রাজ্যে পাবলিক প্লেসে নাক–মুখ ঢাকা বাধ্যতামূলক হয়ে গেল। একটু আগে এই মর্মে নির্দেশ জারি করল রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, মাস্ক পরতেই হবে। তবে মাস্ক মানে একেবারে ত্রিস্তরীয় সার্জিক্যাল মাস্ক বা এন–৯৫ গোছের হাই–ফাই ব্যাপার নয়। সাধারণ কাপড়ের মুখাবরনী হলেও চলবে। দোপাট্টা, রুমাল বা কোনও পরিষ্কার কাপড়ের টুকরো দিয়ে নাক–মুখ ঢাকলেও সমস্যা নেই। মুখ ঢাকা না থাকলে পুলিশ রাস্তা থেকে ধরে সটান বাড়িতে ফেরত পাঠাবে। সে যে–ই হোক।

আলটপকা শুনে ইয়ার্কি ভাবতে পারে কেউ কেউ। কিন্তু খুব সিরিয়াসলি মনে হচ্ছে, এবার বাজারে ডিজাইনার মাস্ক পাওয়া যাবে। বিভিন্ন বিখ্যাত গার্মেন্ট ব্র্যান্ড তৈরি করবে। করোনা চলে গেলেও তার কদর থাকবে। লোকে এমনিই পরবে। স্বাস্থ্য সচেতনতার জন্য। ‘পিঙ্ক’ ছবিতে দিল্লির কুখ্যাত দূষণ আটকাতে অমিতাভের চরিত্র যেমন মুখে একটা অভিজাত এবং দেখে ভক্তি হওয়ার মতো মাস্ক পরত। হয়তো কয়েকমাস পরে বিজ্ঞাপনী ট্যাগলাইন হবে, ‘পুজোয় চাই নতুন মাস্ক’।

শেষের লাইনটা কিন্তু বিশুদ্ধ ইয়ার্কি।

রাত ১০.‌২৬

আরও একটা দিন গেল। কাল ভোররাতেও কি পরিত্রাহী ডাকবে একলা কোকিলটা?‌

লকডাউন ডায়েরি – ১১ এপ্রিল, ২০২০

‌১১.‌০৪.‌২০২০। শনিবার

সকাল ৮.‌‌৩০

গতকাল যা লিখেছিলাম— বিশ্বে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়ে গেল। এই লাইনটা লিখেই মনে হল, ১ লাখ সংখ্যাটা কত সহজে লিখলাম। অথচ যে প্রসঙ্গে সংখ্যাটা লিখছি, সেটা আসলে লাশ গোনার সূচক। মানুষের লাশ। সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত এখনও পর্যন্ত ১৭ লাখ। তাঁরাও মানুষ। আমার মতো মানুষ।

সকাল ৮.‌৪৬

কাল বেশি রাতে ফেসবুকে সৌরভের পোস্ট পড়লাম। এ সৌরভ গাঙ্গুলি নন। কিন্তু গাঙ্গুলির চেয়ে কম ডাকাবুকো নন। এই সৌরভ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে লকডাউনের সময় শহরের বয়স্ক মানুষদের জরুরি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের ফোন নম্বরে দিনে কয়েক হাজার করে মদের হোম ডেলিভারির আর্জি আসছিল। ফলে বাধ্য হয়েই তাঁরা সরে এসেছিলেন। বেশ করেছিলেন!‌

কিন্তু কাল রাতের পোস্ট বলছে, সৌরভরা আবার তাঁদের কাজ শুরু করেছেন। বেশ করেছেন!

ফেসবুকে ‌একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও পোস্ট করে সৌরভ লিখেছেন, ‘গত ২৩ মার্চ থেকে চেনা–অচেনা কয়েকজন মিলে বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করেছি আমরা— কোভিড ১৯ মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি টিম, কলকাতার স্বেচ্ছাসেবী সদস্যরা। শুরুর দিকটা মসৃণ হলেও কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় অযাচিত অথচ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কিছু ঝঞ্ঝাট। কখনও পাশ কাটিয়ে, কখনও মাথা বাঁচিয়ে এগোনর পথটা মসৃণ ছিল না। থমকেছি। তবু থামিনি। থামব না।

‘না, আমাদের কোনও সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান নেই। হঠাৎ মিলে যাওয়া কিছু মননশীলতা আর এগিয়ে চলার শপথ নিয়ে যে পথচলা শুরু করেছিলাম, তা ধরে রাখার চেষ্টা করেছি আমরা এই ভিডিওটার মধ্যে। দেখবেন সময় করে। আর শহরের একাকী বৃদ্ধ–বয়স্ক মানুষগুলির কাছে আমাদের নম্বর পৌঁছে দেবেন পারলে। যতদিন লকডাউন চলবে, ততদিন আমরা বদ্ধপরিকর তাঁদের প্রয়োজনীয় ওষুধ তাঁদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে। শহরের যে কোনও প্রান্তে।

‘ফোন নয়। নীচের যে কোনও নম্বরে একটা মেসেজ করলেই আমরা পৌঁছে যাব। কথা দিলাম।

‌৯৮৩৬৮–৭০৪৫৬, ৬২৯০০–৬৮৩৬৪

কালকেই সৌরভের ভিডিওটার নীচে লিখেছিলাম, স্যালুট!‌ আজ এই ডায়েরিতে লিখছি, সাবাশ সৌরভ!‌ আপনারা যা করছেন, তার মূল্য আমি বুঝি, যার লকডাউনের দিনরাত কাটে এক নব্বই অতিক্রান্ত বৃদ্ধ এবং আশি–পেরোন বৃদ্ধাকে নিয়ে। এগিয়ে যান। একেই বলে না–থামার দাদাগিরি।

একটু আগে ক্যালকাটা টেলিভিশন নেটওয়ার্কে দেখছিলাম, কত সাধারণস্য সাধারণ মানুষ নিজেদের সাধ্যমতো মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করছেন। এত ভাল লাগল দেখে যে কী বলব!‌ মনে হল, এঁরাও তো আমাদের সমাজেই আছেন। ভাগ্যিস আছেন!‌

সৌরভ আর ওই মানুষগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে মনে হল, বিপর্যয় আসলে নিজস্ব হিরো খুঁজে নেয়। হিরো তৈরিও করে। সৌরভের মতো আপাত–সাধারণ মানুষরা বিপর্যয়–দুর্যোগের দিনে মানসিক উচ্চতার বশে আকাশ ছুঁয়ে ফেলেন। দেখে অবাক লাগে। ভালও লাগে। আর মনে হয়, ঝড় থেমে গেলে একদিন এই মানুষগুলোকে স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে এক মঞ্চে ডেকে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া যায় না?‌

সকাল ৯.‌৩৩

ব্যাঙ্ককের হাসপাতালে দু’টি সদ্যোজাত শিশুর মুখে ট্রান্সপারেন্ট প্রোটেক্টর পরানো ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল। বাইক চালানোর হেলমেটের ভাইজারের মতো ঢালের আড়ালে পুঁচকে দুটো মুখ। ঘুমোচ্ছে। জানেও না, কোন পৃথিবীতে এসে পড়েছে। কী দিন এল!‌

বেলা ১১.‌০০

মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স শুরু হল। মন দিয়ে দেখতে শুরু করেছিলাম বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর ফেসবুক লাইভে। কিন্তু কিছু পরেই ভোঁ–ভাঁ। কেস কী?‌

টিভি বলছে, রাজ্যের ৯–১০টা এলাকাকে ‘হটস্পট’ চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে আগামী ১৪ দিন পুরোপুরি লকডাউন চলবে। আসলে লকডাউনের বাবা— শাটডাউন!‌ ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। কেউ কোনওভাবেই বাড়ি থেকে বেরোতে পারবেন না। দোকান বাজার, রাস্তাঘাট সব বন্ধ। অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট এলাকার পুলিশের কন্ট্রোলরুমে ফোন করে জানাতে হবে। সিভিক ভলান্টিয়ার বা পুলিশ বাড়িতে জিনিস পৌঁছে দেবে। বিস্তারিত কিছু বলা হচ্ছে না। কিন্তু বৃত্তর জেলাগুলোর নাম দেখে মনে হচ্ছে, যে সমস্ত এলাকা থেকে করোনা–আক্রান্তের হদিশ মিলেছে বা মৃত্যু হয়েছে, মূলত সেসব এলাকা। সল্টলেকের কিছু এলাকাও তার মধ্যে রয়েছে। ঘটনাচক্রে, তার মধ্যে এইচবি ব্লক নেই।

রেকর্ডের খাতিরে লেখা থাক, ওই তালিকায় কলকাতার মধ্যে আছে আলিপুর, পন্ডিতিয়া রোড, মুদিয়ালি, ভবানীপুর, বড়বাজার। এছাড়া দক্ষিণ শহরতলির নয়াবাদ, উত্তর ২৪ পরগনার বেলঘরিয়া, দমদম (‌আংশিক)‌, হাওড়ার শিবপুর, নদিয়ার তেহট্ট, পূর্ব মেদিনীপুরের এগরা, পুরো হলদিয়া এবং পুরো কালিম্পং।

বেলা ১১.‌৩৯

টিভি–তে আবার ভিডিও কনফারেন্সটা ফিরে এসেছিল। মন দিয়ে একটু দেখতে না দেখতেই আবার হাওয়া। তবে এটা সম্ভবত লোকাল গোলমাল। দেখা যাক, কখন তাঁরা আবার ফিরে আসেন। আজ এখন অনেক কাজ। রান্না করা। পরপর সব বোতলে জল ভরা। ঘর ঝাঁট দেওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।

বেলা ১১.৪৫

ছেলেবেলার বন্ধু বাপি আর মিঠুকে ফোন করেছিলাম। ব্যাঙ্গালোর থেকে বাপ্পাও হোয়াট্‌সঅ্যাপে যোগাযোগ করল। ওদের সঙ্গে কথা বলার সময় ছোটবেলার দিনগুলো স্লাইডের মতো চোখের সামনে সরে সরে যাচ্ছিল। মূলত খেলার দৃশ্য। আমরা একসঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি ক্রিকেট খেলতাম। তখন ভেবেছিলাম, ক্রিকেট খেলে জীবনে বড় হব। তবে ক্রিকেটেরও আগে শুরু হয়েছিল ‘পিট্টু’। কেউ কেউ ‘সাতচারা’ও বলত। ৭টা চ্যাপ্টা ইটের টুকরো মাথায়–মাথায় বসিয়ে ফুটদশেক ‌দূর থেকে ক্যাম্বিস বল ছুড়ে একটা টিমের সব মেম্বারকে এক এক করে সেটা ভাঙার চেষ্টা করতে হবে। একেকজনের তিনটে করে চান্স। না পারলে ওয়ান ড্রপে কট আউট। কেউ না ভাঙতে পারলে অন্য টিম চেষ্টা করবে। যদি একটা টিম ভেঙে ফেলে, তাহলে তারাই আবার ওটাকে সাজিয়ে তুলবে। মিনটাইম, অপোনেন্ট টিম বল ছুড়ে পিট্টু গড়তে–থাকা টিমের লোকদের গায়ে মারার চেষ্টা করবে। গায়ে লাগলেই আউট। আর যদি গায়ে বল না খেয়ে পিট্টু গড়ে ফেলা যায় তাহলে যারা ভেঙেছিল তারা জিতবে।

এসব খেলা কি কেউ খেলে এখন?‌ কিম্বা মার্বেল বা গুলি?‌ পিট্টুটা চুটিয়ে খেললেও গুলি খেলিনি। পারতাম না। ঘুড়িও ওড়াতে পারতাম না। ঘুড়িটা মরসুমি ছিল। কিন্তু গুলি খেলাটা পাড়ায় এমন নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে, বেপাড়ার ছেলেরাও খেলতে চলে আসত। ঘরে ঘরে চিন্তা— পড়াশোনা ফেলে রেখে ছেলেগুলো সব গুলি খেলে দিন কাটাচ্ছে!‌ ‌বড়রা ময়দানে নামতে বাধ্য হল। পালের গোদাদের কিছু চড়চাপাটি মারতে মার্বেল শিল্প লাটে উঠল। শিল্পীরাও সুবোধ বালকের মতো আবার যার যার ঘরে ফিরে গেল।

দুপুর ১২.‌২২

অনেকদিন পর আজ দেবব্রত বিশ্বাস চালালাম। আর মেলট্রেনের মতো এসে সবেগে ধাক্কা মারল ছোটবেলা। বড়মামুর আনা ইপি রেকর্ডে প্রথম শোনা লোকটাকে। কেমন দেখতে, তা–ও জানতাম না। কিন্তু ভরাট, রাজকীয় গলাটা মাদকের মতো টানত যখন ভেসে আসত, ‘আমার যে দিন ভেসে গেছে, চোখের জলে..‌।’

ওপরের ড্রয়িংরুম ঝাঁট দিতে গিয়ে কিছু পাখির পালক পেলাম। ছোট ছোট। সম্ভবত চড়ুইয়ের। কিন্তু পালকের মালিকদের কোথাও খুঁজে পেলাম না। কোথা দিয়ে ঢুকল?‌ কী করেই বা ঢুকল?‌ আর গেলই বা কোথায়?‌ হাওয়ায় কি জানালা–টানালা খুলে গিয়েছিল?‌ একইভাবে কিচেনে খুঁজে পেলাম না একটা জলের বোতলের ছিপি। কোথায় যে গেল!‌ খোলা জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল না তো!‌

দুপুর ১২.‌৪৫

কেউ একজন গতকাল থেকে বাড়ির ল্যান্ডলাইনে ক্রমাগত ফোন করছেন। মায়ের কাছে মোবাইল নম্বর চাইছেন এবং পাচ্ছেন না। আজ সকালেও একবার করেছেন। রান্না করতে ব্যস্ত থাকায় ধরতে পারিনি। বলেছিলাম, ১০ মিনিট পরে করতে। করলেন একটু আগে। কথা হল। হাওড়ার বালি থেকে এক যুবক। খানিকটা অ্যাপ্রিহেনশন নিয়েই ফোন ধরেছিলাম। বললেন, ব্লগটা পড়ে খুব ভাল লাগছে। মোবাইল নম্বর না পেয়ে গুগ্‌ল ড্রাইভ থেকে এই ল্যান্ডলাইন নম্বর বার করে ফোন করেছেন সেটুকুই বলতে। কী কাণ্ড!‌ বললেন, ‘লকডাউন ডায়েরি’ নিয়মিত পড়েন। আগে ‘ইতি অনিন্দ্য’ও পড়তেন। সেটাই ফোন করে জানাতে চেয়েছিলেন শুধু। বললাম, লেখাটা তো আমার চাকরি। আমি সেজন্য বেতন পাই। ধন্যবাদ দিলাম তাঁকে। সঙ্গে একটু অনভ্যস্ততা আর অপ্রতিভতার ছোঁয়াও লেপ্টে রইল।

বেলা ২.‌০৭

একটা হিলেরিয়াস ফোন–কথোপকথন শুনলাম। সেটা লিখছি বটে। আসলে না লিখে পারছি না। কিন্তু কুশীলবের নাম লিখছি না। তাতে অবশ্য রস ক্ষুন্ন হবে না। এক বন্ধু (‌ধরা যাক তার নাম ‘ব’)‌ লকডাউনে বাড়িতে আটকে পড়ে অন্য বন্ধুকে (‌ধরে নিই তার নাম ‘অ’)‌ ফোন করছে। কারণ, একই অ্যাপার্টমেন্টে, অ–এর ফ্ল্যাটের ঠিক উপরে ব–এর ফ্ল্যাট। যা মূলত পার্টি করা ছাড়া লকডাউনে থাকে।
ব:‌ শোন্‌, একটা উপকার করবি?‌ সিকিউরিটির থেকে চাবিটা নিয়ে আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে প্লিজ মদের বোতলগুলোয় কিছু পড়ে আছে কিনা দেখবি?‌ তাহলে আজ বিকেলে যে করে হোক গিয়ে নিয়ে আসব।
অ:‌ ঠিক আছে। (‌কিছু পরে হাসতে হাসতে)‌ শোন্‌, দেখেছি। কিছু থুতু পড়ে আছে।
ব:‌ (‌মরিয়া গলায়)‌ ক’জনের থুতু?‌
অ:‌ ওল্ড মংকের বোতলে চার ড্রপ। টিচার্স তিন ড্রপ। এক বোতল ব্রিজার। আর বাকার্ডি আছে অল্প। ভদকাও আছে কয়েক ড্রপ।
ব:‌ (‌উল্লসিত)‌ বাকার্ডি আছে?‌
অ:‌ আছে।
ব:‌ ব্যস, ব্যস। ওতেই হবে। আসছি তাহলে বিকেলে।

