লকডাউন ডায়েরি – ২৭ মে, ২০২০

২৭.‌০৫.‌২০২০। বুধবার

সকাল ৮.‌৫৪

সকাল থেকে গুমোট আবহাওয়া। গাছের পাতায় নট নড়নচড়ন। ঘাম হচ্ছে খুব। সঙ্গে মাথাটাও টিপটিপ করছে। আজ কি ঝড়বৃষ্টি হবে?‌

আজ থেকে কলকাতার রাস্তায় আবার অটো চলাচল শুরু হল। একটা অটোয় সর্বাধিক দু’জন যাত্রী নেওয়া যাবে। চালক–সহ তিনজন। যাত্রীরা পিছনে বসবেন। স্বভাবতই কোনও কোনও রুটে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। চারজনের ভাড়া দু’জনের থেকে তুলতে হবে তো। চালকদের হাতে গ্লাভস পরতে হবে। সঙ্গে স্যানিটাইজার রাখতে হবে। যাত্রী এবং চালকদের মুখে মাস্ক বাধ্যতামূলক।

আজ থেকে কলকাতায় সরকারি বাসের সংখ্যাও বাড়ছে। শহর এবং শহরতলিতে আরও ৪০টি রুটে বাস চলাচল শুরু হচ্ছে। সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাস চলবে। ২০ জনের বেশি যাত্রী নেওয়া যাবে না। উত্তরবঙ্গে সরকারি দূরপাল্লার বাস চালু হচ্ছে। পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও। বলা হয়েছে, চালক এবং কন্ডাক্টরদের বাধ্যতামূলকভাবে পিপিই পরতে হবে। বাসে ওঠার আগে থার্মাল স্ক্রিনিং এবং স্যানিটাইজার দিয়ে হাত ধোওয়া বাধ্যতামূলক।

কাল থেকে কলকাতা এবং বাগডোগরায় বিমান চলাচল শুরু হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সরকারের গাইডলাইন মেনে বিমানে সফর করতে হবে। সোমবার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিমান চলাচল শুরু হয়েছিল। প্রথমদিনই ৩৯,০০০ যাত্রী ছিলেন। তাঁদের মধ্যে গতকাল এবং আজ দু’জনের দেহে করোনাভাইরাস মিলেছে। দু’টি বিমানই স্যানিটাইজ করা হচ্ছে। একটি বিমানের বাকি ৯০ জন যাত্রীর করোনা টেস্ট করা হয়েছে। নেগেটিভ। অন্য বিমানের বাকি যাত্রীদের ১৪ দিনের জন্য হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।

একদিনে ৩৯,০০০ যাত্রীর মধ্যে মাত্র দু’জনের দেহে করোনা সংক্রমণ পাওয়াটা কি খুশি হওয়ার মতো খবর?‌ আপাতদৃষ্টিতে তা–ই। আবার উল্টোদিক থেকে দেখলে এত সাবধানতার পরেও দু’জনের দেহে সেই সংক্রমণ পাওয়াই গেল!‌ চিনের ইউহান থেকে করোনার সংক্রমণ কিন্তু ছড়িয়েছিল এয়ার ট্রাভেলের কারণেই। ইউহান থেকে ইতালি সরাসরি ফ্লাইট ছিল। সেই উড়ানেই কোভিড–১৯ প্রথম ইতালিতে পৌঁছয়। সেখান থেকে ডালপালা মেলে গোটা ইউরোপে।

সকাল ৯.‌১৩

চারদিক দেখেশুনে মনে হচ্ছে, জীবন আবার চালু হতে শুরু করেছে। তার কী মূল্য চোকাতে হবে, সেটা এখনই জানা নেই। বোঝাও যাচ্ছে না। কিন্তু লোকজনের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। ফলে তারা এবার রোঁয়া ফুলিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে চাইছে। কোভিডের চোখে চোখ রাখতে চাইছে মরিয়ার মতো। তাতে সংক্রমণ কিছু বাড়বে। কিছু লোকের মৃত্যু হবে। কিন্তু অগ্রগমনটা জারি থাকবে। যারা মারা যাবে, তাদের না হয় আমরা ‘কোল্যাটেরাল ড্যামেজ’ বলে ইতিহাসের মহাফেজখানায় নথিভুক্ত করে রেখে দেব। নাম দেব কোভিড শহিদ।

