লকডাউন ডায়েরি – ১২ মে, ২০২০

১২.‌০৫.‌২০২০। মঙ্গলবার

সকাল ৭.‌৫২

কাল রাতে বাড়িতে ঢোকার মুখে সিঁড়ির সামনে জুতোর তলায় কীসের যেন একটা কটাস করে আওয়াজ হল। নিচে তাকিয়ে প্রথমে মনে হল একটা শামুকের খোল। তারপর ভাল করে ঠাহর করে দেখলাম, ও হরি!‌ খোল তো নয়। একটা জীবন্ত শামুক। ঘন্টায় ১ মিলিমিটার গতিতে চলছে। নিশ্চয়ই বাগান থেকে পরশুদিন যাত্রা শুরু করে আজ রাতে সিঁড়ির কাছে পৌঁছেছে। কে জানে কবে গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছবে। দেখে আশ্বস্ত হলাম, ওটা পচা শামুক নয়। জুতো পরে থাকায় আমার পা–ও কাটেনি। ফলে পচা শামুকে পা কাটার ব্যাপারটা এ যাত্রা এড়িয়ে যাওয়া গেল।

সারা রাত ভয়াবহ গরম। ভয়াবহ!‌ ঘর থেকে ওয়াশরুম যাওয়ার জন্য বেরোলেও মনে হচ্ছে থর মরুভূমিতে কন্ডাক্টেড ট্যুরে এসেছি। অথচ কাল রাতটা কত অন্যরকম ছিল। ওয়েদার হল পৃথিবীতে সবচেয়ে আনপ্রেডিক্টেব্‌ল!‌

কাল অনেক রাত পর্যন্ত হেডফোনে সলিল চৌধুরী শুনছিলাম। তারপর কানে ওই ঝিঙেবিচি গোঁজা অবস্থাতেই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভেঙে গেল এক যান্ত্রিক নারীকণ্ঠে বারংবার ‘প্লিজ চার্জ দ্য হেডসেট’ আর্জি শুনে। প্রথমে একটু ঘাবড়েই গিয়েছিলাম। কোন মহিলা এসে কানে কানে এসব বলছে! তারপর মনে হল, ‌আরে! এটা তো শিক্ষিত হেডসেট। কথা বলতে পারে। খাবার ফুরিয়ে গেলে নিজে চেয়ে নিতে পারে। কানের গয়নাদুটো খুলে বেস–এ চার্জে বসিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকাল ৯.‌৩০

লকডাউন কি আরও বাড়বে?‌ মে মাসের শেষ পর্যন্ত চলবে?‌ তারপর করোনার সঙ্গে বোধহয় সহবাস করতে শিখতে হবে সকলকে। যারা পারবে, তারা টিকে থাকবে। বাকিরা ঝরাপাতার মতো খসে পড়বে। দুঃখজনক। কিন্তু কারও কিছু করার থাকবে না। নতজানু হয়ে পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে।

সহবাসের জন্য স্ত্রী হিসেবে করোনা কেমন হবে?‌ অথবা স্বামী হিসেবে?‌ দাপুটে হবে। প্রতাপশালী হবে। ভয় পেতে হবে অহরহ। সারাজীবন সন্দেহের চোখে তার দিকে তাকাতে হবে। জীবনযাপনে বেচাল দেখলেই ঘ্যাঁক করে ধরবে। এবং কোনও অবস্থাতেই ডিভোর্স দেবে না। খুব মুশকিল!‌

ওহ্‌, কাল থেকে কলকাতায় মোট ১৫টা রুটে সরকারি বাস চালু হচ্ছে। বলা হচ্ছে, বাস চলবে কনটেনমেন্ট জোন এড়িয়ে। কিন্তু কনটেনমেন্ট জোন তো চারদিকেই!‌ কীভাবে রুট তৈরি হবে?‌ ২০ জনের বেশি যাত্রী বাসে থাকবে না। কাল থেকে অ্যাপক্যাবও চালু হওয়ার কথা। তাতেও দু’জনের বেশি যাত্রী থাকতে পারবেন না। আর ট্রাভেল করতে পারবেন শুধু স্বাস্থ্যকর্মী এবং সরকারি আধিকারিকরা। অর্থাৎ, যাঁরা এই পরিস্থিতিতে আপৎকালীন পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত। তাও পরিচয়পত্র এবং ই–পাস দেখিয়ে। গাড়িতে স্যানিটাইজার রাখা বাধ্যতামূলক। চালককে মাস্ক, গ্লাভস এবং ফেস শিল্ডও ব্যবহার করতে হবে।