দুপুর ২.‌২৮

গতকাল অর্ণবের পাঠানো ফিটনেস অ্যাপ এবং সোফায় সযত্নে গুটিয়ে–রাখা যোগা ম্যাটের কাছে করজোড়ে মার্জনা চেয়ে অফিসে রওনা হচ্ছি।

দুপুর ৩.‌৩০

প্রবল দাঁতব্যথা নিয়ে সনৎ অফিসে এসেছে। ওকে বিনাদ্বিধায় পেনকিলার–সহ আমার প্রেসক্রিপশনটা হোয়াট্‌সঅ্যাপ করে দিলাম। সদ্য সদ্য ফল পেয়েছি। বিশ্বাস তুঙ্গে এখন।

দুপুর ৩.‌৪৭

যা ভেবেছিলাম, সারা ভারতই ভেবেছিল, লকডাউন অন্তত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত থাকছে। অর্থাৎ, আরও ২ সপ্তাহ। কারণ, আগামী ১৪ দিনই নাকি সবচেয়ে ভাইটাল। ভিডিও কনফারেন্সের শেষে সমস্ত মুখ্যমন্ত্রীকে এমনই জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বেশ কয়েকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী (‌দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, কেরল)‌ আর্জি‌ জানিয়েছেন, এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত লকডাউন চলুক। যা বোঝা যাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হলেও লকডাউন চলবে। আগামী ২/‌৩ দিনের মধ্যে সেই গাইডলাইন জানিয়ে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। ৩০ এপ্রিল নাগাদ আবার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হবে। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সে মুখ্যমন্ত্রীদের বলেছেন, তাঁর ফোন সবসময় খোলা থাকে। দরকার পড়লে যে কোনও সময় যে কোনও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। বাংলার মুখ্যমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, লকডাউন চললেও জীবন ও জীবিকার মধ্যে সমণ্বয় রাখতে হবে।

বিকেল ৫.‌৩৫

কাল আর পরশু নবান্ন স্যানিটাইজ করা হবে বলে জানালেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশিই জানালেন, রাজ্যে ‘হটস্পট’ বলে কিছু নেই। গণ সংক্রমণ আটকাতে বিশেষ কিছু এলাকায় নজরদারি করা হচ্ছে। আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত রাজ্যে লকডাউন থাকবে। আগামী ১০ জুন পর্যন্ত স্কুল–কলেজ বন্ধ থাকবে। আসন্ন পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছাও আজই জানিয়ে দিলেন।

বিকেল ৫.‌৪৭

কোত্থেকে যেন সদ্য–ভাজা গরম গরম সিঙ্গাড়া আর গজা এসেছে অফিসে। লোভে পাপ। পাপে কোলেস্টেরল। কিন্তু আত্মাকে কষ্ট দিতে ইচ্ছে করল না। আর শুনেছি, উচ্চ তাপমাত্রায় কোভিড–১৯ মরে যায়। এ তো ফুটন্ত তেলে ভাজা হয়েছে!‌ তাহলে আর কীসের চিন্তা?‌ পেনকিলার খেয়ে চাঙ্গা হয়ে–ওঠা সনৎ বলল, স্যানিটাইজারেও ভাজা হয়ে থাকতে পারে। মোদ্দা কথা, খেয়ে ফেললাম। পয়সার জিনিস ফেলে দেওয়া ধর্মে সইবে না।

রাত ৮.‌৫৭

পেজ তৈরি। রিলিজ হবে কয়েক মিনিটে। আজকের মতো দোকান বন্ধ। কিন্তু সিঙ্গাড়া আর গজা সম্পৃক্ত একটা চোঁয়া ঢেকুর উঠল। অর্থাৎ, ডিনারের মেনু এক বোতল জল আর একটা অ্যান্টাসিড।

রাত ৯.‌৪৫

বেদম গরম ছিল সারাদিন। সকলে বলছিল, আজ নাকি কলকাতা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন অবশ্য একটা ভারী মিঠে হাওয়া দিচ্ছে। বাড়ি ফিরে অসমাপ্ত দেবব্রত আবার চালিয়েছি। আজকের মতো ডায়েরি বন্ধ করার সময় ভেসে আসছে, ‘তরঙ্গ মিলায়ে যায়, তরঙ্গ উঠে। কুসুম ঝরিয়া পড়ে, কুসুম ফুটে।’

লকডাউন ডায়েরি – ১০ এপ্রিল, ২০২০

১০.৪.২০২০। শুক্রবার 

সকাল ৮.১৫ 

অর্ণব মেসেজ  করল, ‘রোজ তোমার লকডাউন ডায়েরি পড়ি। দারুণ হচ্ছে, চালিয়ে যাও।’ অনেকদিন পর ওর সঙ্গে কথা হয়ে ভাল লাগল। অর্ণব আমার ব্যাডমিন্টন শুরুর প্রথমদিকের বন্ধু। গোলগাল চেহারা। কিন্তু কোমর ঘুরিয়ে একটা ব্যাপক ক্রসকোর্ট শট নিতে পারে। এক্সেলেন্ট! 

অর্ণব একটা ওয়ার্ক আউট অ্যাপও পাঠাল। বলল, ও আজ থেকেই শুরু করেছে। আমিও যাতে শুরু করে দিই। লজ্জায় ওকে আর বলিনি যে, দু’দিন আগে গাড়িতে রাখা ব্যাডমিন্টনের কিট ব্যাগ থেকে যোগা ম্যাট বের করে এনেছি। কিন্তু এখনও মাটিতে পেতে উঠতে পারিনি। রোজ সকালে উঠে একবার ম্যাটটার দিকে তাকাই। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলি, কাল থেকে মাস্ট! তারপর ছ’মাসে ঋত্বিক রোশন। গ্রিক গড। 

সকাল ১০.৫৮

আজ সকাল থেকে খুবই পরিশ্রম গেল। লকডাউনের সকাল কি এত ব্যস্ত যায় লোকের? বিশেষত আমার মতো অলস লোকের? একটু জিরিয়ে নিয়ে পরে আবার লিখছি। 

বেলা ১১.২৩

সকালে উঠে বাবা-মা’কে চা দিয়েই দৌড়েছিলাম চেতলা। আজকাল তো সবসময়ই ফুরফুরে রাস্তা। ‘মা’ ধরে চলে গেলাম। আজকালে জয়েন করার পর অনেকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘চেতলা থেকে সল্টলেক তো অনেক দূর! নিশ্চয়ই অনেক সময় লাগে যেতে?’ প্রশ্নকারীর দিকে বিজ্ঞের মতো তাকিয়ে গলায় সামান্য আবেগ মিশিয়ে বলতাম, ‘মেরে পাস মা হ্যায়।’ 

এখন লকডাউনের বাজারে ‘মা’ যাকে বলে ‘দিদিমা’য় পরিণত। স্পিড গান কাজ করছে কিনা জানা নেই। যাবতীয় কেসও বোধহয় লকডাউনে গিয়েছে। 

বঙ্কু কিন্তু একেবারেই বেড়ালের মতো আচরণ করছে না। ওর অভিমান হয়েছে। যা মার্জার সমাজে প্রত্যাশিত নয়। রুলবুক বলে, বাড়ির কুকুররা কৃতার্থ থাকবে গৃহকর্তার প্রতি। তাদের সেন্স অফ গ্র্যাটিটিউড অনেক বেশি। কুকুররা সবসময় কৃতার্থ থাকে। বেড়ালরা কৃতার্থ করে। তাদের হাবভাবটা হল — ‘বাড়িটা আমার। তোমায় দয়া করে থাকতে দিয়েছি।’

লবঙ্গ, ট্রাইপড এবং ইন্সটু (ভাল নাম ‘ইন্সটাগ্রাম’। পেয়ার সে লোগ উসে ইন্সটু কহতে হ্যায়) সারমেয় সমাজের নিয়ম মেনেই লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এল। কিন্তু বঙ্কুর দেখা মিলল না। পরে দেখা মিললেও সঙ্গ মিলছিল না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। একবার পাকড়াও করে কোলে নিলাম। বড় বড় চোখ পাকিয়ে এমন চিল চিৎকার শুরু করল, যে নামিয়ে দিতে হল। 

বাজারে গিয়ে বাচ্চাদের মাছ-মাংস নিয়ে এলাম। যাওয়া আসার পথে শুনলাম, মাইকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা চলছে। বিষয় : এখন কীভাবে বাজার করা উচিত। উনি কি সমস্ত পাবলিক প্লেসে কেমন ব্যবহার করা উচিত, সে ব্যাপারে এইরকম ছোট ছোট সাউন্ড ক্যাপসুল বানিয়ে বাজারে ছেড়েছেন? ব্যাপারটা কিন্তু উপকারী। খোঁজ নিয়ে দেখব তো। 

মাছের দোকানে দিব্যি ভিড়। কারও কোনও তাড়া নেই। বাজারু বাঙালির পদচারণা অলস। মুখ মাস্কবদ্ধ। মন সংকল্পবদ্ধ – সোশ্যাল ডিস্টান্সিং মানব না। 

একটা বোধিজ্ঞান লাভ হল। অধিকাংশ গ্রসারি অ্যাপ বা ফ্যাশনেবল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিন্তু এই লকডাউনের বাজারে ল্যাগব্যাগ করছে। বেঁচে আছে পাড়ার দোকান-বাজার। আমরা আবার সেই দিনগুলোয় ফিরছি, যখন বাজারে যেতে-আসতে পড়শির সঙ্গে দেখা হয়ে দুটো কুশল বিনিময় হত। এটা গুড। 

চেতলার কাজ সেরে সল্টলেকে ফিরে অদ্যাবধি দীর্ঘতম এন্ট্রি লিখলাম। এবার একটু বিশ্রাম না নিলেই নয়। বয়েস হচ্ছে তো।  

দুপুর ১২.০৮ 

চমৎকার টুইট করেছে তসলিমা। করোনা অতিমারী থেকে কী শিখলাম? 

১. ভগবান বলে কেউ নেই। 

২. শুধু মারণ ভাইরাসই নয়, ধর্মীয় মৌলবাদী ও ঈশ্বর ভক্তরাও মানবতার পক্ষে ঘোর বিপজ্জনক।

৩. দেশের সীমানা বলে কিছু হয় না। 

৪. আমেরিকা আর গ্লোবাল পাওয়ার নয়। 

৫. পৃথিবীর সকলেই আসলে একটি পরিবারের সদস্য – মানবিকতা। 

শুনেটুনে অনুত্তমা বলল, ‘৫ নম্বর পয়েন্টটা হতে পারতো,  পৃথিবীর সকলেই আসলে একটি পরিবারের সদস্য – করোনা।’ 

দুপুর ১২.২৪ 

এই রে ! লোডশেডিং হয়ে গেল তো। 

দুপুর ১২.২৫ 

এসে গেছে! এসে গেছে! যাক বাবা। তাই ভাবি, লকডাউনের মধ্যে আবার লোডশেডিং কীসের? নিশ্চয়ই ভুল করে নিভিয়ে দিয়েছিল। 

দুপুর ১.১৪ 

অনেকদিন পর দূরদর্শন দেখতে ইচ্ছে হল। দেখলাম, এতদিনেও নিজস্ব দর্শন থেকে দূরে যায়নি। ভরদুপুরে কীর্তন হচ্ছে। এক সুদর্শনা তরুণী এক গা গয়না পরে কপালে রসকলি এঁকে ভক্তিভরে গাইছেন। খোল, করতাল, বাঁশি বাজছে সঙ্গে। ভক্তিবিনম্র পরিবেশ। দু’টি কীর্তনের বিরতিতে গায়িকার সঙ্গে আলাপচারিতা হল সঞ্চালিকার। দেখলাম, গায়িকা কথাও বলেন কীর্তনের সুরেই। 

দুপুর ৩.২২ 

কীর্তন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল পরপর দুটো স্বপ্ন দেখে। ব্যাক টু ব্যাক।

প্রথম স্বপ্নের সময়টা সন্ধ্যাবেলা। চেতলার বাড়ির দিকে এগোচ্ছি। দেখলাম পুরো অ্যাপার্টমেন্টটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশের সমস্ত বাড়িতে, রাস্তায় আলো জ্বলছে। শুধু আমার বাড়িটা মনে হচ্ছে একটা অন্ধকার কাচের বাক্সের মধ্যে বসানো। সেই বাক্সের সিলিং থেকে বটের ঝুরির মতো ঝুলছে প্রচুর ইলেকট্রিক তার। দেখেই বুঝলাম, ওগুলো সিইএসসি-র তার। ছিঁড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ খুব তাড়াতাড়ি আর আলো জ্বলবে না। বিল্ডিংয়ে ঢুকে দেখলাম, চারদিকে কেউ কোত্থাও নেই। এমনকী, পার্কিংয়ে একটা গাড়ি পর্যন্ত নেই। চারদিকে ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে আছে। ঝাঁঝালো গন্ধ। বাড়ির দেওয়ালগুলো সব ভেজা ভেজা। বুঝলাম, স্প্রিংকলার থেকে কীটনাশক ছড়ানো হয়েছে। কারেন্ট নেই তাই লিফট চলছে না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হল, বাচ্চাগুলো কী করছে এই অন্ধকারে? তারপর একতলা আর দোতলার ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে একটা ইনক্রেডিবল দৃশ্য দেখলাম — লবঙ্গ স্পাইডারম্যানের মতো একলাফে দোতলা থেকে তিনতলায় উঠে গেল! তা প্রায় ১২ ফুট হাইট হবে।লবঙ্গ আর আগের মতো লতিকা নেই। গায়ে পেশির ঢেউ খেলছে। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ের রেলিংয়ে বসে ও ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো জ্বলছে। রেলিংয়ের অন্য পাশে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার মার্জার সন্তানেরা। দু’পায়ে। মাথার হ্যাট খুলে তারা লবঙ্গকে অভিবাদন জানাচ্ছে। 

সেখান থেকে কী করে যেন অফিসে চলে এলাম। তখন আবার দুপুর। দেখলাম অফিসটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। স্কুলের ক্লাসের মতো ডিপার্টমেন্ট। পিঠোপিঠি ডেস্ক। কিন্তু সেগুলো একেবারে ছোটবেলার ইস্কুলের মতো। টেবিলের সঙ্গে বেঞ্চি জোড়া। সে বেঞ্চির তলা থেকে জলহস্তী মুখ হাঁ করলে যেমন আকার হয়, সেই গোছের একটা ট্রে বেরিয়ে আছে। তবে খুব ছোট। তার মধ্যে রাখা ক্যালকুলেটরের সাইজের ল্যাপটপ। আমি তো দেখে হাঁ ! সমস্যা হল, কিছুতেই ঢুকতে পারলাম না ডেস্কটার মধ্যে। পা-ফা অ্যাডজাস্ট করে অনেক চেষ্টা করলাম। তা-ও হল না । তখন পীতাম্বরকে বললাম, ‘আমাকে তো অন্য জায়গায় বসতে হবে’। পীতাম্বর বলল, ‘ তাহলে চলুন, আপনি ওইদিকটায় বসবেন’। বলে আমাকে ঘরটার কোণায় নিয়ে গেল। সেখানে দেখি একটা হেভি কেতার কাঠের তিনকোণা কর্নার টেবিল। চকচকে ব্রাউন রঙের। কিন্তু সাইজে আমার মতোই বেঁটে। তার দু’পাশে দুটো গদি আঁটা রাশভারি চেয়ার। তাদেরও বাদামি রঙের কায়দার হাতল। অনেকটা সোফা সোফা দেখতে। কিন্তু এত নীচু টেবিলে কম্পিউটার রেখে কাজ করব কীভাবে? স্পন্ডিলোসিস হয়ে যাবে তো! ততক্ষণে দেখি আমার এক্সটেনশন টেলিফোনটা নিয়ে শত্রুঘ্ন আসছে। ওকে বললাম, ‘এইটুকু টেবিলে কোথায় টেলিফোন রাখব?’ ও বলল , ‘ ওটা কোনও ব্যাপার না স্যর। দেওয়াল থেকে ঝুলিয়ে দেব।’ 