সকাল ১০.‌৫৮

রাজ্যপাল আবার মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছেন। পরপর তিনটি টুইট করেছেন তিনি। তিনটি লাল পিঁপড়ে।

‘বিদ্যুৎ, জল এবং জরুরি পরিষেবা অবিলম্বে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হোক। কলকাতা–সহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষের যে ভয়ঙ্কর দুর্দশার খবরাখবর পাচ্ছি, তা এত হৃদয়বিদারক যে এখানে না–ই বা বললাম। এখন পরস্পরকে দোষারোপ করা বা বলির পাঁঠা খোঁজা বন্ধ হওয়া দরকার।

‘বরিষ্ঠ মন্ত্রীরা যখন তাঁদের ক্ষোভ জনসমক্ষে নিয়ে আসেন বা বিধায়ক জনরোষের শিকার হন, তখন বাস্তবচিত্রটা বড় বেশি প্রকট হয়ে পড়ে। গ্রামীণ এলাকার অবস্থা এখনও খুবই ভয়াবহ। সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। এই এলাকাগুলিকে উপেক্ষা করা যায় না।

‘মুখ্যমন্ত্রীকে অনুরোধ, সাংবিধানিক রীতি মেনে আমাকে এখনকার বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত করান।

ইন্টারেস্টিং হল, তিনটি টুইটই বাংলায় লেখা। উদ্দেশ্য খুব পরিষ্কার— যাতে আমজনতা সেটি পড়তে এবং বুঝতে পারে। পাশাপাশিই, রাজ্যপাল সিইএসসি ইস্যু, সাধন পান্ডের বিস্ফোরণ এবং বিধায়ক খালেক মোল্লার মার খাওয়ার ঘটনাগুলিও টেনে এনেছেন। তবে তৃতীয় টুইটের শেষ বাক্যটি মেনে নবান্ন যে তাঁকে বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে ‘অবগত’ করাবে না, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত।

বেলা ১১.‌৩৭

বেলেঘাটা থানার এক আধিকারিক করোনায় আক্রান্ত। তাঁর পরিবারের আরও ৬ জন সদস্যও কোভিড পজিটিভ। সকলেই বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে ভর্তি। পার্ক স্ট্রিটের এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের আধিকারিকও করোনায় আক্রান্ত। ব্যাঙ্কের বাড়িটি আপাতত স্যানিটাইজ করা হচ্ছে।

দুপুর ১২.‌২৩

সকাল থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় দুটো ছবি দেখে চমৎকৃত লাগছে। যত দেখছি, তত অবাক হচ্ছি!‌

প্রথম ছবিতে একটি মেয়ে বুকজল ঠেলে এগোচ্ছে। ডানহাতে ধরা নিউজ চ্যানেলের বুম। উপরে লেখা ‘কলকাতা টিভি’। একহাত পিছনে তার ক্যামেরাম্যান। সেও বুকজলে। উঁচু করে ধরা ডানহাতে ভিডিও ক্যামেরা। বাঁ–হাতটি আঁকড়ে ধরে আছে মহিলা সহকর্মীর পিছনে বাড়ানো বাঁ–হাত। যতদূর চোখ যায়, বন্যার ঘোলাজল। ছবিটা মারাত্মক পাওয়ারফুল!‌ শক্তিশালী!‌ দু’জনেই আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। কিন্তু যতবার দেখছি, শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে আসছে। আশাবাদী লাগছে। মনে হচ্ছে যাক, এখনও জার্নালিজম বেঁচে আছে!‌ বেঁচে থাকুক।

দ্বিতীয় ছবিটিও ‘কলকাতা টিভি’–রই এক রিপোর্টারের। ছিপছিপে চেহারা। শার্ট–ট্রাউজার্স পরা। বিনাদ্বিধায় কোমরজলে নেমে পড়ে জলবন্দি মানুষের সঙ্গে কথা বলছে। তার সঙ্গেও নিশ্চয়ই একজন ক্যামেরাম্যান ছিল।

‘কলকাতা টিভি’–র সঞ্জয় ভদ্রকে ফোন করে জানলাম, প্রথম ছবির দু’জন সুচন্দ্রিমা–কৌশিক। ঘটনাস্থল সুন্দরবনের রাঙাবেলিয়া। দ্বিতীয় ছবির দু’জন দীপ্তিমান–সুবীর। ঘটনাস্থল সুন্দরবনেরই গোসাবা। সঞ্জয়কে বললাম, আমার হয়ে ওদের কুর্নিশ জানাস। ওদের জন্যই এখনও আশাবাদী হওয়া যায়।