আজ বিকেল থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন পরিষেবা চালু হচ্ছে। দিল্লি থেকে যেমন ১৫টি প্রান্তিক স্টেশনের অভিমুখে ১৫টি ট্রেন যাত্রা শুরু করবে। আবার সেই স্টেশনগুলি থেকে ১৫টি ট্রেন যাত্রা শুরু করবে দিল্লির দিকে।চলন্ত ট্রেনে কেক–বিস্কুটের মতো শুকনো খাবার আর পানীয় জল পাওয়া যাবে শুধু। যে যাত্রার দিকে তাকিয়ে আছে গোটা দেশ। দীর্ঘ এই যাত্রাপথে গণ সংক্রমণ ছড়াবে কিনা, তা নিয়েই শঙ্কা। ছড়ালেও বা আর কী করণীয়? ‌উপায় তো নেই।

ঝুঁকি? ‌তা তো বটেই। কিন্তু তবু কপাল ঠুকে সব আবার ধাপে ধাপে চালু করতে হবে। উপায় নেই। সত্যিই উপায় নেই।

বেলা ১১.‌১৫

এইমাত্র ওয়ার্কআউট করে উঠলাম। আজ একটু তাড়াতাড়ি। কারণ, তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। কারণ, তাড়াতাড়ি ব্যাঙ্কে গিয়ে মায়ের পেনশন তুলতে চাই।

ওয়ার্কআউট করতে করতে একটা ফ্ল্যাশ হল। গত প্রায় আটবছর ধরে সপ্তাহে চারদিন ভোরে উঠে লেক গার্ডেনসের ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলার দৃশ্যগুলো। আর খেলতে নামার আগে কোর্টের পাশে ওয়ার্ম আপ। কতদিন খেলতে যাই না!‌ আর কোনওদিন যেতে পারব?‌ গেলেও কি মাস্ক পরে যেতে হবে?‌ ব্যাড বাডিদের সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে এ জীবনে?‌ জেতা হবে?‌ হারা হবে? ঝগড়া হবে?‌ ‌লাইনকল নিয়ে ঝামেলা হবে?‌ খেলার পর সকলে মিলে হজমোলা চা খাওয়া হবে?‌ কী জানি!‌

বেলা ১১.‌২১

স্বাস্থ্যসচিব বিবেক কুমারকে সরিয়ে দেওয়া হল পরিবেশ দফতরে। নতুন স্বাস্থ্যসচিব হলেন পরিবহণ সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগম। ব্যাপারটা নাকি কাল রাতেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল। আজ সকালে নির্দেশিকা জারি হয়েছে।

কী কারণে বদলি?

‌টিভি বলছে, বিবেকের কাজকর্মে নাকি চিকিৎসকদের একটা বড় অংশ অখুশি ছিল। সেখান থেকে অভিযোগ আসছিল নবান্নে। চিকিৎসকরা নাকি করোনা মোকাবিলায় সঠিক পরিকাঠামো এবং সরঞ্জাম পাচ্ছিলেন না। কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ নাকি আমলামহলের অন্দরের সমস্যা। বেশ কিছুদিন ধরেই স্বাস্থ্যসচিবের সঙ্গে এক শীর্ষ আমলার গোলমাল শুরু হয়েছিল। সেইসময়েই নজরে আসে, করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে রাজ্য সরকারের তথ্যের বিস্তর ফারাক হয়ে যাচ্ছে। ইন ফ্যাক্ট, বিবেক নাকি কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিবকে লেখা একটি চিঠির সঙ্গে একস্ট্রা একটা পাতা জুড়ে দিয়েছিলেন। যাতে বলা হয়েছিল, রাজ্যে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি।

মোট কথা, বিবেককে যেতে হল। এর আগে রেশনে অব্যবস্থার জেরে বদলি করা হয়েছিল খাদ্যসচিবকে। সুতরাং, বিবেক হলেন দ্বিতীয় আমলা যাঁকে করোনা খেয়ে নিল।