যতক্ষণ ওরা ওসব করছে, ততক্ষণে আমি আবার দোতলায় গেলাম। সেখানে দেখলাম প্রচুর ভিড়। তার মধ্যে অনির্বাণ মজুমদার কেপ্রি আর টি-শার্ট পরে কার সঙ্গে একটা কথা বলছে। ওকে বললাম, ‘কী রে, ডিপার্টমেন্টে যাবি না?’ ও মুচকি হেসে বলল, ‘এই একটু অগ্নিদার পেছনে লেগে নিই।’ 

ঘুম ভেঙে গেল।

বিকেল ৪.৩৭ 

টেলিগ্রাফ একটা স্টোরি করেছে দেখলাম, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সেক্স ডিটারমিনেশনের ওপর ব্যান তুলে নেওয়া হল। ওসব ডকুমেন্ট সামলানো, রিপোর্ট পাঠানোর লোকের অভাব বলে নাকি এই সিদ্ধান্ত। এই ঘটনা ঐতিহাসিক। গোবলয়ের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই পাপ এতদিন গোপনে করা হতো। এখন আর সেই আড়ালটুকুও থাকবে না। 

সন্ধে ৬.৫২ 

যদি কোনওদিন লকডাউন ওঠে, যদি কোনওদিন ভারতের বাইরে বেরোতে পারি আবার, তাহলে ওই লোকটাকে ইন্টারভিউ করবই। আর ইন্টারভিউয়ের শেষে গলা জড়িয়ে গালে একটা চুমুও খেয়ে আসব। ওই যে লোকটা নিজের দেশ ফ্রান্সে লকডাউনের ফলে সিগারেট না পাওয়ায় হেঁটে পাশের দেশ স্পেনে যাচ্ছিল। প্রথমে গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছিল। পুলিশ চেকপোস্টে গাড়ি আটকে দেওয়ার পরেও দাবায়ে রাখা যায়নি। গাড়ি সেখানেই ফেলে রেখে হেঁটে পিরেনিজ পর্বতমালা পেরিয়ে স্পেনের দিকে যাচ্ছিল। মাঝপথে ঝর্নায় ভেসে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলে। তারপর নিজেই ইমারজেন্সি সার্ভিসে ফোন করে উদ্ধারকারী দলকে ডাকে। তারা হেলিকপ্টার নিয়ে এসে উদ্ধারও করে। সঙ্গে লকডাউন ভাঙায় ১৩৫ ইউরো জরিমানা। 

এ যদি চরিত্র না হয়, চরিত্রটা কে? চ্যাম্পিয়ন লোক। এদের জন্যেই বোধহয় লেখা হয়েছিল, ‘নশা শরাব সে হোতা তো নাচতি বোতল।’ একেই বলে ফ্যাশনের দেশের প্যাশন। 

রাত ৯.১৫ 

এখনও পর্যন্ত ভারতে আক্রান্ত ৬,১৯২। মৃত ২২৯। সারা পৃথিবীতে মৃত্যু, ৯৮,৩৮৭। আর দু’একদিনে শেষ সংখ্যাটা লাখ ছাড়াবে। 

রাত ১০.০২ 

কালই পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে লকডাউনের ভাগ্য। কাল বেলা ১১টা নাগাদ দেশের সব মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স শুরু। লকডাউন উঠবে যে না , তা এখনই লিখে দেওয়া যায়। প্রশ্ন হল, কী ফর্মে থাকবে। 

রাত ১০.২১ 

হর্ষ গোয়েঙ্কা টুইট করেছেন, ‘আজ থেকেই লং উইকএন্ড শুরু হয়ে গেল। 

১০.৪.২০ – শুক্রবার, গুড ফ্রাইডে। 

১১.০৪.২০ – শনিবার। 

১২.০৪.২০ – রবিবার, ইস্টার সানডে। 

১৩.০৪.২০ – সোমবার, বৈশাখী।  

১৪.০৪.২০ – মঙ্গলবার, আম্বেদকর জয়ন্তী।

আমি যে কী অসম্ভব ব্যস্ততায় কাটাব। কত কিছু যে করার আছে — কিছু কাজের ফোন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। নেটফ্লিক্স। খাওয়া। ঘুম। আর তারপর সবচেয়ে জরুরি কাজ —- যেগুলো বললাম, সবক’টা রিপিট। লং উইকএন্ড আজ শুরু হল? নাকি চলছে?’

ঠিকই। লং উইকএন্ড এখন রেকারিং ডেসিমেল। 

লকডাউন ডায়েরি – ৯ এপ্রিল, ২০২০

০৯.‌০৪.‌২০২০। বৃহস্পতিবার

সকাল ৭.‌৫৭

কাল রাতে বাড়ি ফিরে চমকে গিয়েছিলাম। দেখি, একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়িতে আমার এক জোড়া ব্রাউন লোফার খুব পরিপাটি করে রাখা আছে। কিন্তু যতদূর মনে পড়ছে, বেরোনর আগে ওটা দোতলা আর তিনতলার ল্যান্ডিংয়ে জুতোর র‌্যাকের উপর রাখা ছিল। নীচে এল কী করে!‌ এ কি গুপি–বাঘার জুতো হয়ে গেল নাকি? লকডাউনের বাজারে তেমন হলে মন্দ হয় না। কিন্তু সত্যজিৎ তো আর নেই। জুতো আসবে কী করে!‌ মা’কে জিজ্ঞাসা করলাম। মা একচিলতে হাসিমাখা বিরক্তি নিয়ে বলল, ‘আর বলিস না!‌ তোর বাবা দোতলা থেকে নিয়ে এসেছে। কত করে বারণ করলাম। কে শোনে কার কথা!‌’

রহস্য গেল। কিন্তু একটু মনও খারাপ হল— ভূতের রাজার জুতো পাওয়া হল না। কিন্তু আসলে হল গভীর চিন্তা। বুঝতে পারলাম, বাবার ডিমেনশিয়াটা অবশেষে সেট ইন করছে। কয়েকমাস আগেই জুতো কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল। গাড়ি করে নিয়ে গিয়ে পছন্দসই জুতো কিনেও দিলাম। পায়ে দিয়ে শিশুর মতো খুশি হল। দোকান থেকে নতুন জুতো পরেই বাড়ি ফিরল। বাড়িতে থাকলেও সে জুতো এখন কোথায় লাট খাচ্ছে কে জানে!‌ কিন্তু তারপরেও আবার আমার জুতো কেন নিয়ে এসেছে?‌

আজ সকালে চা দিতে গিয়ে উদ্বেগটা বাড়ল, যখন বাবা সটান প্রশ্ন করল, ‘তোমার জুতোটা কোথা থেকে কিনেছো?‌ কত দাম নিয়েছিল?‌ আমাকে ওই জুতোটা কিনে দেবে?‌’ বললাম, তোমাকে যে জুতো কিনে দিয়েছিলাম সেগুলো কী হল?‌ বাবা একটা দুষ্টু হাসি হেসে বলল, ‘আছে তো। কিন্তু ওটা তো কালো রংয়ের। এটা ব্রাউন। তাই এইরকম একটাও চাই।’

নবতিপর এই শিশুকে কী বলব?‌ লকডাউন বোঝাতে গেলে বুঝবে?‌ কে জানে!‌

সকাল ৮.‌৩৩

আমাকে কি ধীরে ধীরে কামারপুকুরের গদাধর চট্টোপাধ্যায়ের মতো দেখতে হয়ে যাচ্ছে?‌ ইদানীং ব্যাডমিন্টন–চর্চা রহিত ঈষৎ পৃথুল চেহারা। সামনে টেনে এনে কপালের খানিকটা ঢাকা দেওয়া ক্রমহ্রাসমান চুল। গালের দাড়িটা অবশ্য এখনও অতটা বাড়েনি। তবে অতীত বলছে, সময় দিলে হয়ে যাবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এই লুকটা সিরিয়াসলি ট্রাই করার কথা ভাবছিলাম। আয়নার আমিটা খ্যাক–খ্যাক করে হেসে বলল, লাগছে তো সদ্য ডিম ফেটে বেরোন উস্কোখুস্কো মুরগিছানার মতো। তার আবার এত স্টাইল আর লুক। হাঃ!‌

সকাল ৮.‌৪৫

কাল রাতে ডায়েরি পাবলিশ করতে একটু রাত হয়ে গিয়েছিল। মেসেঞ্জারে একের পর এক মেসেজ। কিছু উদ্বিগ্ন হোয়াট্‌সঅ্যাপ— ডায়েরি কোথায়?‌

এ তো উইথড্রয়াল সিম্পটম রে ভাই!‌ নিজেকে কেউকেটা মনে হচ্ছিল। ভাবছিলাম, ওরে, তোর ডায়েরি তো হিট!‌ তারপরেই ভিতরের আমিটা চোখ রাঙিয়ে বলল, ‘বেশি লেজ নাড়াস না। লোকের এখন অখণ্ড অবসর বলে এত পাত্তা দিচ্ছে। লকডাউনটা খুলুক। ডায়েরি–ফায়েরি কোথায় হুশ করে উড়ে যাবে দেখাও যাবে না।’

দিন শুরু হল ফিল্মমেকার বিকাশ খান্নার একটা টুইট দেখে এবং একা একা হেসে। লিখেছে, ‘আই রোট দিস অন মাই ফ্রিজ অন বিহাফ অফ মাই ফ্রিজ।’ সঙ্গে ফ্রিজের গায়ে লটকানো একটা নোটের ছবি। তাতে লেখা, ‘ইউ আর নট হাংরি। ইউ আর জাস্ট বোর্‌ড। ডোন্ট টাচ মি— রেফ্রিজারেটর।’

সকাল ৯.‌০৩

দেখলাম কলকাতা শহরের প্রথমসারির ডাক্তাররা নিজেদের মতো করে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা ক্যাম্পেন শুরু করেছেন— ‘টেস্টিং টেস্টিং অ্যান্ড টেস্টিং’। যার মোদ্দা কথা, আরও বেশি করে করোনাভাইরাস টেস্ট করাতে হবে। ক্রমাগত পরীক্ষা করে যেতে হবে। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের অনেকেই একটি পোস্টার শেয়ার করেছেন। তাতে লেখা— ‘আজ বা কাল ধাপে ধাপে লকডাউন শিথিল করা হবে। তখন যাতে আমরা এবং আমাদের প্রিয়জনরা বাইরের পৃথিবীতে নিরাপদ থাকতে পারি, সেটা দেখা জরুরি। সেটা নিশ্চিত করার একমাত্র উপায় হল এখনই র‍্যানডম টেস্ট শুরু করা। ক্লাস্টার টেস্টিং হলে কিট্‌স বাঁচানো যাবে। কিন্তু কম হারে টেস্ট করানো হলে কড়াকড়ি উঠে গেলে আবার প্রবল সংক্রমণের ঢেউ আসার সমূহ সম্ভাবনা। সো, টেস্টিং টেস্টিং অ্যান্ড টেস্টিং।’ ডাক্তার অর্জুন দাশগুপ্ত তাঁর ওয়ালে এই মর্মে চিকিৎসক কুণাল সরকারের একটি ভিডিও–ও শেয়ার করেছেন।

ডায়েরিতে এই তথ্যটা লেখা থাকা জরুরি। অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতের জন্য। ইতিহাসের জন্য।

সকাল ১০.‌৩০

এইমাত্র প্যাঁ করে একটা টেক্সট মেসেজ ঢুকল। পাঠাচ্ছে জনৈক বিএইচ–অঙ্কিতা। ‘ভালো বন্ধু বা বান্ধবী পেতে যোগাযোগ করুন (‌+‌২০)‌।অফিসে আসে।’ সঙ্গে তিন–তিনটে মোবাইল নম্বর। এ কি লকডাউনে অফিস ডেলিভারি?‌ কারণ, এ জিনিসের তো আর হোম ডেলিভারি সম্ভব নয়। আরও একটা প্রশ্ন মাথায় এল, আমাকে কি বাই সেক্সুয়াল ভাবল?‌ নইলে ‘বন্ধু বা বান্ধবী’ লিখল কেন?‌ তারপর মনে হল, নাহ্‌, তা নয়। বাল্ক এসএমএস পাঠিয়েছে তো। যার যা লাগে।

সকাল ১০.‌৫১

আজ আবার ব্রাঞ্চ। টপ রেমন খেলাম। লাঞ্চ স্কিপ করলাম। অভ্যেস বদলে যাচ্ছে। সাহেব হয়ে যাচ্ছি নাকি?‌ রোদে দাঁড়িয়ে গায়ের রংটা একবার ভাল করে দেখতে হবে তো!‌

দুপুর ৩.‌২০

অফিসে পৌঁছে প্রথমেই দেখলাম, ওডিশা সরকার লকডাউন বাড়িয়ে দিচ্ছে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত। ১৭ জুন পর্যন্ত রাজ্যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হবে। উত্তরপ্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের পর ওডিশাতেও মাস্ক বাধ্যতামূলক করা হল। এটা এনাফ হিন্ট যে, লকডাউন নিয়ে সারা দেশও ওডিশার পথেই হাঁটবে। অর্থাৎ, ১৪ তারিখ লকডাউন না ওঠা প্রায় নিশ্চিত। সার্বিক লকডাউন থাকবে?‌ নাকি ধাপে ধাপে শিথিল করা শুরু হবে?‌ সেটাই দেখার। সেটা অবশ্য ১৪ তারিখের আগেই জানা যাবে নিশ্চিত। ফলে এখন যা দাঁড়াল, ১৪ তারিখেই ‘লকডাউন ডায়েরি’ লেখার শেষ হবে বলে যে ভেবে রেখেছিলাম, তা হবে কিনা, তা নিয়েও একটা মহান অনিশ্চয়তা দেখা দিল। সার্বিক লকডাউন জারি থাকলে কি ডায়েরি লেখাও সেই অনুযায়ী বাড়াব?‌ সার্বিক লকডাউন উঠে গিয়ে আংশিক থাকলে ডায়েরি লেখা জারি থাকবে? ‌নাকি লকডাউন নিয়ে যে সিদ্ধান্তই হোক, ডায়েরি আর লিখব না?‌ এটা ভেবে দেখতে হবে। গভীর চিন্তার বিষয়। সিপিএম হলে নিশ্চয়ই পলিটব্যুরো মিটিং ডাকত। আমার বুড়ো আমি একাই। দেখা যাক কী হয়।

ওহ্‌ আরেকটা কথা। অফিসে আসার আগে বারান্দার কড়া রোদে দাঁড়িয়ে দেখলাম, সেই কালোমানিকই আছি। গায়ের সাহেবি রংটা বোধহয় ওয়াশরুমের আয়নায় টিউবলাইটে অপটিক্যাল ইলিউশন ছিল।

দুপুর ‌৩.‌২৩

অফিসে সুরজিৎ’দার সঙ্গে দেখা হল। সাতের দশকের হিরো ফুটবলার মুখে মাস্ক পরে কেমন বাধ্য ছেলের মতো ঘুরছেন। দেখা হলেই কুশল প্রশ্ন করেন। আজও করলেন। আমার আবার মনে পড়ল ঘটনাটা। ক্লাস সেভেনে নরেন্দ্রপুরের রথযাত্রা লিগের ফাইনালে ৩–১ গোলে জিতলেও একটা গোল হজম করে ঝরঝর করে মাঠেই কেঁদে ফেলেছিলাম। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি বলেছিলেন, ‘একটা বাচ্চা গোলকিপার ম্যাচ জিতেও একটা গোল খেয়ে খুব কান্নাকাটি করছে দেখলাম। ওকে বলছি, সব ম্যাচে হারজিৎ থাকে। তোমরা জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছো। সেটা ভাবো। একটা গোল খাওয়াটা বড় করে দেখো না। এখনও অনেক ম্যাচ খেলা বাকি।’

অনেক পরে অশোক’দার আমন্ত্রণে ‘খেলা’ পত্রিকার জন্মবার্ষিকীতে ডাবল উইকেট টুর্নামেন্টের মাঠে আলাপ হওয়ার পর সুরজিৎ’দাকে ঘটনাটা বলেছিলাম। স্বভাবতই ওঁর মনে ছিল না। থাকার কথাও নয়। ঘটনাচক্রে, তুলনায় দুর্বল পার্টনার নিয়েও সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠে হেরে রানার্স হলাম। বিপক্ষ চ্যাম্পিয়ন টিমের জুড়ির একজনের নাম ছিল স্নিগ্ধদেব সেনগুপ্ত। তার বাবার নাম সুরজিৎ সেনগুপ্ত। তবে সেদিন আর কান্নাকাটি করিনি।