রোজকার কাজের পাশাপাশিই চিরকাল বিভিন্ন ইনসিডেন্ট কভার করেছি। ঘটনা, দুর্ঘটনা, বিস্ফোরণ, দুর্যোগ— যা–ই হোক, সবসময় বিশ্বাস করেছি, স্পটে পৌঁছনোর কোনও বিকল্প নেই। তা সে যতই দুর্গম আর দুরূহ যাত্রা হোক। ঘটনাস্থলের যথাসম্ভব কাছাকাছি থাকতে হবে, গ্রাউন্ড জিরোয় পৌঁছতে হবে। এই ছিল আমার পেশাগত জীবনের থাম্বরুল। এখনও তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনও কারণ দেখি না। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, বেশিরভাগ পেশাদারের মধ্যে সেই উৎসাহ এবং সংকল্পটা নেই। খারাপ লাগে।

জীবনের সব ক্ষেত্রেই একশ্রেণির লোক শর্টকাটে বিশ্বাস করে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ যে সফল হয় না, তা–ও নয়। কিন্তু কোথাও একটা গিয়ে তারা আটকেও যায়। বেস ক্যাম্প পর্যন্ত পৌঁছয়। কিন্তু শৃঙ্গে আরোহণ করতে পারে না। এই ছেলেমেয়েগুলো চূড়ায় উঠতে পারবে। সেই বিশ্বাস আমার আছে। ওদের এই ছবি পেশার উপরেও আমার আস্থা আর বিশ্বাস ফিরিয়ে দিল।

দুপুর ৩.‌২৩

হাওড়ার বেলুড়ে গাছ কাটতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে এক দমকলকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে সিইএসসি–র বিরুদ্ধে। ভেঙে পড়া গাছে বিদ্যুৎবাহী তার জড়িয়েছিল। দমকলকে নাকি সিইএসসি–র তরফে বলা হয়েছিল, ওই তারে বিদ্যুৎ নেই!‌

শুনে হতভম্ব লাগছে। মানুষের জীবনকে এভাবে এতটা হেলাফেলায় দেখা যায়?‌ এতটা ক্যাজুয়্যালি?‌ বিদ্যুৎ সরবরাহ করে যে সংস্থা, তারা জানবে না একটা বিদ্যুৎবাহী তার জীবন্ত অবস্থায় আছে না মৃত?‌ সেই উদাসীনতার জন্য একটি ছেলের প্রাণ চলে যাবে?‌ এত শস্তা মানুষের জীবন?‌

প্রত্যাশিতভাবেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী বললেন, ‘আমি শক্‌ড!‌ সিইএসসি–র মিস ইনফর্মেশন ছিল। পুলিশকে বলেছি অবিলম্বে অ্যাকশন নিতে। বলেছি, অ্যারেস্ট করতে হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, মৃত দমকলকর্মীর পরিবারকে এককালীন ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। সঙ্গে পরিবারের একজনকে চাকরি। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, যিনি এভাবে মারা গেলেন, তাঁর পরিজনরা কি কয়েকঘন্টা আগেও ভাবতে পেরেছিলেন এমন একটা বিপর্যয় নেমে আসছে?‌ টিভি–তে দেখছিলাম, একটা ট্রলিতে করে তড়িদাহত দমকলকর্মীকে হাসপাতালে করিডর দিয়ে ঠেলে ঠেলে প্রায় দৌড়েই নিয়ে যাচ্ছেন তাঁর সহকর্মীরা। যদি বাঁচানো যায়!‌ শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজেরাই চেস্ট পাম্প করছিলেন ঘনঘন।

শেষরক্ষা হয়নি। দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এই আমাদের রাজ্য। এই আমাদের চারপাশের লোকজন। সিইএসসি–র যে লোকটি ভুল তথ্য দিয়েছিল, তার গলা দিয়ে ডাল–ভাত নামবে এরপর?‌ তার পরিজনেরা তাকে দুয়ো দেবে না?‌ তার জন্য লজ্জিত হবে না?‌ তার মধ্যে কি কোনও অনুতাপ আসবে?‌ একবারও?‌