দুপুর ১২.‌০২

আজ রাত ৮টায় আবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ প্রধানমন্ত্রীর। মনে হচ্ছে, লকডাউন নিয়ে কিছু একটা বলবেন। প্রশ্ন হল, ঘরবন্দিত্বের মেয়াদ কি আরও বাড়বে। বাড়লেও কোন কোন ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হবে। মেয়াদ বাড়ালেও ছাড় দেওয়া ছাড়া তো উপায় নেই। লকডাউন তো আর অনন্তকাল চলতে পারে না। প্রায় দু’মাস হতে চলল গোটা দেশ থমকে। এভাবে আর কতদিন চলবে?‌ কিন্তু এই সময়টাই সবচেয়ে ভালনারেব্‌ল। রাজনীতি আর প্রশাসনে টাইমিংটাই হল আসল। দেখতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর টাইমিং সেন্স ঠিকঠাক কাজ করে কিনা।

পাশাপাশিই মনে হচ্ছে, আজ কোনও আর্থিক প্যাকেজও ঘোষণা করা হতে পারে। কারণ, ভেন্টিলেটরে চলে যাওয়া অর্থনীতিকে কোরামিন দিতে গেলে এছাড়া কিছু করার নেই। এতদিনে বেশ কয়েকবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিবারই দেশের লোক ভেবেছে, তিনি কোনও আর্থিক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করবেন। যা যে কোনও কল্যাণকামী রাষ্ট্রেরই কর্তব্য ও দায়িত্ব। যেমন পৃথিবীর অন্যান্য দেশে হচ্ছে। কিন্তু কোনওবারই ভারতের প্রধানমন্ত্রী কোনও আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেননি। অথবা বলেলনি যে, এই দুরবস্থা থেকে বেরোতে কী করা হবে। লকডাউন বাড়ানো ছাড়া কোনও দিশা নেই। মনে হচ্ছে, ইটস হাই টাইম হি ডাজ দ্যাট।

টাইমিং!‌ টাইমিং ইজ এভরিথিং ইন পলিটিক্স অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন।

দুপুর ১.‌৩২

ব্যাঙ্কে গিয়েছিলাম মায়ের পেনশন তুলতে। কিন্তু পালিয়ে এলাম। বাইরের ফুটপাথ পর্যন্ত টাকা তোলার লাইন চলে গিয়েছে। বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়েও ছিলাম। কিন্তু এত গরম যে মাথা–ফাথা ঘুরছিল। টি–শার্ট ঘামে ভিজে ক্যাতক্যাত করছে। মাথা বেয়ে ঘাম নামছে পিঁপড়ের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়ানোর পর দেখলাম, তখনও সামনে অন্তত ২০ জন দাঁড়িয়ে। মনে হল, আজকের মতো রণে ভঙ্গ দিই। আবার পরে দেখা যাবে। একেবারে না খেতে পেয়ে তো মরছি না!‌

ব্যাঙ্ক থেকে সটান অফিসে চলে এসেছি। এখনও কেউ আসেনি দেখছি। নিজের ঘরে ঢুকে এসি আর ফ্যান চালিয়ে বসলাম। এবার একটু চোখ বুজে চেয়ারে গা এলিয়ে দিতে হবে। নিন্দকেরা বলবে ঘুমোচ্ছি। অতিপাকারা স্টাইল করে বলবে, পাওয়ার ন্যাপ। আমি বলব, এটা হল কনজার্ভেশন অফ এনার্জি। এর একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে। এনার্জি স্টোর না করলে দরকারে এনার্জি খরচ করা হবে কী করে?‌ পুরোটাই এনার্জির খেলা।

বিকেল ৪.‌১০

চিনের ইউহান, যা নাকি করোনা–মুক্ত বলে ঘোষিত হয়েছিল, সেখানে আবার ছ’জনের দেহে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ধরা পড়েছে। এই খবরটা ডিপ্রেসিং। অত্যন্ত ডিপ্রেসিং।

বিকেল ৪.‌২৫

তিন সহকর্মীর তিনটে আলাদা আলাদা বক্তব্য শুনলাম।

সব্যসাচী সরকার:‌ করোনার অপর নাম নিয়তি। কেউ এড়াতে পারবে না। যখন যাকে ইচ্ছে হবে ধরবে আর নিয়ে চলে যাবে। কারও কিছু করার থাকবে না। যেমন নিয়তির সঙ্গে আমরা লড়তে পারি না।
— সম্পূর্ণ সহমত। করোনা এখন নিয়তিরই নামান্তর। কার যে কখন ডাক আসবে কেউ জানে না।