দুপুর ৩.‌৫৮

বিপ্লব বলছিল, লকডাউনের কারণে রিকশা আর টোটোচালকদের জীবিকা বদলে গিয়েছে। সকলে ঘরবন্দি। সওয়ারি নেই। ফলে পেটের দায়ে তারা এখন ভ্যান রিকশা চালিয়ে বাড়ি বাড়ি সব্জি নিয়ে যায়। ভাল স্টোরি। তেমন হলে এটাই সম্ভবত করোনার কারণে প্রথম আর্থ–সামাজিক বদল।

বিকেল ৫.‌‌১৯

নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী–সহ রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের সঙ্গে বণিকমহলের বৈঠক চলছে। লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে। তার আগে ভিডিও প্রেস কনফারেন্স হয়েছে। যেটুকু শুনতে পাচ্ছিলাম, একদিনে পশ্চিমবঙ্গে করোনা আক্রান্ত হয়েছেন ১২ জন। এখন আক্রান্তের সংখ্যা ৮০। করোনা নিয়ে ডেটা অ্যানালিসিস সেল গঠন করেছে রাজ্য সরকার। আরও যা যা হওয়া উচিত।

এই বিকেল ৫.‌১৯ মিনিট পর্যন্ত ভারতে আক্রান্ত ৫,৪৮২ জন (‌আজ পজেটিভ এসেছে ৩২১ জনের রিপোর্ট)‌। মৃত ১৮৬ (‌আজ ৮ জন)‌। সুস্থ হয়েছেন ৫৬৯ জন। আর সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত ১১,০৩,২৬৯ জন। মৃত ৮৯,৪২৬ জন। সুস্থ হয়েছেন ৩,৩৭,২৭৬ জন।

এই পরিসংখ্যান দেখতে দেখতেই একটা হোয়াট্‌সঅ্যাপ ঢুকল। খুলে দেখলাম একটা পেন্টিংয়ের ছবি। যেটা দেখে ধাঁ করে মাথাটা ঘুরে গেল। অধুনা দিল্লিনিবাসী শিল্পীকে মেসেজে তখনি প্রশ্ন করলাম, এই ছবিটা কি ওঁর অনুমতিসাপেক্ষে আমার ব্লগে ব্যবহার করতে পারি?‌ দীপা দাশমুন্সি জবাব দিলেন, ‘স্বচ্ছন্দে। মাই প্লেজার।’ রায়গঞ্জে হেরে যাওয়ার পর থেকেই প্রিয়’দার ঘরনি তথা প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সিরিয়াসলি বড় ক্যানভাসে তেলরঙে ছবি আঁকা শুরু করেছেন বলে শুনেছিলাম। যা দেখলাম, করোনা এবং তজ্জনিত লকডাউনের অবসর তাঁর স্কিলকে প্রায় এক অবিশ্বাস্য পর্যায়ে পৌঁছে দিয়েছে। দীপার প্রতি কৃতজ্ঞতা–সহ আজকের ডায়েরির কভারে তার নমুনা রইল।

সন্ধ্যা ৭.‌৩২

ধারাভির প্রায় ৭ লক্ষ বাসিন্দার র‌্যাপিড করোনা টেস্ট করানোর সিদ্ধান্ত নিল মহারাষ্ট্র সরকার। আনানো হচ্ছে ১ লক্ষ র‌্যাপিড টেস্ট কিট। এই সিদ্ধান্ত, এককথায় যুগান্তকারী। ‘হটস্পট’ বলে চিহ্নিত করে দিল্লির ময়ূরবিহার, বেঙ্গলি মার্কেট, দ্বারকা এবং লাগোয়া উত্তরপ্রদেশের নয়ডার সেক্টর ফাইভ পুরোপুরি সিল করে দেওয়া হল।

কলকাতায় নাগেরবাজারে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক করোনায় আক্রান্ত। তাঁকে আপাতত আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আক্রান্ত বাবা–মায়ের চিকিৎসা করার সূত্রেই সংক্রমিত হয়েছেন ওই চিকিৎসক।

রাত ১০.‌১১

ট্রাম্পের টাকা না দেওয়ার হুমকিতে কিন্তু কেবলে গিয়েছে ‘হু’। সংস্থার প্রধান বলেছেন (‌আসলে মিনতি করেছেন), ‘কোভিডের রাজনীতিকরণ করবেন না। এখন দরকার সকলের মধ্যে ঐক্য। তাহলেই একমাত্র করোনভাইরাসের মোকাবিলা করা সম্ভব।’ ওহ্‌, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এখনও আইসিইউ–তে। তবে তাঁর অবস্থার খানিক উন্নতি হয়েছে।

রাত ১০.‌৩৪

একটি ইতালীয় সেন্স অফ হিউমার দিয়ে আজকের ডায়েরি লেখা বন্ধ করি। সেই ইতালি, যেখানে এখনও পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে মৃতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এটা পড়েও একা একাই হাসলাম।

‘এটা সত্যি যে আমরা, ইতালীয়রা এখন খুব কঠিন অবস্থায় আছি। কিন্তু বলুন তো এ জিনিস আর কোন দেশে পাবেন, যেখানে ডাক্তারদের অ্যাপ্রন সেলাই করছে আরমানি। রেসপিরেটর তৈরি করছে ফেরারি। ফেস মাস্ক তৈরি করছে গুচ্চি আর স্যানিটাইজিং জেল বানাচ্ছে বুলগ্যারি।

উই মে এন্ড আপ ইন হেল, বাট ইন স্টাইল!‌’

‌লকডাউন ডায়েরি – ৮ এপ্রিল, ২০২০

৮.‌০৪.‌২০২০। বুধবার

দুপুর ১২.‌১১

সকাল থেকে কিছু লিখিনি আজ। কিছু লেখার ছিলও না বিশেষ। নতুন কিছু ঘটলে তো লিখব। চারদিকে সেই হাহাকার। কাঁহাতক আর লেখা যায়!‌

আজ সকাল থেকে বাইরে রোদের তেজ কিছু কম। কিছু বাতাস বইছে এলোমেলো। অন্য সময়ে এগুলো কি চোখে পড়ত?‌ গায়ে লাগত?‌ বোধহয় না। এখন পড়ছে। কারণ, চারদিকে পৃথিবীতে বাকি কোথাও কোনও হেলদোল নেই। সকাল থেকে গুরু দত্তের ছবির গান শুনলাম। শুরু হয়েছিল ‘হাম আপ কি আঁখো মেঁ ইস দিল কো বসা দে তো?‌’ প্রশ্ন দিয়ে। একটু আগে শেষ হল ‘অ্যায় দিল হ্যায় মুশকিল জিনা ইঁয়াহাঁ’ দিয়ে।

অন্ধ্রপ্রদেশে এক দম্পতির যমজ সন্তান হয়েছে। নাম রাখা হয়েছে করোনাকুমার এবং করোনাকুমারী। পারেও লোকে!‌

দুপুর ১.‌১২

আজ থেকে চ্যানেলে–পোর্টালে অনলাইন ক্লাস শুরু হল। অনলাইনে যে আর কী কী হবে!‌ জীবনটা আস্তে আস্তে কল্পবিজ্ঞান কাহিনির মতো হয়ে যাচ্ছে।

কালোবাজারি এবং মজুতদারির বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করতে কেন্দ্রীয় সরকার রাজ্য সরকারগুলোকে চিঠি লিখে নির্দেশ দিয়েছে। আর ‘হু’কে ব্যাপক ঝেড়েছে ট্রাম্প। বলেছে, আমেরিকা আর ওদের টাকা দেবে না। কেন ‘হু’ আগে থেকে করোনা নিয়ে প্রিভেন্টিভ কোনও ব্যবস্থা নিতে পারেনি?‌ কেন চিনের প্রতি পক্ষপাত দেখিয়েছে তারা? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশের প্রেসিডেন্ট রেগে গিয়েছে। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবার কার টাকায় ফুটুনি মারবে?‌ আমেরিকা টাকা না দিলে ‘হু’কে টাকা দেবে কে?‌ হু?‌!‌

দুপুর ১.‌৩৬

আজ ব্রাঞ্চ করেছি। চার স্লাইস পাউরুটি +‌গোটাকতক ডিম+‌কফি। রাজার ব্রাঞ্চ!‌ কাল অফিসে এক সহকর্মী আক্ষেপ করছিল, বাজারে ব্রাউন ব্রেড পাওয়া যাচ্ছে না। শুনে দুঃখে প্রায় কান্না পেয়ে যাচ্ছিল। অনেক কষ্টে চোখের জল আটকালাম।

দুপুর ১.‌৫৫

বাড়ির কাজগুলো সড়গড় হয়ে যাওয়ায় ইদানীং হাতে একটু সময় বেঁচে যায়। আর হাতে বাড়তি সময় থাকলে আমার মতো অস্থিরমতি মানুষ নানা অড জব করার চেষ্টা করে থাকে। বাবা–মা’কে খেতে দেওয়া, ঘর মোছা, রান্না ইত্যাদির পর আজ ভেবেছিলাম, বাড়ি থেকে আনা ট্রিমারটা দিয়ে চুলটা ট্রিম করার চেষ্টা করব। কিন্তু পাওয়ার প্লাগে তারটা গোঁজার পর ঝপ করে মনে পড়ল, আশপাশের দু–একখানা যা নমুনা দেখছি (রাকা, বিপ্লব) তাতে ওই অপচেষ্টা না করাই ভাল। এমনিতেই পারফেকশনকে ইমপ্রুভ করা মুশকিল (‌সৌজন্য:‌ আমির খান, দিল চাহ্‌তা হ্যায়)‌।

দুপুর ৩.‌৩৫

আজ অফিসে চাপের দিন। তাড়াতাড়ি এসে কাজ শুরু করে দিয়েছি। অস্যার্থ:‌ আজ ডায়েরিতে ঘনঘন এন্ট্রি করার সুযোগ নেই।

দুপুর ৩.‌৪৫

নেতাদের সঙ্গে সর্বদলীয় ভিডিও বৈঠকে মোদির ইঙ্গিত, লকডাউন উঠবে না ১৪ তারিখ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তেমনই মতামত আসছে। এটা প্রত্যাশিতই ছিল। মোদি জানিয়েছেন, শুক্রবার, অর্থাৎ ১০ তারিখ পর্যন্ত পরিস্থিতি দেখে শনিবার সব রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। তাঁদের মতামতের সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নেবে কেন্দ্রীয় সরকার। শুনে–টুনে মনে হচ্ছিল, সারা দেশ তো ভাবছে, ১৫ তারিখ থেকে আবার হুল্লোড় করতে বেরিয়ে পড়বে। লকডাউন চালু থাকলে গণহতাশা জনিত গণরোষের বিস্ফোরণ না হয়!‌

বিকেল ৪.‌৩৫

উপায় নেই। যত কাজই থাক, একফাঁকে দৌড়ে এসে এটা লিখতেই হচ্ছে। করোনার বাজারে সেরা স্টোরিটা ব্রেক করে দিল কলকাতা টিভি–র সঞ্জয় ভদ্র। কলকাতা পুলিশ আজ থেকে মদের হোম ডেলিভারি চালু করার ব্যাপারে নির্দেশ জারি করেছে। সমস্ত থানার ওসি-র কাছে নির্দেশ গিয়েছে। লোকে বাড়ি থেকে বেরোতে পারবে না। কিন্তু সকাল ১১টা থেকে বেলা ২টোর মধ্যে এলাকার দোকানে ফোন করে মদের অর্ডার দেওয়া যাবে। এলাকার থানার অনুমতি সাপেক্ষে দোকান বাড়ি বাড়ি মদ পৌঁছে দেবে। চারদিকে হুলুস্থূল পড়েছে। দিকে দিকে পিপাসুদের উল্লাস। ঘনঘন ফোন— খবরটা ঠিক?‌ আর জেলার লোকেদের চরম হতাশা— আমাদের এখানে কবে চালু হবে?‌ এই না হলে খবর! গ্রেট স্টোরি!‌ জাত রিপোর্টার। স্যালুট।

বিকেল ৫.‌১০

রাজ্যে আরও ৩টি টাস্ক ফোর্স গঠন করলেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশিই জানালেন, বিশেষজ্ঞরা তাঁকে বলেছেন, ১৯ মে পর্যন্ত লকডাউন চলা উচিত। এটা তাঁর মত নয়। তিনি এ ব্যাপারে কিছু জানেনও না। বিশেষজ্ঞরা তাঁকে এই তারিখটা বলেছেন। এইপর্যন্তই। আরও বললেন, লকডাউনে বাংলার মানুষের কষ্ট হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু ১৯ মে পর্যন্ত রাখতে হলে কষ্ট করেও তিনি মেনে নেবেন।

বিবৃতিটা ইন্টারেস্টিং লাগল। কারণ, বিশেষজ্ঞদের কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী ১৯ মে তারিখটা ভাসিয়ে রাখলেন। আরও ইন্টারেস্টিং এই কারণে যে, এই প্রথম একটা নির্দিষ্ট তারিখ শোনা গেল। এই প্রথম। দেখা যাক।

সন্ধ্যা ৬.‌০৫

কলকাতার পুলিশ কমিশনার অনুজ শর্মা বিবৃতি দিয়ে বলেছেন, মদের হোম ডেলিভারির খবরটা ভুল। এমন কোনও নির্দেশিকা নাকি জারিই করা হয়নি। কলকাতা টিভি ছাড়া সমস্ত চ্যানেল এবং পোর্টাল খবরটা তুলে নিয়েছে। মন বলছে, কোথাও একটা বড় গুবলু হয়েছে। সঞ্জয় ভুল খবর করার লোক নয়। শুধু সঞ্জয় কেন, কোনও রিপোর্টারই ২০০ পার্সেন্ট নিশ্চিত না হয়ে ওই খবর ফাইল করবে না। গোলমাল আছে। এখন সময় নেই। পরে একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।

সন্ধ্যা ৭.‌০০

ফেসবুকে আমার ওয়ালে সুদীপ লিখেছেন, পূরব কোহলি ‘আ ওয়েডনেস ডে’তে অভিনয় করেননি। করেছিলেন গৌরব কাপুর। একেবারে ঠিক লিখেছেন। আমারই ভুল। আজ সংশোধন করে দেব। বয়স হচ্ছে। স্মৃতিভ্রংশ হচ্ছে আস্তে আস্তে। কিন্তু এটা দেখেও চমৎকৃত এবং সম্মানিত লাগল যে, লোকে কত মন দিয়ে পড়ে।

সন্ধ্যা ৭.‌১৯

কলকাতা পুলিশ এবং নবান্ন এইমাত্র বিবৃতি দিয়ে জানাল, মদের হোম ডেলিভারির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত। আগে নির্দেশ দেওয়া হলেও আপাতত তা বন্ধ রাখা হচ্ছে। এতদ্বারা এটা আরও স্পষ্ট হল যে, কিছু একটা গুবলু হয়েছে। খুঁজতে হবে।

রাত ১০.‌১২

দম ফেলার ফুরসত ছিল না। কিছুক্ষণ আগে অবশেষে পেজ রিলিজ করলাম সকলে মিলে। এক একটা দিন এমন যায়। যখন বুঝতে পারি, বয়সটা আর আগের জায়গায় নেই। কালই এক প্রাক্তন সহকর্মীকে ফোনে বলছিলাম, কেরিয়ারের স্লগ ওভারে এসে গিয়েছি। কিন্তু বরাবরই যেহেতু খানিক অর্থোডক্স খেলতে অভ্যস্ত, তাই এখনও ধুমধাড়াক্কা চালাতে পারছি না। ৫০ ওভারের ম্যাচে ৪৫ ওভার চলে গিয়েছে। কিন্তু ব্যাট করছি রাহুল দ্রাবিড়ের মতো। দেখা যাক, এভাবে যা রান ওঠে।