দুপুর ৩.‌৫০

মহারাষ্ট্র থেকে আগত পরিযায়ী শ্রমিকবাহী ট্রেন নিয়ে গভীর উদ্বেগে মুখ্যমন্ত্রী। আজ রাতেই হাওড়ায় বেশ কয়েকটি ট্রেন পৌঁছনোর কথা। নবান্নে তিনি বলছেন, ‘করোনা তো আমরা কন্ট্রোল করে ফেলেছিলাম। তারপর এখন ট্রেন ঢোকাচ্ছে!‌ রেলমন্ত্রক দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো কাজ করছে। গায়ের জোরে সব করছে। এরা আমাকে রাজনৈতিকভাবে ডিস্টার্ব করতে গিয়ে বাংলার সর্বনাশ করছে। এরপর বাংলায় হাজার হাজার করোনা আক্রান্ত হলে কেন্দ্র দায় নেবে তো?‌ প্রধানমন্ত্রী আর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে বলব, প্লিজ সিরিয়াসলি দেখুন, যাতে করোনা না বাড়ে। সর্বত্র করোনা বাড়ছে। সমস্ত রাজ্যে।’

দীর্ঘ বৈঠকে আরও যা যা বললেন মুখ্যমন্ত্রী, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল—

১. ‌কলকাতার গাছের গুঁড়ি সুন্দরবনে নিয়ে গিয়ে নদীতে বাঁধ দেওয়ার কাজে ব্যবহার করা যায়। তাছাড়া দক্ষিণ ২৪ পরগনায় সুন্দরবনের কাছাকাছি যে সমস্ত গাছ ঝড়ে পড়ে গিয়েছে, সেগুলোর গুঁড়িও ট্রলারে করে সুন্দরবনে নিয়ে যাওয়া যায়। ববি (‌ফিরহাদ হাকিম)‌ কলকাতা থেকে আরও কিছু গাছ দিয়ে দেবে।
২.‌ সুন্দরবনের নোনা জলে ধান আর মাছ চাষ হবে। সেই ধানের বীজের নাম হবে ‘নোনা স্বর্ণ’। আর সেখানে যে মাছ হবে, তার নাম হবে ‘নোনা মৎস্য’।

কিন্তু সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কথোপকথন। যা মুখ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘আমি অমিত শাহকে বলেছিলাম, এত টিম পাঠাচ্ছেন পাঠান। আপনার যদি মনে হয়, আমার সরকার পারছে না, আপনি নিজে দায়িত্ব নিন না। সরকার ভেঙে দিন। আপনি করোনাটাকে সামলান। আমার কোনও আপত্তি নেই। তবে আমি তাঁকে থ্যাঙ্কস জানাচ্ছি। উনি এখানে প্রেজেন্ট নেই। তা–ও বলছি, উনি বলেছিলেন, না–না তেমন তো কিছুই হয়নি। নির্বাচিত সরকার ভেঙে দেব কী করে?‌’

সন্ধ্যা ৬.‌০০

স্কুল বন্ধের মেয়াদ আরও বাড়ল। আপাতত ৩০ জুন পর্যন্ত রাজ্যে সমস্ত স্কুল বন্ধ থাকবে। ঘোষণা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়।

শিক্ষামন্ত্রী জানাচ্ছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ে চিন্তা তো আছেই। পাশাপাশি ঘূর্ণিঝড়েও আটটি জেলার বহু স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলায় জেলায় ফিরে আসা পরিযায়ী শ্রমিকদের বসবাসের জন্যও বহু স্কুল ব্যবহার করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ৩০ জুন পর্যন্ত সমস্ত স্কুল বন্ধ থাকবে।

সন্ধ্যা ৬.‌৩০

ঝড় উঠেছে। প্রবলবেগে। সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গেই শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে চিন্তিত এবং উদ্বিগ্ন হোয়াট্‌সঅ্যাপ ঢুকতে শুরু করেছে টুং–টুং করে। একটাই প্রশ্ন— আবার ঝড়?‌