অভীক রায়:‌ এখন রোজ ভ্যানে করে জ্যান্ত মুরগি নিয়ে বাড়িতে আসছে লোকজন বিক্রি করতে। কিনলে ওজন করে সেখানেই কেটেকুটে দিয়ে দিচ্ছে। এই জিনিসটা আগে কখনও দেখিনি। আরও একটা জিনিস দেখিনি। হঠাৎ হঠাৎ পাড়ায় ঢুকে ব্লিচিং পাউডার মেশানো জল স্প্রে করা হচ্ছে একতলা পর্যন্ত। আগে থেকে বলা হচ্ছে না। গরমের জন্য একতলার দরজা–জানালা খোলা থাকছে। ব্লিচিং–জল সমস্ত বিছানা–টিছানা ভিজিয়ে দিচ্ছে।
— ব্লিচিং পাউডারের জল ছিটিয়ে কী হবে?‌ কোভিড–১৯ তো আর এয়ারবোর্ন ভাইরাস নয়। ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। জেনারেল জীবাণুনাশক হিসেবে ব্লিচিং পাউডার মেশানো জল অবশ্যই ভাল। কিন্তু করোনার ক্ষেত্রে কার্যকরী কি?‌ তাহলে তো মুঠো মুঠো ব্লিচিং পাউডার খেয়ে ফেললেই হতো!‌

তারিক হাসান:‌ অফিসে আসার পথে টালিগঞ্জ ফাঁড়ির কাছে গাড়ি থামিয়ে ভিক্ষে চাইল একজন। বলল, অন্তত একটা টাকা দিয়ে যান!‌ পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম, ১০ টাকার একটা নোট উঠল। সেটাই দিলাম। দেখলাম, একজন নয়। পাঁচজন ভিখারি দাঁড়িয়ে আছে। ১০টা টাকা ওরা দু’টাকা–দু’টাকা করে ভাগ করে নিল!‌ এই পর্যায়ে কলকাতার রাস্তায় এই প্রথম ভিখিরি দেখলাম। কিন্তু ওদের কাউকে দেখে ঠিক ভিখিরি বলে মনে হল না।
— এটা হবে জানতাম। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হবে ভাবিনি। কিছুদিন আগেও ভিখিরিরা একটাকার কয়েন নিতে চাইত না। সেই তারা এখন বলছে, অন্তত একটা টাকা হলেও দিয়ে যান!‌ এই লোকগুলো এখন নাচার। ওদের আড় ভেঙে গিয়েছে। পেটের দায়ে লজ্জাবোধও আর নেই। কিন্তু এরপর তো আরও ভয়ঙ্কর দিন আসছে। যেদিন এই লোকগুলো আর ভিক্ষে চাইবে না। কেড়ে নেবে। কলার ধরবে। পথে পথে এই মানুষগুলোর সামনে দিয়ে কী করে থলেভর্তি বাজার নিয়ে বাড়ি ফিরবে লোকজন? কিন্তু এরাই বা কী করবে?‌ চাকরি নেই। জীবিকার সংস্থান নেই। ‌সংসার প্রতিপালন করতে হবে তো। মরিয়া হয়ে তো এরা অধিকার ছিনিয়ে নিতে নামবেই। তখন?‌

বিকেল ৪.‌৩৫

আগামী ১৪ থেকে ১৭ মে বিজন সেতু বন্ধ থাকবে। ভারবহন ক্ষমতার পরীক্ষা করা হবে। এটা লকডাউনের সুবিধার দিক। এখন কি শহরের অন্য প্রাচীন সেতুগুলোও দেখে নেওয়া যায়?‌ মাঝেরহাট ব্রিজ পুনর্নির্মাণের কাজটা দ্রুত সেরে ফেলা যায়?‌