রাত ১০.‌২২

গুবলুটা পেয়েছি। নির্দেশটা জারি হয়েছিল। ঘটনাচক্রে, সেই নির্দেশের একটা কপিও হাতে এল। যাতে স্পষ্ট লেখা, আজ (‌০৮.‌০৪.‌২০২০)‌ থেকে লকডাউন চলা পর্যন্ত বৈধ লিকার লাইসেন্সধারী অন শপ / ‌অফ শপ /‌ বার /‌ হোটেল /‌ রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি থেকে হোম ডেলিভারিতে লিকার বিক্রি করা যাবে। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টোর মধ্যে পাবলিক তাদের নিকটবর্তী দোকান ইত্যাদিতে ফোনে অর্ডার দিতে পারবে। কাউকে মদ কিনতে আসতে দেওয়া হবে না। ডেলিভারি ম্যানরা দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টার মধ্যে ওইদিন সংশ্লিষ্ট বাড়িতে মদ পৌঁছে দেবে। মদ্য ব্যবসায়ীদের তাঁদের এলাকার থানা থেকে ডেলিভারি ম্যানদের প্রয়োজনীয় পাস সংগ্রহ করতে হবে। ওসি /‌ অ্যাডিশনাল ওসি–রা প্রতিটি দোকানকে সর্বাধিক তিনটি করে পাস দিতে পারবেন। সমস্ত পাসে ওসি /‌ অ্যাডিশনাল ওসি–র সই থাকবে। সই থাকতে হবে সংশ্লিষ্ট ডিভিশনাল ডিসি–র। সমস্ত ডিসি–কে বলা হয়েছে থানার ওসি–দের ব্রিফ করতে।

এই নির্দেশটি গেজেটে ছাপা এবং বিতরণের জন্য চলে গিয়েছিল। আইপিএস–দের সরকারি হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে নির্দেশটি পাঠিয়েছিলেন কলকাতা পুলিশের জয়েন্ট সিপি, হেডকোয়ার্টার্স।

কলকাতা পুলিশে মোট ৮০টা থানা এখন। কোনও না কোনও থানা থেকে খবরটা বেরোবে না, এটা ভাবা বাতুলতা। খবর বেরোল এবং চরাচরে এমন হিল্লোল তুলল, যে করোনাভাইরাসও সেই সংক্রমণের কাছে হেরে গেল। আর ত্রাহি মধুসূদন রব উঠল প্রশাসনে। জয়েন্ট সিপি–র মিডিয়ার হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, এই খবরটা কি ঠিক?‌ জয়েন্ট সিপি লিখলেন, ‘ইনকারেক্ট।’ যার প্রেক্ষিতে অন্য এক রিপোর্টার লিখলেন, ‘কিন্তু এক্সাইজ দফতরের লোকজন তো বলছে, খবরটা ঠিক। তাহলে কি আপনি এটাকে ফেক নিউজ বলছেন?‌’

সেই কথোপকথনের স্ক্রিনশট বলছে, জয়েন্ট সিপি নিরুত্তর ছিলেন। ঘটনাচক্রে, তার কিছু পরে সংশ্লিষ্ট গ্রুপে ‘ইনকারেক্ট’ শব্দটি আর দেখা যায়নি।

যায়নি। কারণ, খবরটা ভুল ছিল না। ভুল যে ছিল না, তার প্রমাণ মদের হোম ডেলিভারির জন্য অশোকস্তম্ভের নীচে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের লেটারহেডে প্রয়োজনীয় ছাপানো পাস। যা ইস্যু করা হবে পুলিশ এবং এক্সাইজ কর্তার নাম এবং সই–সহ। সেই পাস ততক্ষণে বিভিন্ন থানায় পৌঁছেও গিয়েছে। যাতে নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজ্‌ড ছবির জন্য। রয়েছে তিনটি শর্তও। ১.‌ বিক্রিত মদের বৈধ ক্যাশমেমো থাকতে হবে। ২.‌ সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার বাইরে কোথাও ডেলিভারি ম্যান মদ দিতে যেতে পারবে না এবং ৩.‌ ডেলিভারি ম্যানের কাছে বৈধ পরিচয়পত্র থাকতে হবে (‌ভোটার কার্ড / আধার কার্ড /‌ প্যান কার্ড /‌ ড্রাইভিং লাইসেন্স ‌ইত্যাদি)‌।

এই গুবলুর পর আর কী করে নির্দেশ জারি হওয়ার কথা অস্বীকার করা যায়!‌

সর্বব্যাপী হতাশার মধ্যে চারদিকে ফোন ঘুরিয়ে আরও যা জানা গেল, লকডাউনে পাঁড় মাতালদের বাড়িতে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ছে। উইথড্রয়াল সিম্পটম–তাড়িত হয়ে তারা ছুতোনাতায় বেরিয়েই পড়ছে বাইরে। মরিয়া ভিড় জমাচ্ছে ইতিউতি। ফাঁপরে পড়েছে পুলিশ। লকডাউন না রক্ষা করলে ছিছিক্কার পড়ছে। রক্ষা করতে গেলে মাতালের পিছনে দৌড়ে জান বেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে ঠিক হয়েছিল, চুপিচাপি ব্যাপারটা শুরু করা হবে। প্রথম কলকাতা। তারপর পরিস্থিতি বুঝে জেলায় জেলায়। কারণ, সেখানেই নাকি নাভিশ্বাস বেশি উঠছে। খবর বেরিয়ে গিয়েই কেলেঙ্কারি হয়েছে!‌

খবরটা ও করার পর টি–টোটালার সঞ্জয়ের (‌এটা একেবারেই ঘটনাচক্র যে, আমার মতে পৃথিবীর আদিতম রিপোর্টারের নাম সঞ্জয়। যিনি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের রিপোর্ট করতেন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের জন্য)‌ ফেসবুক ওয়ালে গিয়ে লিখে এসেছিলাম, ‘গ্রেট স্টোরি। কিপ ইট আপ। সো মেনি উইল ব্লেস ইউ টুডে।’ তবে ওর খবরের জেরে ঘটনা যেদিকে গড়াল, তাতে বেচারাকে উচাটন মাতালদের হাতে গণধোলাই না খেতে হয়!‌ প্রবীণ রিপোর্টারের ‘গাট’ অবশ্য বলছে, মদের হোম ডেলিভারিটা চালু হবে। তবে আর ঢাক পিটিয়ে নয়। আবডাল রেখে। ঘরবন্দি মানুষকে কিছু তো একটা দিতে হবে। নইলে তো ঘরে ঘরে আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দেবে!‌

এই লকডাউন ডায়েরিতে লেখা থাক, ওর খবর ‘ভুল’ বলার পর সঞ্জয় ফেসবুকে প্রকাশ্যে পুলিশকে চ্যালেঞ্জ করেছিল, খবর ভুল হলে ফেক নিউজ করার অভিযোগে ওকে অ্যারেস্ট করা হোক। ও ওর খবরের পক্ষে যাবতীয় প্রমাণ দিতে তৈরি। ঘটনাচক্রে, তার পরেই যৌথ বিবৃতি আসে, নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিল। তবে তা প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

লকডাউনের মন্দা এবং বোরিং বাজারে এখনও পর্যন্ত সেরা থ্রিলার এটাই। ভাবতে ভাল লাগছে, সেই থ্রিলারের নায়ক হয়ে রইল এক সাংবাদিক। যাদের এমনিতে পার্শ্বচরিত্রও জোটে না। এমনকী, ‘কাব্যে উপেক্ষিতা’র মতো গরিমাময় বিশেষণও তাদের ক্ষেত্রে কেউ প্রয়োগ করে না। বড়জোর বলে, ছাগলের সপ্তম সন্তান।

ফাটিয়ে দিয়েছিস সঞ্জয়। তোকে আবার স্যালুট!‌

লকডাউন ডায়েরি – ৭ এপ্রিল, ২০২০

০৭.‌০৪.‌২০২০। মঙ্গলবার

সকাল ৭.‌৪৩

আজ লকডাউনের চতুর্দশ দিন। দেখলাম, বডি ক্লক বদলে গিয়েছে। এখন আর ঘুম ভাঙাতে অ্যালার্ম দরকার হচ্ছে না। নিজে থেকেই সাড়ে ৭টায় উঠে পড়ছি। যেমন ব্যাডমিন্টন খেলার সময় ভোর সাড়ে ৪টেয় ঘুম ভেঙে যেত। আজও ভেঙে গেল। শরীর আসলে একটা যন্ত্র। যেমন চালানো হয় তেমনই চলে। চলছে। ঘুম ভেঙে প্রথমেই হাঁ করলাম। এখনও চোয়ালে একটু লাগছে। তবু মনে হল, আজ অফিস যাব। অনেকদিন হয়ে গেল। এবার বোর্‌ড লাগছে।

কাল রাতে অমিতাভ বচ্চন–সহ বিবিধ সেলিব্রিটি অভিনীত ‘ফ্যামিলি’ দেখলাম। লকডাউন সংক্রান্ত চার মিনিটের কিছু বেশি সময়ের সাদা–কালো ছবি। বচ্চন ছবির শেষে বললেন, তাঁরা সকলেই বাড়িতে বসে ছবিটি শ্যুট করেছেন। ছবির কেন্দ্রে একটি কালো চশমা। বচ্চনের সেটি এখন দরকার। কারণ, এটি আসলে এখন অপ্রয়োজনীয়। এই ধরনের কিছু একটা মূল বক্তব্য। রোদচশমা দরকার নেই। কারণ, রোদে বেরোনর প্রয়োজন নেই।

আজ সকাল থেকে সেই ছবি নিয়ে ফেসবুক জুড়ে উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, খারাপ বললেও আন্ডারস্টেটমেন্ট। যেমন অখাদ্য স্ক্রিপ্ট, তেমনই দুর্বল তার এগজিকিউশন। লকডাউনের সময় বাইরে বেরোবেন না— এই কথাটা এই সমস্ত অভিনেতা–অভিনেত্রীরা আলাদা আলাদাভাবে বললেও পারতেন। জোর করে একটা জুভেনাইল গল্প খাড়া করে এক আপাত–দুর্বোধ্য বিবৃতিতে সেটা বলার যে কী দরকার ছিল কে জানে!‌ দ্বিতীয়ত, ছবির এতই জোর যে, শেষে অমিতাভকে বলেও দিতে হল যে, তাঁরা সকলেই নিজের নিজের বাড়িতে বসে ছবির দৃশ্যগুলো শ্যুট করছেন?‌ বলেই যদি দিবি, তাহলে আর এত কষ্ট করে ছবি বানানোর দরকার কী!‌ তাবড় তাবড় পেশাদারদের ভাবনাচিন্তাতেও লকডাউন হল নাকি?‌ নাকি তাঁরা ভাবলেন, এখন পাঁচ পাবলিক সবই গিলে নেবে?‌ অবশ্য নিচ্ছেও।বলিহারি যাই।

তথ্য:‌ ইতিমধ্যে আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়েছে। সারা পৃথিবীতে ৭০,০০০। পাখির মতো মানুষ মরছে বিশ্বজুড়ে। উদ্বেগের হল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সঙ্কটজনক। তাঁকে আইসিসিইউ–তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাপান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে চলেছে বা ঘোষণা করে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া আগামী সপ্তাহে লকডাউন খানিকটা শিথিল করতে পারে। কেনিয়া তাদের রাজধানী নাইরোবিতে এবং নাইরোবি থেকে অন্যত্র সড়ক, রেল এবং আকাশযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

এর শেষ কোথায়?‌ কবে?‌ জানালার বাইরে ঝকঝক করছে সূর্য। কিন্তু এগুলো ভাবলে এই সকালেই ঘোর অন্ধকার করে আসছে।

সকাল ৮.‌৩৯

ইদানীং একটা কথা খুব মনে হয়। এই সময়টা অধিকাংশ মানুষকে অনেক বেশি অনেক বেশি লিন, ট্রিম অ্যান্ড মিন করে দেবে। বাড়তি কোনও মেদ, কোনও খাদ, অতিরিক্ত কোনওকিছু থাকবে না জীবনে। আগে একদিন এই ডায়েরিতে লিখেছিলাম যে, করোনা আমাদের মিনিম্যালিস্ট জীবন বাঁচাতে শেখাবে। আজকাল মনে হয় মিনিম্যালিস্ট নয়, আসল জীবন বাঁচতে শেখাবে। পৃথিবী তার নিজস্ব শর্তে আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। বাঁচিয়ে নেবে। সেটাই হবে বাঁচার মতো বাঁচা। নিজের ভিতরে তাকিয়ে দেখবে মানুষ। কিন্তু তার জন্য আরও রগড়ানি দরকার হবে। বোধিজ্ঞান তো আর একুশ দিনের লকডাউনে লাভ করা যায় না। তার জন্য আরও তপস্যা প্রয়োজন। অর্থাৎ, আরও লকডাউন!‌

সকাল ৯.‌১৭

নাম না–জানা একটা পাখি এসেছে বারান্দায়। খয়েরি রং। ঠোঁট আর লেজের কাছে উজ্জ্বল কমলা। বারবার ভিতরে ঢুকতে চাইছে আর দরজার বিশাল কাচে ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু হাল ছাড়ছে না। কাক, চড়ুই এবং পায়রা ছাড়া কোনও পাখি চিনি না। সায়ন দেখলে নির্ঘাত চিনতে পারত। ও পাখি দেখে বেড়ায়। বার্ড ওয়াচার। সায়ন ত্রিপাঠির আগে আমি মাত্র একজন বার্ড ওয়াচারের নাম শুনেছিলাম— সালিম আলি।

পাশের বাড়ির আমগাছে নধর সব আম হয়েছে। ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে আনা যায়। কিন্তু কী লাভ এনে?‌ থাক গাছে। ভাল লাগছে দেখতে। বন্যের বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে, গাছের আম গাছে। এবং অচিন পাখি খাঁচার বাইরে।

বেলা ১১.‌৩৬

গাড়ি ধুলাম। নতুন একটা টেকনিক আবিষ্কার করেছি। সেটা অবশ্য বড় জায়গা না পেলে সম্ভব নয়। এখানে গাড়িটা উদোম রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে বলে করতে পারলাম। চেতলার বাড়ির পার্কিংয়ে করতে গেলে নিশ্চয়ই মার খেতাম। প্রথমেই বালতি বালতি জল ঢেলে গাড়িটাকে আগাপাশতলা স্নান করিয়ে দিলাম। তারপর লাল শালু দিয়ে মুছে দিলাম। বাচ্চা স্নান করানোর মতো। সমস্যা হল, কিটকিটে রোদে গাড়ির গায়ে জল পড়তে না পড়তেই শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে সেটা ম্যানেজেব্‌ল। যতদিন এখানে আছি, এটাই করব।

দুপুর ১২.‌৪৪

আজ মায়ের পেনশন তোলার একটা চান্স নিতে হবে। উল্টোডাঙার এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে প্রতি মাসে যাই পেনশন তুলতে। তবে এই মাসটা আলাদা। দেখা যাক।

ওহ্‌, লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠক সবে শেষ হল। লকডাউন নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বাভাবিক। ভারতে ‘হটস্পট’ ক্রমশ বাড়ছে। রিপোর্টারের ‘গাট ফিলিং’ বলছে, লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। এবং আমার এই ‘গাট’ এখনও পর্যন্ত আমাকে কখনও ঝোলায়নি। পেশাগত ক্ষেত্রে হোক বা ব্যক্তিগত।

দুপুর ১.‌০৪

ট্রাম্প স্রেফ হুমকি দিয়ে ভারত থেকে আমেরিকায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন আমদানি করিয়ে নিল!‌ ভারত প্রথমে দেবে না বলেছিল। তারপর ‘দেখে নেব’ মোডে সরাসরি হুমকি আসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তরফে। তাতে কাজ হয়েছে। ধমকে কাজ হয়। বরাবর।

দুপুর ৩.‌২৭

এইমাত্র অফিসে ঢুকলাম। আসার আগের সময়টা ঘটনাবহুল। একে একে লিখি। মায়ের পেনশন তুলেছি। বিনা ভিড়ে। কার্যত বিনা লাইনে। মেজাজে গিয়ে রাজার মতো উল্টোডাঙার ক্যাপিটাল ইলেকট্রনিক্সের কাছে রাস্তার উপর গাড়ি রাখলাম। ঢুকে দেখলাম, চারদিক খাঁ–খাঁ। কর্মীরা বসে কাজ করছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। প্রশ্ন করায় বললেন, রোজ ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত ব্যাঙ্ক খোলা থাকছে। সাধারণ সময়ের মতোই। বছরের প্রত্যেক মাসে এই সময়টায় ভিতরে একটা আস্ত জনসভার মতো ভিড় থাকে। চারদিকে কাঁউমাউ চিৎকার। আজ মৃত্যুপুরীর মতো লাগছিল। গুনে দেখলাম, আমায় নিয়ে চারজন গ্রাহক। প্রায়ই লিঙ্ক ফেল করছিল বলে খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হল। কিন্তু মসৃণভাবে পেনশনটা তুলে ফেলা গেল। ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতে বেরোতে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বার্থপরের মতো মনে হচ্ছিল, লকডাউনটা পরের মাসেও চলুক না হয়। এমন বিনা আয়াসে এসে পেনশন তুলে নিয়ে যাব। ক্ষতি কী?‌ প্রত্যেক মাসের প্রথমে যে আতঙ্ক আর ব্যাঙ্ক–বিকর্ষণটা হয়, সেটা তো হবে না। তারপরেই মনে হল, ছি–ছি! ‌এসব কী ভাবছি। কত বয়স্ক মানুষকে দেখি প্রতি মাসে। লাঠি ঠুকে ঠুকে আসেন অবসরজীবনের প্রাপ্য অর্থটা নিয়ে মাস চালাতে। তাঁরা এখন কী করছেন কে জানে!‌ আর আমি আছি নিজের তালে। ছোঃ!‌ স্বার্থপরতারও একটা লিমিট থাকে।