কারণ, সেদিনও বুধবার ছিল। আজও বুধবার। শঙ্কিত শহরবাসীর আমপানের স্মৃতি মনে পড়ে গিয়েছে। ট্রমা ফিরে আসছে ভীমবেগে। অফিসের বারান্দায় গিয়ে দেখলাম, সেদিনের মতো না হলেও আজও চারদিক ঝোড়ো বাতাস আর বৃষ্টিতে ঝাপসা। সেদিন ঝড়ের স্পষ্ট গর্জন শুনেছিলাম। আজ সেটা নেই। আজ একটা ধোঁয়াটে ভাব চারদিকে। সামনের জমিতে একটা মাঝারি সাইজের গাছ মড়মড় করে উপড়ে গেল। অফিসের কোথাও একটা অ্যাসবেস্টসের চাল হাওয়ার চাপে লাফাতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে, উড়ে গেলেও যেতে পারে। বৃষ্টির প্রবল ছাঁট আসছে। দাঁড়ানো যাচ্ছে না। কিন্তু এটা ঘূর্ণিঝড় নয়। এটা আমপান নয়। যারা উদ্বিগ্ন হয়ে খবর নিচ্ছিল, তাদের বললাম, এটা ঘূর্ণিঝড় নয়। কালবৈশাখী।

সন্ধ্যা ৬.‌৪৫

ঠিকই ভেবেছিলাম। ঝড় থেমে গিয়েছে। তবে বৃষ্টিটা এখনও পড়ছে। আবহাওয়া দফতর বলছে, ওটা কালবৈশাখীই ছিল। তবে যথেষ্ট জোরাল। হাওয়ার গতিবেগ ছিল ঘন্টায় ৯৬ কিলোমিটার। স্থায়িত্ব ছিল ১ মিনিট। আমপানের গতিবেগ ছিল ঘন্টায় আরও ৩৭ কিলোমিটার বেশি। এই ঝড়েও অবশ্য কয়েকটি পুরনো বাড়ির অংশ ভেঙে পড়েছে। পাঁচিল ভেঙে পড়েছে কোথাও কোথাও। শোভাবাজারে একটা ম্যাটাডরের উপর গাছ ভেঙে পড়েছে। শহরের আরও কিছু এলাকায় আরও কিছু বড় এবং পুরোন গাছ ভেঙে পড়েছে। দুর্গাপুরে বাজ পড়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে কলকাতা ও লাগোয়া এলাকায় কারও হতাহত হওয়ার খবর নেই।

ডায়েরিতে এই এন্ট্রিটা করতে করতে মনে হচ্ছে, এই–ই হল ট্রমা!‌ ঝড় শুরু হলেই যা এক ধাক্কায় আমাদের উড়িয়ে নিয়ে ফেলবে সেই বুধবারে। সম্ভবত ভবিষ্যতে যতবার ঝড় হবে, ততবার আমাদের মনে ঘুরেফিরে আসবে এক বুধসন্ধ্যার বজ্রগর্জন।

রাত ৯.‌৩৫

আমপানের পর আজ অষ্টমদিন। এখনও পুরোপুরি মাথা তুলে দাঁড়াতে পারল না কলকাতা। এখনও শহরের সব জায়গায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ফিরে এল না। এখনও সমস্ত শহরবাসী পানীয়জল পেলেন না।

কেন এমন অবস্থা?‌ কেন সম্পন্ন বাড়ির বধূরা রাস্তায় বেরিয়ে এসে পথ অবরোধ করছেন?‌ গত ক’দিন বারবার নিজের মনে এটা ভেবেছি। বিভিন্ন পরিচিত লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। সাধারণ মানুষ, চাকুরে, শিক্ষক–শিক্ষিকা, শিল্পোদ্যোগী, আমলা, উচ্চপদস্থ আইপিএস এবং তাঁদের অধস্তন পুলিশ অফিসার— যাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তাঁকেই প্রশ্ন করেছি। এটা কেন হল?‌ গত এক সপ্তাহে সেই বিক্ষিপ্ত কথোপকথনের মন্থনের নির্যাস এই লকডাউন ডায়েরিতে লিখে রাখা জরুরি। এর বিচার করবে ভাবীকাল।