আজ বিশেষ ট্রেন চালু হল। ঘটনাচক্রে, ওই ট্রেনে যাঁরা ট্রাভেল করবেন এবং করছেন, সকলকে বাধ্যতামূলকভাবে আরোগ্যসেতু অ্যাপে যোগ দিতে বলা হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এবার যে কোনওদিন নাকি বিমান পরিষেবাও চালু হবে। দিল্লি থেকে তেমনই ইঙ্গিত পেয়ে কলকাতা বিমানবন্দরে তৎপরতা শুরু হয়েছে। স্যানিটাইজেশন প্রসেসও শুরু হচ্ছে। গত কয়েকদিন ধরেই উচ্চপর্যায়ে বৈঠক চলছিল। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়, এতদিন প্লেনগুলো দাঁড়িয়ে আছে। এরপর ঝপ করে চালানোটা দুষ্কর। সমস্যা তৈরি হবে। হিতে বিপরীতও হয়ে যেতে পারে। অতএব পুরোপুরি সার্ভিস শুরু করার আগে একটা মক ট্রায়াল অন্তত দিতে হবে।

বিকেল ৪.‌৪০

বেশ কিছুদিন পর আবার প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখ্যমন্ত্রী। যা বললেন, তার মূল কথা— করোনা এখনই যাবে বলে মনে হয় না। কিন্তু কবে যাবে, সেজন্য অপেক্ষাও করা যাবে না। করোনাকে রুখতে হবে। আবার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাও ফিরিয়ে আনতে হবে। ফলে আপাতত আগামী তিন মাসের জন্য একটা শর্ট টার্ম প্ল্যানিং করা উচিত। তারপর একটা মিড টার্ম এবং পরিশেষে একটা লং টার্ম প্ল্যান।

আরও একটা তথ্য:‌ আগামী বৃহস্পতি ও শুক্রবার নবান্ন স্যানিটাইজ করা হবে। অতএব বৃহস্পতি, শুক্র, শনি এবং রবি— পরপর চারদিন রাজ্য প্রশাসনের সদর দফতর বন্ধ থাকবে। বাকি সময়ের অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঝাড়লেন মুখ্যমন্ত্রী। বললেন, ‘বিধানসভা ভোট এখনও একবছর বাকি। এখনই ক্ষমতাদখলের তাড়া কেন?‌’

ওহ্‌, দুপুরেই শুনেছিলাম। লিখতে ভুলে গিয়েছি। হাওড়ার প্রাক্তন মেয়র রথীন চক্রবর্তী রাজ্যপালের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন। চিকিৎসক হিসেবে কিংবদন্তি ভোলানাথ চক্রবর্তীর পুত্র রথীনের খ্যাতি আছে। মেয়র হিসেবে কী করেছেন ঠিক জানা নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে, শাসক তৃণমূলের সঙ্গে তাঁর দুস্তর দূরত্ব তৈরি হয়েছে গত প্রায় একবছর ধরে। যে সূত্রে মনে হচ্ছে, তাঁর এই নিয়োগ পুরোপুরি রাজনৈতিক।

মনমোহন সিংহ ভাল হয়েছেন। তাঁকে এইমস থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আজ।

রাত ৮.‌৪০

প্রধানমন্ত্রীর পঁয়ত্রিশ মিনিটের ভাষণে দুটো অপারেটিভ পার্ট।

১.‌ করোনা মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের ২০ লক্ষ কোটি টাকার প্যাকেজ। যা দেশের জিডিপি–র প্রায় ১০ শতাংশ। এই পরিমাণটা কত?‌ কোনও আইডিয়া নেই। ২০ লক্ষ কোটি গুণতে কত সময় লাগে, তা–ও জানি না। কাল থেকে কয়েকদিন ধরে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী প্যাকেজের খুঁটিনাটি ঘোষণা করবেন।
২.‌ লকডাউন–৪ আসছে। যা আগের তিনটি লকডাউনের থেকে অন্যরকম হবে। রাজ্যগুলির পরামর্শ পাওয়ার পর তার গাইডলাইন ১৮ মে–র আগে দেশবাসীকে জানিয়ে দেওয়া হবে। তবে এটা স্পষ্ট যে, ১৭ তারিখ সার্বিক লকডাউন উঠছে না।