ব্যাঙ্ক থেকে নির্জন রাজপথ ধরে সটান চেতলা। লবঙ্গদের বহুদিন দেখিনি। গরমে কাহিল বেচারারা। পৌঁছে দেখলাম, চেতলা গার্লস স্কুলের সামনে বিশাল ট্রাক দাঁড়িয়ে। সামনে ব্যানার ‘রিলিফ মেটিরিয়াল, রিলায়েন্স’। বোঝা গেল, মুকেশ আম্বানী ত্রাণবন্টনে নেমে পড়েছেন। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে খানিক খেলাধুলো করে, কাছের গ্রসারি শপের অজিতকে ‘হাই’ বলে অফিসে রওনা হলাম। পৌঁছে দেখলাম, চাকরি আছে এবং আমার দাঁত প্রায় হাতির দাঁতের মতো মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। সহকর্মীরা আশ্বস্ত যে, কিঞ্চিৎ ফোলা গাল এবং ক’দিনের বাসি দাড়ি ছাড়া দন্তশূল আমার মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বিকেল ৪.‌১০

অশোক’দার সঙ্গে দেখা হল এডিট মিটিংয়ে। চিন্তিত। সকলেই চিন্তিত।

বিকেল ৫.‌১৪

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স। মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, কাল থেকে ফুলবাজার চালু হচ্ছে। পাশাপাশিই জানালেন, রাজ্যের ৭টি জায়গা ‘হটস্পট’। সেগুলো কী, জানালেন না। ঠিকই করলেন। আতঙ্ক এবং সেই আতঙ্ক–জনিত স্টুপিডিটি যে হারে বাড়ছে, তাতে ওই ৭টি এলাকার মানুষের ধোপা–নাপিত অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যেত। অভিজিৎ মুখ্যমন্ত্রীকে বললেন, ‘আপনি যেভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাতে তো আপনার শরীর নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।’ আর বললেন, ওই ৭টি এলাকায় র‌্যাপিড টেস্টিং এবং স্যানিটাইজিং করাতে। জানা গেল, এভাবেই ভিডিও কনফারেন্স হতে থাকবে।

বামপন্থী নেতাদের সঙ্গেও আজ নবান্নে বৈঠক হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, মনোজ ভট্টাচার্যরা ছিলেন। ফিশফ্রাই ছিল কিনা জানা হল না।

সন্ধ্যা ৬.‌৫৩

বলিউডের ছুটকো অভিনেতা, লন্ডনবাসী পূরব কোহলি সপরিবার করোনা–আক্রান্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্ট করেছেন। সেটা জানলাম ভাস্বতীর ওয়াল থেকে।

সন্ধ্যা ৭.‌৩০

ভারতে এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত ৪,৩৯২ জন। সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্রে— ৮৬৮। মৃত ১৩৭ জন।

রাত ৮.‌২৭

ইন্দ্রনীলের ফোসবুক পোস্ট থেকে জানলাম, করোনা পরিস্থিতিতে আর্থির ক্ষতির মোকাবিলায় বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ৫০ লাখ টাকা তুলবে টেকনিশিয়ানদের জন্য। করোনাভাইরাস নিয়ে শর্ট ফিল্ম তৈরি হবে। ছবির সঙ্গে জড়িতদের লাইন আপ খুবই ইন্টারেস্টিং লাগল। রেকর্ডের খাতিরে এই ডায়েরিতে নথিভুক্ত থাকুক। যদি ভাবীকালের কাজে লাগে।
কনসেপ্ট:‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ডিরেক্টর:‌ অরিন্দম শীল
স্ক্রিপ্ট:‌ পদ্মনাভ দাশগুপ্ত ও অরিন্দম শীল
সং লিরিক্‌স:‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কম্পোজ্‌ড বাই:‌ কবীর সুমন
মিউজিক:‌ বিক্রম ঘোষ
এডিট:‌ সংলাপ ভৌমিক
প্রোডিউসড বাই:‌ ক্যামেলিয়া
সাপোর্টেড বাই:‌ স্বরূপ বিশ্বাস, প্রেসিডেন্ট ফেডারেশন

রাত ৯.‌২৯

আকাশ জুড়ে থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, আজ সন্ধ্যা থেকে কাল সকাল পর্যন্ত আকাশে থাকবে এই চাঁদ। এমনিতে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব থাকে ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। আজ সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩,০৫,০৩৪ কিলোমিটার। হবে হয়ত। এসব জটিল অঙ্কের কারণেই সায়েন্স পড়ায় ইতি দিয়েছিলাম সেই উচ্চমাধ্যমিকের পর।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম, ঘরবন্দি রোমান্টিকরা বলছেন ‘পিঙ্ক মুন’। অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের অকিঞ্চিৎকর ছাত্রের মনে হল ‘ঝলসানো রুটি’।

লকডাউন ডায়েরি – ৬ এপ্রিল, ২০২০

০৬.০৪.২০২০ । সোমবার 

সকাল ৭.২৩

ইতালি আর ফ্রান্সে আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। করোনা পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বসছে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদ। নিউ ইয়র্কের এক চিড়িয়াখানায় করোনায় আক্রান্ত এক বাঘিনি। বলা হচ্ছে, তার কিপারের থেকে সে সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারে। আজ ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক এই শেষের খবরটাই আমায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রেখেছে। আমার বাচ্চাগুলোর কিছু হবে না নিশ্চয়ই?

সকাল ৮.১৮

টিভি-তে বলছে, এটাই লকডাউনের শেষ সপ্তাহ। তাই-ই কি? ব্যাপারটা এত সহজ? এত মিষ্টি? এত সত্যি?

সকাল ৮.২৩

কাল রাতে বাজি পোড়ানটা এখনও মাথা থেকে বার করতে পারছি না।এগুলো কি স্রেফ অশিক্ষা? নাকি প্লেন অসুস্থতা? কি জানি? মানুষ সাধারণত বোধহয় প্লেজার-ড্রিভন। তার সবসময় একটা ফান চাই। মজা চাই। হল্লা চাই। যে কোন একটা মওকা পেলেই হল আর কি! কাল রাতের ব্যাপারটাও তাই। আমোদ। স্রেফ বিশুদ্ধ আমোদ। যেসব বাড়ি থেকে ফানুস উড়তে বা শব্দবাজি ফাটতে দেখলাম, তাঁদের সঙ্গে নিশ্চয়ই রাস্তাঘাটে কখনও না কখনও দেখা হয়েছে। তাদের তো অমানুষ বা অশিক্ষিত বলে মনে হয়নি। সেই লোকগুলো কীভাবে এতটা অসংবেদনশীল হল! ওরা কি বুঝতে পারছে না, যে যখন ওদের বাড়িতে কারও করোনায় মৃত্যু হবে, তখনও ওদের কোনও না কোনও পড়শি ওইভাবেই বিশুদ্ধ আমোদ করে শব্দবাজি পোড়াবে আর আকাশে আগুনের গোলা পাঠাবে রকেট ছুড়ে !

কমলিকা ফেসবুকে একটা লিঙ্ক পোস্ট করেছে। যাতে বলছে, কাল রাতে মাত্র ৯ মিনিটে ৬ কোটি টাকার বাজি পুড়েছে। ডিসগাস্টিং! আরও দেখেছি, বাজি পোড়াতে গিয়ে একটা বাড়ি পুড়েছে। আরেকজনের দাড়ি পুড়েছে।

আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা ৯,০০০ ছাড়িয়ে গেল। সারা পৃথিবীতে ৬৫,০০০ প্লাস।

গুজরাতের কোন কাগজে কারা সব বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, স্ট্যাচু অফ ইউনিটিকে ওএলএক্সে তুলে বেচে দেওয়া হবে ৩০,০০০ কোটি টাকায়। তারপর সেই টাকা দিয়ে সারা দেশে হাসপাতাল তৈরি হবে। মামলা করে দিয়েছে পুলিশ।

সকাল ৯.০৯

করোনা পরিস্থিতি নিয়ে দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক। আশা করা যায়, সেখানে লকডাউন নিয়ে কথা হবে। কী কথা হবে? লকডাউন চলবে না উঠবে? এই-ই তো? বৈঠকে যারা থাকবেন, লকডাউন চললে তাঁদের কোন প্রবলেম হবে বলে তো মনে হয় না।তাঁদের ফাই ফরমাশ খাটার অন্তত ২০০ লোক আছে। আতান্তরে পড়বে সাধারণ মানুষ। অবশ্য তারা তো আছেই ঝামেলায় পড়ার জন্য। গরিব মানুষের এ দেশে ওই একটাই ইউটিলিটি— তারা যাবতীয় ঝুটঝামেলা কাঁধ পেতে বহন করে। আর আমরা মনের আনন্দে বাজি পোড়াই!

সকাল ১০.৩১

বাড়ির বাইরে বেরোলেই মাস্ক পড়তে বলছে কেন্দ্রীয় সরকার। বলছে, তাতে সংক্রমণের ভয় থাকবে না। একই মাস্ক আবার ব্যবহার করতে হলে সেটা সাবানজলে ধুয়ে, প্রেশার কুকারে বা অন্যভাবে বয়েল করে, রোদ্দুরে শুকিয়ে তারপর ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু এত পরিশ্রম কি করবে মানুষ? তারা কি মনে করবে না যে এর চেয়ে নতুন মাস্ক কিনে পরা কম খাটুনির? এবং তাতে কি মাস্কশিল্পের উন্নতি হবে না?

বেলা ১১.০২

কাল রাতের সমবেত প্রতিক্রিয়া দেখা ইস্তক মনে হচ্ছে, ধর্ম আর ম্যাজিকাল থিঙ্কিং মানুষের মধ্যে একটা আশাবাদের জন্ম দিয়ে যায়। র‍্যাশনালিটি সেটা কখনও দেয় না। যুক্তি-বুদ্ধি আমাদের ডার্ক সাইডটা দেখায়। কোনও কুহক দেখায় না। তাই আমরা আলো জ্বালানো বা থালা বাজানোর মতো তুকতাকে বিশ্বাস করি আর তারপর গর্ধভের মতো মনে করি ওই প্রদীপের আগুনে করোনা পুড়ে মরবে।

বাই দ্য ওয়ে, দেশে করোনায় এখনও পর্যন্ত মৃত ১১৮ জন। আক্রান্ত প্রায় ৪,০০০। আজই নতুন করে ৯ জনের দেহে কোভিড-১৯ মিলেছে।

বেলা ১১.৪৫

গালের ফোলাটা এখনও কমল না। অ্যান্টিবায়োটিকের জেরে একটু দুর্বলও লাগছে। তাই আজও অফিস যাচ্ছি না। এমনিতে পরপর তিনদিন অফিস না যাওয়ার বান্দা আমি নই। কিন্তু এই ব্যথাটা বিশ্রি ভোগাল। এবার বাড়িতে বোরড লাগছে।

ফেসবুকে দেবাঞ্জন আর সুমনা কমেন্ট করেছেন, তাঁদেরও ‘প্যারাসাইট’ ভাল লাগেনি। এখনও কেউ কেউ আমার মতো ভাবেন ভেবে খুবই আশ্বস্ত লাগছে। অস্কার-প্রাপ্ত ছবির নিন্দে করেছি শুনলে ভঙ্গকুলীনরা আমায় একঘরে করতেন। প্লাস একটা মারও বাইরে পড়ত না। জোর বেঁচে গিয়েছি।

দুপুর ১২.০১

দলের প্রতিষ্ঠাদিবসে কর্মীদের কাছে পাঁচটি জিনিস চাইলেন নরেন্দ্র মোদী। তাঁর বচনে ‘পঞ্চ আগ্রহ’।

১. অবিরত সেবা অভিযান। মানে গরিব মানুষের কাছে রেশন পৌঁছে দেওয়া। কেউ যাতে অভুক্ত না থাকে। ২. মাস্ক না হলেও মুখ ঢেকে রাখুন সবসময়। আশপাশের পাঁচজনকে মাস্ক উপহার দিন। ৩. এলাকার ডাক্তার-নার্স, ব্যাঙ্ক বা ডাকঘরকর্মী, পুলিশ, সাফাইকর্মী এবং সরকারি অফিসারকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লিখুন, ৪. কম করে ৪০ জনের মোবাইল ফোনে ‘আরোগ্যসেতু’ অ্যাপ ডাউনলোড করে দিন এবং ৫. প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে অর্থসাহায্য করুন।

মোদী আরও বললেন, ‘সামনে আরও কঠিন লড়াই।’ যা থেকে এই গুঞ্জন আরও জোরাল হল যে, ১৪ তারিখের পরেও লকডাউন জারি থাকবে। অবস্থা দেখে অবশ্য তেমনই মনে হছে গত কয়েকদিন।

দুপুর ২.৪৮

আগামী এক বছর রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী-সহ সমস্ত মন্ত্রী, সাংসদ এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বেতনের ৩০ শতাংশ যাবে করোনা তহবিলে। আগামী ২ বছর এমপি লোকাল এরিয়া ডেভেলপমেন্টের টাকাও যাবে করোনা তহবিলে।

বিকেল ৪.১৩

আজ দুপুরে স্বপ্ন ছাড়াই ঘুমোলাম। স্বপ্ন দেখে থাকলেও এখন আর মনে পড়ছে না। নিশ্চয়ই খুবই ইনসিগনিফিক্যান্ট কিছু দেখে থাকব। যার এই ডায়েরিতে ওঠার যোগ্যতা নেই। মোদ্দা কোথা, আজ স্বপ্ন দেখে ধড়মড় করে ঘুম ভাঙেনি।গরমটাও পড়েছে জুতিয়ে। পরশু রাতে ব্যাঙের হিসির মতো একটু বৃষ্টি হল। তারপর আবার যে কে সেই। ওই বৃষ্টিতে গাড়িটায় কাদা কাদা ছোপ পড়েছে। কাল শরীর দিলে গাড়ি সাফ করা কর্মসূচিতে রইল।

বিকেল ৪.৩৪

যাদবপুরের একটা মিষ্টির দোকানে অন্য মিষ্টি কিনলে সঙ্গে একটা করোনা মিষ্টি ফ্রি দিচ্ছে নাকি! বাঙালির ব্যবসাবুদ্ধি জেগে উঠল অবশেষে। যাক বাবা। এবার নিশ্চিন্ত।

বিকেল ৫.৪৬

জানতে পারলাম, করোনার প্রভাব নিয়ে গ্লোবাল কমিটি তৈরি করেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ঘোষণা করেছেন চিফ মিনিস্টার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কমিটিতে আছেন নোবেলজয়ী অভিজিৎ বিনায়ক, চিকিৎসক অভিজিৎ চৌধুরি, সুকুমার মুখার্জি প্রমুখ। সিএম কথাও বলেছেন অভিজিতের সঙ্গে ফোনে। বাহ, এটা একটা দারুণ কাজ হল ফিউচারের জন্য। এতবড় একটা অসুখ। একটা গ্লোবাল সঙ্কট। একটা বাঘা কমিটি না থাকলে কি চলে?

রাত ৯.৩২

সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি এয়ারপোর্ট অথরিটি তাদের ২ নম্বর টার্মিনাল আগামী ১৮ মাস বন্ধ রাখবে। কারণ, করোনা পরিস্থিতিতে সিঙ্গাপুরে টুরিস্ট অনেক কম যাবে। যা যাবে, সেই পরিমাণ দিয়ে একটা টার্মিনালকে লাভজনক রাখা যাবে না। বোঝা গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এটাও মনে হল যে, তার মানে করোনা চলে গেলেও সঙ্গে করে অন্তত দেড়টা বছর নিয়ে যাবে! মনে হচ্ছিল, এই যে কর্পোরেশন ইলেকশন পিছিয়ে গিয়েছে, এগুলো আবার হবে? ২০২১ সালে এই রাজ্যে বিধানসভা ভোট হবে? কে জানে!