১.‌ এ রাজ্যে প্রশাসন বরাবর শাসকের পাশে থেকেছে। শাসকের কথা শুনে চলেছে। শুধু এ রাজ্য কেন, সব রাজ্যেই। প্রশাসন সবসময়েই প্রভুর কথা শুনে চলে। সেটাই দস্তুর। কিন্তু তার মধ্যেও একটা সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এমনকিছু অফিসার ছিলেন, যাঁরা এলাকায় নিজের মতো করে কাজ করতেন। তাঁদের সেই স্বাধীনতা ছিল। কাজের পরিসরও ছিল। যে কারণে তখন এমন দৃষ্টান্তও ছিল যে, কোনও অফিসার বদলি হলে এলাকায় হাহাকার পড়ে যেত। লোকজন কান্নাকাটি শুরু করত। যে করে হোক, তাঁকে ধরে রাখার চেষ্টা করত। প্রয়োজনে সরকারের কাছে স্মারকলিপি দিত। এখন তেমন ঘটনা আর দেখা বা শোনা যায় না।

২.‌ যে কোনও বড় ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে লাইফলাইন হল কমিউনিকেশন। যোগাযোগ। যাতে বিপর্যয় হলে অন্তত যোগাযোগটা খোলা থাকে। অথচ আমপানের সময় তেমন কোনও আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। কারও মনে হয়নি, তেমন হলে কলকাতা পুলিশের ট্র্যাফিক অয়্যারলেস সিস্টেমকে কাজে লাগানো যায়। ২০১৫ সালে রিনোভেশন এবং আপগ্রেডেশনের পর ২ থেকে ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত যে সিস্টেমকে মোবাইল ফোনের মতো ব্যবহার করা যায়। যে সিস্টেম হ্যাক করা যায় না। ফলে গোপনীয়তাও অটুট থাকে।

ওই অয়্যারলেস সিস্টেম–সহ পুলিশকর্মী, কলকাতা পুরসভা, সিইএসসি এবং ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট দলের সদস্য নিয়ে অনায়াসে ১৫ বা ২০ জনের একেকটি টিম আগে থেকে তৈরি করে রাখা যেত। ঝড়ের পর এলাকা ভাগ করে তাদের দ্রুত কাজে নামানো যেত। তাতে গোটা শহরের মধ্যে একটা আপৎকালীন যোগাযোগ ব্যবস্থা কাজ করত। এর জন্য বিরাট বৈজ্ঞানিক হওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন হয় ভূয়োদর্শী হওয়ার। প্রয়োজন হয় ভিশনের।

৩.‌ ঘূর্ণিঝড়ের আগে দমকল, সিইএসসি, মোবাইল সংস্থা, স্বাস্থ্য বা ত্রাণের মতো ‘ইউটিলিটি সার্ভিস’ প্রদানকারী সংস্থা এবং দফতরগুলিকে নিয়ে কোনও বৈঠক হয়নি। অথচ, কলকাতায় দুর্গাপুজোর আগেও বাধ্যতামূলকভাবে ওই বৈঠক প্রতিবছর হয়ে থাকে। জেলাশাসক, পুলিশ সুপারদের নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে ঠিকই। কিন্তু যে ম্যাগনিটিউডের বিপর্যয় ধেয়ে আসার পূর্বাভাস ছিল, তাতে শুধু উপরতলাকে নির্দেশ দিয়ে লাভ হয় না। হয়ওনি।

৪.‌ প্রশাসনের কিছু কিছু নিজস্ব প্রকরণ আছে। যে প্রকরণ বলে, যারা মাঠে নেমে খেলবে, তারা ঠিক আছে। কিন্তু রিজার্ভ বেঞ্চটাকেও তেল খাইয়ে সমানভাবে চাঙ্গা রাখতে হবে। বড় ম্যাচে ফার্স্ট ইলেভেনের প্লেয়ার ফেল করলে যাতে টগবগে বিকল্পকে মাঠে নামানো যায়।

পরিশেষে, রাজনীতিতে মানুষ তাকেই বিশ্বাস করে, যে তাকে রক্ষা করে। প্রোটেক্ট করে। তার মাথায় নিরাপত্তার ছাতাটা ধরতে পারে।

বৃষ্টি এখনও অঝোরধারে ঝরছে। ছাতা ধরার লোক পাওয়া যাচ্ছে না!‌‌

4 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ২৭ মে, ২০২০

  1. আজকের লকডাউন ডায়েরী অসাধারণ হয়েছে —তবে তুমি একটা কথা ঠিক বলেছো যে বিজেপি সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছে কি করে রাজনীতি বজায় রেখে সব কিছু দখল করা যায় —সে টা যে এখনি হবার নয় তা বুঝতে পারছেনা। এদের এই রাজনীতি আর নেওয়া যাছেন 👌👌👌👌
    শেয়ার করলাম।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s