বাকি যা বললেন, তার মর্মার্থ— করোনা আরও অনেক সময় ধরে আমাদের জীবনে থাকবে। কিন্তু আমরা করোনাকে মাথায় চড়ে বসতে দেব না। ভারতকে ‘আত্মনির্ভর’ করার জন্য এই প্যাকেজ ঘোষণা করা হল। উদাহরণ?‌ করোনার প্রাদুর্ভাবের সময় ভারতে একটিও পিপিই বা এন–৯৫ মাস্ক তৈরি হতো না। এখন দেশে রোজ ২ লক্ষ করে পিপিই এবং ২ লক্ষ করে এন–৯৫ মাস্ক উৎপাদন হচ্ছে। যে উদাহরণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ভারত বিপদকে সুযোগে পরিণত করেছে। এই প্যাকেজ মধ্যবিত্তদের জন্য। যাঁরা আয়কর দেন। আপনারা লোকালের জন্য ভোকাল হোন। শুধু স্থানীয় পণ্য কেনাই নয়, স্থানীয় পণ্যের হয়ে প্রচার করুন।’

যা থেকে বোঝা গেল, বিদেশি বিনিয়োগের ভরসা আর করছে না কেন্দ্রীয় সরকার। কারণ, বিদেশের অর্থনীতিও ভেঙে পড়েছে। ফলে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার উপর জোর দিতে হচ্ছে বাধ্য হয়ে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে অবশ্য বিভিন্ন ধরনের টিকা–টিপ্পনি শুরু হয়ে গিয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। এখনও পর্যন্ত যেটা নজর কাড়ল— আত্মনির্ভর ভারত:‌ ট্রান্সলেশন ‘আপনা আপনা দেখ লো’।

৮.৪৭

কোটি টাকার কেলেঙ্কারি ! প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পরেই উৎসাহিত হয়ে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী টুইট করেছিলেন ‘দেশের জিডিপির দশ শতাংশ (২০ লাখ টাকা) ব্যয়ে নতুন প্যাকেজ।’ পরক্ষনেই ভুল বুঝে টুইট করেছেন, ‘ সরি এভরিবডি ফর দা টাইপো : দয়া করে পড়ুন ২০ লক্ষ কোটি টাকা।’

খুবই নির্ভরযোগ্য হাতে রয়েছে ভারতের অর্থনীতি। ইহারেই কয় রামরাজ্য।

রাত ৯.‌০৫

আজ সারাদিন ধরে একটা কথা মনে হচ্ছে। অকর্মণ্য এবং অপদার্থরা সবসময় নিজের দোষ ঢাকতে একটা ভিলেন খোঁজে। যে কাজটা করতে ‘ক’ বাবু ব্যর্থ হন, তিনি তাঁর সেই ব্যর্থতার দায় চাপানোর জন্য সবসময় ‘খ’ বাবু বা ‘গ’ বাবুকে খুঁজে বার করেন। ব্যর্থ মানুষদের একটা ভিলেন খুব প্রয়োজন। ‘বলির পাঁঠা’ শব্দটা প্রাচীন। তার মধ্যে কোথাও পাঁঠার প্রতি একটা সহানুভূতির অ্যাঙ্গল থেকে যায়। কিন্তু ‘ভিলেন’ হল সার্বজনীন খারাপ লোক। তার জন্য কোনও মমতা থাকে না।

রাত ১০.‌০৫

কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব তিনদিন আগে বলেছিলেন, ‘করোনাকে সঙ্গে নিয়েই জীবন কাটাতে হবে।’

মুখ্যমন্ত্রী আজ বললেন, ‘করোনা এখনই যাবে বলে মনে হয় না।’

প্রধানমন্ত্রীও বললেন, ‘করোনা আরও অনেক সময় ধরে আমাদের জীবনে থাকবে।’

যা দাঁড়াল, করোনার সঙ্গে বিয়ে পাকা হয়েই গিয়েছে আমাদের। এবার থেকে তাকে জীবনসঙ্গী করেই বাঁচতে হবে এবং আমৃত্যু সন্দেহাকুল দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। জীবনযাপনে বেচাল দেখলেই জীবনসঙ্গী ঘ্যাঁক করে ধরবে এবং কোনওমতেই ডিভোর্স দেবে না।

প্রশ্ন হল, এই বিয়ের ভোজ খেতে লোক পাওয়া যাবে তো!‌

4 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ১২ মে, ২০২০

  1. লড়াইটা তাহলে হারতেই হল শেষ পর্যন্ত!? করোনা কে সঙ্গী করে প্রতি মূহুর্তে
    মৃত্যুভয় নিয়ে বাঁচা? নাকি মরা

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s