রাত ৯.৫০

বয়স যত বাড়ছে, তত মনে হচ্ছে, চারদিকে এত বেশি শব্দ কেন? লোকে প্রয়োজনের তুলনায় এত বেশি কথা বলে কেন? এত বেশি ফুটেজ খায় কেন? যে কথাটা যে বক্তব্যটা ১০ মিনিটে সেরে ফেলা যায়, সেটা ১ ঘণ্টা ১০ মিনিট ধরে ঘেনিয়ে ঘেনিয়ে বলতে হয় কেন? এগুলো কি ভিতরের নিরাপত্তাহীনতা থেকে জন্ম নেয়? নাকি হীনন্মন্যতা থেকে? বোধহয় দ্বিতীয়টাই। এবং এই মনোলগবাজি থেকে এ জীবনে সম্ভবত মুক্তি নেই।

রাত ৯.৫৭

আজ আর কিছু লিখতে ভাল লাগছে না। নিউ ইয়র্কের চিড়িয়াখানার খবরটা শোনা ইস্তক মনে হছে, আমার সন্তানেরা যেন থাকে দুধে-মাছে।

লকডাউন ডায়েরি – ৫ এপ্রিল, ২০২০

লকডাউন ডায়েরি 

০৫.০৪.২০২০ । রবিবার 

সকাল ৭.৫৪ 

কাল রাতে ওই লোকটা আর স্বপ্নে আসেনি। তাহলে কি ও অন্য কারও স্বপ্নে গিয়ে দেখা দিল ?

সকাল ৮.০৮

ডায়েরিটা রোজ রাতে বেডসাইড টেবিলে রেখে শুই। ঘুম ভাঙলে টেনে নিয়ে দিনের প্রথম এন্ট্রিটা করি। তারপর সারাদিন লেখা চলতে থাকে। যখন যেমন মনে হয়। আজ মনে হচ্ছিল, আর কতদিন জারি থাকবে এই লেখা? লকডাউন তো চলবে। আরও অন্তত ৯ দিন। ততদিনে আরও কী কী দেখব? কী কী লিখব? ভালবাসার এই কাজটা একঘেয়ে হয়ে যাবে না তো? তারপর ভাবলাম, চারপাশে যা ঘটছে বা ঘটছে না, সেগুলো নথিবদ্ধ করাই এই ডায়েরি লেখার লক্ষ্য। ফলে চলুক যতদিন চালাতে পারি।

যেমন আজ উঠেই মনে পড়ে গেল রাত ৯টায় ৯ মিনিটের জন্য আলোক নির্বাপণ এবং মোমবাতি জ্বালন। দেখা যাক কী হয়। ছাদে উঠে দেখতে হবে কেমন হয় ব্যাপারটা।

দুপুর ১২.১৬

‘প্যারাসাইট’ দেখলাম অবশেষে। অ্যাকাডেমি অফ মোশন পিকচারস জানলে বেদম মারবে। কিন্তু অস্কার পাওয়ার মতো মনে হল না। গল্পটা ভাল এগোচ্ছিল। শেষে গিয়ে কেমন একটা ঘেঁটে গেল। বিনা দরকারে দেদার ভায়োলেন্স আমদানি করা হয়েছে। অবশ্য দরকারেও আনা হয়ে থাকতে পারে। আমি বুঝিনি। মোটের ওপর আমার পোষায়নি।

ব্রাত্য একটা লেখা হোয়াটস অ্যাপে পাঠিয়েছিল। বেসিক্যালি ‘স্পেশাল অপস’এর রিভিউ। একেবারে ধুয়ে দিয়েছে। বলল এমনিই বাড়িতে বসে ‘নেই কাজ তো খই ভাজ’এর মতো লিখেছে। ওকে জানালাম, ওর বক্তব্যের সঙ্গে ৫০০ পারসেন্ট একমত। চমৎকার লিখেছে। সিরিজটা দেখতে গিয়ে ঠিক যে যে জায়গাগুলো আমার ঝুল লেগেছিল সেগুলো ওরও লেগেছে। এমনকী, বিনয় পাঠকের মতো প্রতিভাশালী অভিনেতার ওই জাঠ পুলিশ অফিসারের রোলে অভিনয় করাটাও।

বেলা ১২.৩০

আজ আর রান্না করতে হয়নি। আগের দিনই করা ছিল। আজ জাস্ট গরম করে দিলাম।

দাঁতের ব্যথা আছে। তবে অনেকটা সহনীয়। হাঁ করে মুখে চামচ ঢোকাতে গেলে এখনও ব্যথা লাগছে। তাই একটা ট্রিক আবিষ্কার করেছি। ঝট করে হাঁ না করে টাইম নিয়ে মুখ খুলে রেখে ১০ পর্যন্ত গুনি। তারপর চামচে করে খাবার ঠুসে দিই।এতে কাজ হচ্ছে। ব্যথাও লাগছে না। খাবার যাচ্ছে ভিতরে। নেসেসিটি ইজ দ্য মাদার অফ ইনভেনশন। প্রয়োজনীয়তাই আবিষ্কারের জননী।

দুপুর ১.৫৬

অনলাইন সার্ভিস চালু হচ্ছে আবার। কেন্দ্রীয় সরকার থেকে তেমনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ডেলিভারির সময় বাইরে একটা ঝুড়ি, প্যাকেট বা ট্রে-তে আইটেমগুলো রেখে ডেলিভারি বয় বেল বাজিয়ে চলে যাবে। আপনি দরজা খুলে জিনিস নিয়ে নেবেন। কেউ কারও মুখ দেখলেন না। পেমেন্ট নির্ঘাত অনলাইনেই আগাম করে রাখতে হবে। অর্থাৎ, চোরে-কামারে দেখা হবে না। কিন্তু সিঁধকাঠি তৈরি এবং ডেলিভারি হয়ে যাবে।

আরও জল্পনা, ১৪ তারিখের পর নাকি পকেট বেছে বেছে টোটাল লকডাউন হতে পারে। যেমন ওডিশায় ভুবনেশ্বর আর ভদ্রকে হলও ৪৮ ঘণ্টার জন্য।

আজও অফিস যেতে পারলাম না। মুখের ফোলাটা আজও যায়নি। কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে একটু। আরও দু-একদিন লাগবে মনে হুচ্ছে।

দুপুর ৩.০২

আবার একটা স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙল। দেখলাম, আমাদের পুরনো পাড়া উল্টোডাঙার হাউজিংয়ে গিয়ে দেখছি, পাড়ার মাঝখানে যে টানেলের মতো রাস্তাটা ছিল, বিকেলে খেলার পর আমাদের বন্ধুদের বিশাল গ্রুপ যে রাস্তাটার এ-মাথা থেকে ও-মাথা ঘুরে বেড়াতাম, সেই রাস্তাটা আর নেই। ওটার উপরেও বাড়ি তুলে দেওয়া হচ্ছে। আমি পাড়ার দারোয়ানকে জিজ্ঞাসা করলাম, এসব কী হচ্ছে? সে বলল, ‘আরে দাদা, এখন তো সব লকডাউন। কেউ রাস্তায় বেরোয় না। আর বেরোবেও না। আর তো রাস্তারই দরকার হবে না। রাস্তা রেখে কী লাভ? তাই পাড়ার কমিটি ঠিক করেছে, রাস্তার উপরেও বাড়ি তুলে দেবে।’

শুনে স্রেফ হাঁ হয়ে গেলাম। ক্লসট্রোফোবিক লাগছিল। দম আটকে আসছিল। পৃথিবীতে আর রাস্তাই থাকবে না? নার্ভাস হয়ে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে গাড়ির চাবি বার করতে গিয়ে পাচ্ছিলাম না। দেখে দারোয়ান হাসতে হাসতে বলল, ‘গাড়ির চাবি দিয়ে কি করবেন? রাস্তা না থাকলে গাড়ি চলবে কোথায়?’

ঘুম ভাঙল। উঠে টলমলে পায়ে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলাম, নীচে রাস্তা আছে। গাড়িও আছে।

বিকেল ৪.২৬

ফেসবুকে সৌরভ লিখেছেন, সহ নাগরিকদের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে লকডাউনের সময় শহরের একাকী বয়স্ক মানুষদের জন্য দরকারি ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিলেন। আজ সকাল থেকে ২,০০০-এর বেশি ফোন এসেছে মদের হোম ডেলিভারি চেয়ে। শেষ তিন-চারদিন ধরেই আসছে। বাধ্য হয়ে আজ থেকে তাঁরা ওষুধ পৌঁছনোর কাজ বন্ধই করে দিলেন!

ছি! ছি! ছি! এই আমার শহর?

সন্ধ্যা ৬.১২

নেটফ্লিক্সে ‘ফওদা’ দেখতে গিয়ে জোর হোঁচট। পুরোটাই ইজরায়েলি ভাষায়! সাব-টাইটেল পড়তে পড়তে কাঁধ ব্যথা হয়ে যাবে তো। ওই অত্যাচার নেওয়া যাবে না বেশিক্ষণ। সে যতই দুর্ধর্ষ ওয়েব সিরিজ হোক।

রাত ৮.১২

ভারতে মোট আক্রান্ত ৩,২৬০ জন। মৃত ৯৯। সেরে উঠেছেন ২২৯ জন। সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত ৯ লক্ষ ৫ হাজার। মৃত সাড়ে ৬৬ হাজার। সুস্থ হয়েছেন প্রায় ২ লক্ষ ৫৪ হাজার।

রাত ৮.৫৫

এবার ছাদে যাই।

রাত ৯.১৭

ভয়াবহ! এই হল নাকি দেশের শক্তির প্রকাশ? জনগণের একতার প্রকাশ? এইভাবে বাজি ফাটিয়ে, ফানুস উড়িয়ে? এই আমাদের দেশ? এই আমার শহর? যেখানে মহামারীর আতঙ্কে, অতিমারির ছায়ায় বাজি পুড়িয়ে উৎকট উল্লাস দেখানো হয়! করোনায় মৃতদের দেহের শেষকৃত্য নিয়ে শহরে যে ইতরামো দেখেছিলাম, এ জিনিস তাকেও ছাপিয়ে গেল।

এ কি সত্যিই নিজের চোখে দেখলাম? অকাল দীপাবলির মতো চারদিকের ব্যালকনিতে প্রদীপের সারি। ছাদে ছাদে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে মানুষ। ঘরের আলো নিভে গিয়েছে আগেই। এই পর্যন্ত তা-ও মেনে নেওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু আকাশে পর পর ফানুস? হাওয়াই বাজি? শব্দবাজি? কোথা থেকে এল? লকডাউনে কি বাজির বাজার খোলা ছিল? নাকি হোম ডেলিভারি দিয়েছে? টুইটারে দেখছি, শুধু কলকাতা নয়। এই ফিচার সারা দেশ জুড়ে।

ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা! এই আমার শহর? এই আমার দেশ?

অনেকে দেখছি ফেসবুকে লিখছে, বাঁচার আশায় লোকে মোমবাতি জ্বালিয়েছে। যা সামনে পাচ্ছে তাকেই আঁকড়ে ধরার মানসিকতা থেকে। বেশ। মানলাম। কিন্তু তা বলে শব্দবাজি?!

কোনও পাওয়ার গ্রিডে বিপর্যয় হয়নি। কিন্তু আজ রাতের ওই ৯ মিনিট দেখিয়ে গেল, আসলে কত অন্ধকার আমার দেশ!

লকডাউন ডায়েরি – ৪ এপ্রিল, ২০২০

০৪.০৪.২০২০।শনিবার 

সকাল ৯.৫৭ 

আজ অনেক ভোরে ঘুম ভেঙেছে। অ্যালার্ম ছাড়াই। দাঁতের যন্ত্রণায়। কাল রাতে ব্যথার চোটে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম। তারপর রাতে জোরালো ব্যথাহরা ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়েছি। আজ সকালে সেই ব্যথাটাই ফিরে এসে আবার টেনে তুলল ঘুম থেকে। 

মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। আয়নায় দেখলাম, ডান গাল ফুলে রাবণের মা ! দ্রুত বাবা-মাকে চা দিয়ে নিজে চা-বিস্কুট খেয়ে আরেকটা অ্যান্টিবায়োটিক এবং পেনকিলারের প্রলেপ দিলাম। এইসব পেনকিলারে বোধহয় সেডেটিভ থাকে। ফলে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এই উঠেছি। 

সকাল ১০.১৪ 

মহিলাদের আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল ভারতে হওয়ার কথা ছিল। স্থগিত হয়ে গেল। বিবৃতি দিল ফিফা। 

সকাল ১০.১৬ 

টুইটারে দেখছি ক্রিস এভার্ট  বলেছে, ‘আমি আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাংবাদিক বৈঠক দেখব বাঁ শুনব না। ঠিকঠাক প্রশ্ন করলেই লোকটা যেমন রুঢ়ভাবে জবাব দেয়, তাতে ঘেন্নায় আমার শরীর কুঁকড়ে যায়।’ কিন্তু যুগে যুগে, কালে কালে কী এটাই হয়ে আসেনি? বা আসছে না ?

সকাল ১০.৩৯

টিভি বলছে এক মার্কিন সংস্থা নাকি সমীক্ষা করে বলেছে, ভারতের যা জনঘনত্ব তাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লকডাউন থাকা উচিত। এটা কি সত্যি? এখন তো সবে এপ্রিলের শুরু ! এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ? ৬ মাস ? 

বেলা ১১.০৩ 

পাওয়ার গ্রিডের একটা অফিশিয়াল নির্দেশ ফেসবুকে আপলোড করেছে প্রদীপ্ত। যাতে আঞ্চলিক গ্রিডগুলোকে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে রবিবার রাত ৯টায় সারা দেশ আলো নেভালে তখন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় শূন্য হয়ে যেতে পারে। আবার যখন ৯ মিনিট পর যখন গোটা দেশে ঝপ ঝপ করে আলো জ্বলবে তখন আবার দুম করে এক ধাক্কায় ভোল্টেজ বেড়ে যাবে। তাতে গ্রিডের ক্ষতি হতে পারে। সেজন্য সমস্ত আঞ্চলিক গ্রিড যেন সতর্ক থাকে। বোঝো কাণ্ড ! এ তো নতুন ফ্যাকড়া দেখা দিল। 

এক ভদ্রমহিলা দেখলাম লিখেছেন, ‘এই জন্যই শিক্ষিত লোকেদের মন্ত্রিত্বে আনা উচিত’ । 

বেলা ১১.২৮

বিভিন্ন চ্যানেলে ডাক্তারদের কাছে প্রেগন্যান্ট মায়েরা আকুল হয়ে জানতে চাইছেন, তাঁরা কী করবেন। অনাগত সন্তানের কি কোনও বিপদ হতে পারে ? কেউ জানতে চাইছেন, ভ্যাক্সিন ডিউ আছে পরের সপ্তাহে। কী করবেন ? এখন দেওয়াবেন না লকডাউন খুললে ? শুনতে শুনতে এত কষ্ট হচ্ছিল!

দুপুর ১২.১০

রাবণের মা এখন একটি পুরুষ্টু গলকম্বলে পরিণত হয়েছে। তাই নিয়েই কোনওমতে আগামী কয়েকদিনের জন্য ডাল ভাত সেদ্ধ করে রাখলাম।

পেশাগত সহকর্মীরাও লকডাউন নিয়ে লিখছে দেখে ভালো লাগছে। বিতনুর পোর্টালে লিখেছে মৌপিয়া। কাল লেখাটা পাঠিয়েছিল মতামত জানতে চেয়ে। বললাম, চমৎকার হয়েছে। যেন চালিয়ে যায়। কিংশুকও রোজ লিখছে ফেসবুকে। বেশ ভালো লিখছে। ঠিকই  করছে। এই সময়টার একটা দলিল থাকা প্রয়োজন।

দুপুর ১২.২৫

সৌরভ আজ ইস্কনে গেল চাল দিতে। প্যাকেটের ওপরে একটা লেবেলে লেখা ‘সৌরভ গাঙ্গুলি ফাউন্ডেশন ইন অ্যাসোসিয়েশন উইথ ইস্কন’।

দুপুর ১.০৫

আজ লাঞ্চের মেনু দুধ-কর্নফ্লেক্স, অ্যান্টিবায়োটিক, পেনকিলার। তার আগে ফিনাইল সহযোগে একতলা মোছন এবং দোতলা ঝাঁটন। অশোক’দাকে টেক্সট পাঠিয়ে আজ অফিস থেকে ছুটি নিলাম। পাঁচ মিনিটে জবাব এল , ‘গেট ওয়েল বাবা’ ।

দুপুর ৩.৩২ 

হ্যারিসন ফোর্ড আর ব্র্যাড পিটের ‘দা ডেভিল’স ওন’ দেখতে  দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অদ্ভুত দুটো স্বপ্ন দেখলাম। প্রথমটা লবঙ্গকে নিয়ে। ঘুমনোর সময়ে লবঙ্গ সাধারণত আমার পায়ের তলায় বালিশের কাজ করে। স্বপ্নে দেখলাম, লবঙ্গ সল্টলেকের বাড়িতে চলে এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কী রে লবং, হঠাৎ চলে এলি ? লবঙ্গ পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, ‘তোমার পা-বালিশ না হলে আমার ঘুম হচ্ছে না।’ তারপর আমরা দুজনে দুজনের গলা জড়িয়ে খুব হ্যা-হ্যা করে হাসলাম আর আমি ওকে বললাম, তুই চেতলা থেকে সল্টলেক চলে এলি একা একা? তুই তো আর ন্যাকা নেই। বেশ স্মার্ট হয়ে গেছিস দেখছি ? এবার তোকে ইশকুলে দিতেই হবে। 

পরের স্বপ্নটা ভয়ের। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে টাকা তুলে বেরিয়ে দেখি বাইরের ফুটপাথে উলোঝুলো চেহারার একটা লোক বসে আছে। বিনা ভূমিকায় আমাকে সে বলল , ‘টাকা তুলেছিস?’ আমি অবাক হয়ে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বললাম। লোকটা বলল, ‘এবার ভাত দে হারামজাদা !’ 

ধড়মড় করে ঘুম ভাঙল। দেখলাম মাথার ঘামে বালিশ ভিজে গেছে। 

বিকেল ৪.১০ 

ফেসবুকে চমৎকার লিখেছে অগ্নি। ‘লকডাউন লাগাতার চললে আমাদের দেশ ভেতর থেকে ফেটে যাবে। মন্বন্তর তো ফিরবেই, সঙ্গে আরও অনেককিছু। স্রেফ না খেতে পেয়ে শব হয়ে যাওয়ার সংখ্যা, করোনায় মৃতের সংখ্যার চেয়ে বেশি না হোক , কম হবে না।’ 

আর মিঠু লিখেছে, আমরা যারা মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত, যারা সরকারি চাকরি নয়, বেসরকারি চাকরি বা ব্যবসা করে সংসার চালান, ভেবে দেখেছেন, দু’মাস পরে কীভাবে চলবে? গরিবদের সরকার আর অনেক সংস্থা দিচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তদের কে দেবে? তাঁরা তো ক্লাবে গিয়ে লাইন দিতেও পারবে না। দোকান বাজার খোলা থাকবে কিন্তু টাকা থাকবে তো ? জীবাণুতে মরব না, মরব পেটের জ্বালায়। 

সন্ধে ৭.৩৯ 

খুব জরুরি কথা বলল অদ্রিজা, ‘ইমিউনিটি বাড়িয়ে রাখো। কারণ কখনও না কখনও আমরা যে কেউ ইনফেক্টেড হতে পারি। ইমিউনিটি ভাল থাকলে উতরে যেতে পারি।’ 

সন্ধে ৮.৩৮ 

সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক মিলিয়ন ছাড়াল। মৃত ৫৭,০০০। সংখ্যা গুলো যত সহজে লিখি ততটা জোরেই কি ভিতরে গিয়ে ধাক্কা মারে ? আসলে কী নিয়ে চিন্তা হয় ? বেঁচে থাকা নিয়ে নাকি ভবিষ্যতে না-মানুষের মতো বাঁচা নিয়ে? 

রাত ৯.২১  

গলকম্বল এবং ব্যথাটা কালও সারবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু পেনকিলার খেতে ভয় লাগছে। ট্যাবলেটের ভিতরের সেডেটিভ ঘুম পাড়িয়ে দিলে আবার যদি ওই লোকটা ফিরে এসে বলে, ‘ভাত দে হারামজাদা!’   

লকডাউন ডায়েরি – ৩ এপ্রিল, ২০২০

০৩.‌০৪.‌২০২০‌। শুক্রবার

সকাল ৮.‌৫৬

রাত ৩টেয় ঘুম ভেঙে গেল। প্রবল দন্তশূল। এটা আমার প্রতি সিজ্‌নে হয়। গরমকালে এসি চালালে কান দিয়ে ঠাণ্ডা ঢুকে পড়ে। তারপর শুরু হয় বাবারে–মা’রে দাঁতের ব্যথা। তফাত হল, অন্যান্য সিজ্‌নে লকডাউন থাকে না। কাল সন্ধ্যা থেকেই ব্যথাটা শুরু হয়েছিল। মাথা ঝনঝন করছিল ব্যথার চোটে। এতটাই যে, রাতে ফেরার সময় ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢোকাতে গিয়ে বিশ্রি লম্বা কিছু স্ক্র্যাচ পড়ল। তুলকালাম অবস্থা। পেনকিলার ছাড়া উপায় ছিল না। একটু ব্যথা কমায় একটা স্কাল ক্যাপ পরে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হল না। গভীর রাতে সেই মারুনে ব্যথাটা আবার শুরু হল। আবার পেনকিলার।

পেনকিলারটা খেয়ে ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। অ্যালার্ম বাজায় উঠে পড়েছি। ৯টায় মোদির বার্তা।

তার ফাঁকে আমার দীর্ঘদিনের ডেন্টিস্ট সমিতকে ফোনে ধরলাম। ছোটবেলা থেকে চিনি। আগে ওর বাবার পেশেন্ট ছিলাম। এখন ওর। চমৎকার হাত। আমার দাঁত সম্পর্কে সব জানে। শুনেই বলল, অ্যান্টিবায়োটিক চালু করে দাও। তিনটে করে সাতদিন। ব্যথা হলে পেনকিলার খেও। আর জানাল, সব হাসপাতালের আউটডোর বন্ধ। ফলে কাজে যাওয়া হচ্ছে না। খুব ইমার্জেন্সি কেস, মানে মুখ–টুখ ফুলে গিয়েছে এমন হলে বাড়ির কাছের চেম্বারের তালা খুলে এককালীন ট্রিটমেন্ট করছে।

সকাল ৯.‌১১

আগামী ৫ এপ্রিল, রবিবার রাত ৯টায় ঘরের আলো বন্ধ করে বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মোমবাতি,প্রদীপ, টর্চ বা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে হবে। সেটাতেই নাকি সারা দেশের প্রকাশের মহাশক্তি ধরা দেবে। যা বলবে, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেউ একলা নয়। সারা দেশ জোটবদ্ধ। এই হল প্রধানমন্ত্রীর ৯ মিনিটের ভিডিও বার্তার বক্তব্য। সঙ্গে অনুরোধ, ‘কেউ কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে মোমবাতি মিছিল করবেন না।’ স্বাভাবিক। জনতা কার্ফুর বিকেলে থালা বাজাতে বাজাতে দেশ জুড়ে রসক্ষ্যাপার দল রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল তো।

ব্যাডমিন্টনের হোযাট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে রাজু ব্যাখ্যা দিল, ‘পিএম বক্তৃতা শুরু করলেন ৯টায়। বললেন ৯ মিনিট। যে তারিখের কথা বললেন, সেটা ৫ এপ্রিল (‌বছরের চতুর্থ মাস)‌ অর্থাৎ, ৫+‌৪=‌৯, রাত ৯টার সময় ৯ মিনিটের জন্য টাস্ক দিলেন, আজ লকডাউনের নবম দিন, ৫ এপ্রিল লকডাউনের ৯ দিন বাকি থাকবে। ৯ নম্বরটা হল বুধের। যা হল আলোক এবং অগ্নির গ্রহ। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী গ্রহের এনার্জিকে জাগ্রত করছেন। পাশাপাশিই উনি প্রাণ বাঁচানোর জন্য নবগ্রহকে সন্তুষ্ট করছেন।’

ওহ্‌, তাই এত ৯–এর ছড়াছড়ি!‌ টেরিফিক!‌ ভুলেই যাচ্ছিলাম যে এটা ২০২০ সাল।

টুইটার বলছে, গতকাল আমেরিকায় একদিনে সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ১,১৬৯ জন। স্পেনে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ১০,০০০। ইতালিতে মৃত ১৩,৯১৫। সারা পৃথিবীতে মারা গিয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ। আপাতত। ডোনাল্ড ট্রাম্পদের ঝুলিতে তো আর নবগ্রহ নেই।

ভারতে আপাতত মৃত ৫৬ জন। আক্রান্ত আড়াই হাজার। গত ২৪ ঘন্টায় ২৩৪ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। টিভি–তে দেখে মোদির চেহারাটা একটু ঝটকেছে মনে হল। বডি ল্যাঙ্গোয়েজে সেই দার্ঢ্য আর রোয়াবটা নেই। একটু চিন্তিতই লাগছিল। তবে কংগ্রেসের এক্স এমএলএ মিঠু’দা (‌ডি পি রায়)‌ ফোন করে বলল, ‘মোদি গোটা দেশটাকে কীভাবে বোকা বানিয়ে দিয়েছে দেখেছো?‌ কেউ আর লড়াই করে না। ভোগবাদের এমন বড়ি খাইয়েছে, গোটা দেশটা স্টেরিলাইজ্‌ড হয়ে গিয়েছে। ও যা করতে বলছে, লোকে সেটাই করছে। টর্চও জ্বালাবে!‌’

পেনকিলারের এফেক্ট আবার কমে আসছে। ব্যথাটা আবার ঝিলিক দিচ্ছে মাঝেমাঝে। এটা একটা বাড়তি ঝামেলা হয়ে দাঁড়াল!‌

৯.‌৩৩

বিশ্বব্যাঙ্ক করোনা মোকাবিলায় ভারতকে ১ বিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য করবে। এত বড়মাপের অর্থসাহায্য ভারতকে এর আগে কখনও করেনি বিশ্বব্যাঙ্ক। এই অর্থ দেশের সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ব্যয় করা হবে। ভারত ছাড়াও আরও বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকেও সাহায্য করছে বিশ্বব্যাঙ্ক।কিন্তু এটা সাহায্য না ঋণ ? সারা পৃথিবীতে মোট ২০৪টি দেশ করোনায় আক্রান্ত। ‘প্রভাবিত’ নয়। ‘আক্রান্ত’।

বেলা ১১.‌২৩

শচীন, সৌরভ, বিরাটদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বললেন মোদি। করোনা মোকাবিলায় পরামর্শ চাইলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারও করতে বললেন। টিভি–তে সৌরভ বলছিল, মোট ৪০ জন ক্রীড়াবিদ ছিল কনফারেন্সে। তাদের মধ্যে আটজনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। শচীন নাকি মোদিকে বলেছে, ‘আপনি আমায় ৪ নম্বরে বলতে ডাকলেন। ইন্ডিয়ার হয়ে খেলার সময় আমি ৪ নম্বরে ব্যাট করতে নামতাম। এই ম্যাচটাও আমরা দেশের হয়ে জিতব।’ বেশ।

দুপুর ১২.‌৩৫

গতকাল ফেসবুকের ওয়ালে একজন লিখেছিলেন, ‘বাবা–কে খেতে দেওয়ার ব্যাপারটা দেখলাম না। বাকিটা আনপুটডাউনেব্‌ল।’ তাঁকে জবাব দিয়েছিলাম, মেনুটা খুব বোরিং। তাছাড়া, কর্তব্যকে গ্লোরিফাই করাটা লজ্জার। কিন্তু তা–ও রেকর্ডে থাক যে, আজ বাবা–মা’কে খেতে দিয়েছি। বাসনও মেজে দিয়েছি। দাঁতে প্রবল ব্যথা নিয়েও নীচের ঘরটা মুছলাম।

দুপুর ৩.‌০৮

উপরে এসে রবার্ট ডি‘নিরোর ‘দ্য স্কোর’ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠে দেখছি, শুভব্রত মেসেঞ্জারে লিখেছে, ময়দানের ঘোড়াটা ব্যাপারটা মানেকা গান্ধী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলেছেন। যিনি মানেকাকে বলেছেন, স্থানীয় কাউন্সিলার ঘোড়াদের খাবারের টাকাটা দিতে পারেন। ময়দানে বেওয়ারিশ ঘুরতে–থাকা ঘোড়াগুলো যাতে অসহায় মৃত্যু না হয় তার একটা ব্যবস্থা হবে। ‘পিপ্‌ল ফর অ্যানিম্যাল্‌স’–এর অজয় দাগা ওদের খাবার দিতে শুরু করেছেন। লোকাল কাউন্সিলার জলের ব্যবস্থা করছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলও খাবার দিচ্ছে।

দেখে আশ্বস্ত হলাম। আরও আশ্বস্ত হলাম এটা দেখে যে, এখনও লিখে কিছু কাজ হয়!‌ এই পেশায় বেশিদিন থাকলে এমনিতেই লোকে সিনিক হয়ে যায়।

বিকেল ৫.‌০২

করোনা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। বলে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে পাশাপাশিই বললেন, সতর্ক থাকতে হবে। আজ তিনি যা পরিসংখ্যান দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বাড়েনি। এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত ৩৮ জন। করোনা থেকে মুক্ত হয়েছেন ১২ জন। আজই আরও ৯ জন সুস্থ হয়েছেন। সরকারি কোয়ারেন্টিন থেকে ছাড়া হয়েছে ৩,২১৮ জনকে। এখনও সরকারি কোয়ারেন্টিনে আছেন ১,৮৯২ জন।

বিকেল ৫.‌৩১

করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি পিট্‌সবার্গ স্কুল অফ মেডিসিনের। তাদের দাবি, ইঁদুরের উপর প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে। এখন মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষা। যা শুনে টিভি–তে চিকিৎসক কুণাল সরকার বললেন, ‘খবরটা খুবই ভাল। পৃথিবীর ১৮–২০ টা ইনস্টিটিউট করোনার অ্যান্টিবডি তৈরির ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভারতেও একটা ইনস্টিটিউট করছে। তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়া পার হয়ে সেটা বাজারে আসতে আসতে ১৮ মাস থেকে দু–বছর সময় লেগে যায়।’

সন্ধ্যা ৬.‌৩৫

বালা সুব্রহ্মণ্যম লোগেশ। লকডাউনে হাঁটার বলি। বয়স মাত্র ২২ বছর। মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধায় পড়াশোনা করছিলেন। লকডাউনের পর বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে তামিলনাড়ুর বাড়িতে রওনা দিয়েছিলেন। খানিকটা ট্রাকে, বাকিটা হেঁটে বোয়েনপল্লিতে পৌঁছনোর পর পুলিশ আটকে মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। খাবারও দেওয়া হয়। সেখানেই বুধবার মাঝরাতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় লোগেশের। পোস্টমর্টেমের পর ডাক্তাররা বলেছেন, লোকেশের হার্ট হাঁটার ধকল নিতে পারেনি।চোখে জল এল।

রাত ৮.‌২৪

এবার রাজ্যসভার নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল। অবশ্য এটা যে কেন এতদিন পিছোয়নি, সেটাই রহস্য!‌

রাত ৮.‌৩৯

টুইটারে একটা কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখলাম।

— আশা করি, লকডাউনে তুমি এবং তোমার পরিবার ঠিকঠাক আছো। আমি আবার বলছি, এ মাসের বাড়িভাড়াটা তুমি এখন না দিলেও চলবে। পরে তোমার সুবিধেমতো দিও। এখন টাকাটা জমিয়ে রাখো তোমার অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস যা যা কিনতে হবে তার জন্য।
— থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিয়িং কাইন্ড। আসলে আমি তিনমাসের ভাড়া রেডি রাখি। তাই ভাড়ার টাকাটা আমার কাছে আছে। থ্যাঙ্ক ইউ ওয়ান্‌স এগেন ফর দ্য অফার।
— নেহা, প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ। এটা আমার অফার নয়। এটা আমার রিকোয়েস্ট। অনুরোধ।

চোখে জল চলে এল।আবার।