লকডাউন ডায়েরি – ১১ মে, ২০২০

১১.‌০৫.‌২০২০। সোমবার

সকাল ৮.‌৫৩

অ্যামাজনে রামায়ণ অ্যাভেলেব্‌ল। মহাভারত নয়। আপাতত। তবে ইফ রামায়ণ ইজ দেয়ার, ক্যান মহাভারত বি ফার বিহাইন্ড?‌ অতএব হে মানব, গীতার বাণী মানো। চেষ্টা করিয়া যাও। ফলের আশা করিও না। মা ফলেষু কদাচন।

প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফেরার সময় দেখি ফাঁকা রাস্তায় পথকুকুরদের খাওয়াচ্ছেন একদল যুবক। সেক্টর ফাইভের অফিস থেকে সল্টলেকের বাড়ি কতদূর?‌ বড়জোর ১০ মিনিট। তার মধ্যে অন্তত তিনটে জায়গায় রোজ রাতে এই ছবিটা দেখি। অদ্ভুত ভাল লাগে। মনে হয়, ভিড় করে আসা চতুষ্পদদের মধ্যে কোথাও একটা লবঙ্গ আছে। একটা ইনস্টু বা একটা ট্রাইপড আছে। রাতচরা গাড়ি দেখলে ওদের কেউ কেউ দৌড়ে আসে। গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা পথ দৌড়োয়। আমি ওদের দিকে তাকিয়ে হাসি। মনশ্চক্ষে দেখি লবঙ্গ–ইনস্টু–ট্রাইপড আমার দিকে তাকিয়ে আছে।

রোড অ্যাকসিডেন্টে কোমরের হাড় ভেঙে এসেছিল লবঙ্গ। তিনমাস ধরে চিকিৎসা করার পর সুস্থ হয়েছিল। কিন্তু ওকে রাস্তায় ছেড়ে দিতে পারিনি। কারণ, বনের পাখি থেকে ও তখন খাঁচার পাখি হয়ে গিয়েছে। ওকে অ্যাডপ্ট করার জন্য ফেসবুকে নোটিফিকেশন গিয়েছিল। কালিন্দীর বাসিন্দা একজন রাজিও হয়েছিলেন। কিন্তু সন্তানকে কি ছেড়ে দেওয়া যায়?‌ মায়া হয়। লবঙ্গ রয়ে গেল।

ইনস্টু আর ট্রাইপড এসেছিল পাড়ার লোকেদের তাড়া খেয়ে। আগে ওরা অ্যাপার্টমেন্টের নীচেই রাতে থাকত। সারাদিন পাড়ায় টইটই করত। অত্যন্ত ভদ্র এবং নিরীহ। দু’বেলা খেয়ে যেত। কিন্তু তাতেও কিছু পড়শির বেজায় সমস্যা শুরু হল। এঁরা হচ্ছেন সেই প্রজাতির লোক, যাঁরা রাতে রাস্তায় কুকুর ডাকলে ভাবেন না যে, ওরা অবাঞ্ছিত এবং অপরিচিত লোক দেখে চেঁচাচ্ছে। ওরাই আসল পাহারাদার। তাঁরা ঘুম ভেঙে উঠে ঢিল খুঁজে এনে ওদের মারেন। ঢিলের অভাবে বাড়ি থেকে পেপারওয়েট ছুড়ে মারতেও দ্বিধা বোধ করেন না। যুগে যুগে, কালে কালে এই ধরনের পাষণ্ড দেখা গিয়েছে। চেতলা ব্যতিক্রম হতে যাবে কেন?‌ ওই সমস্যার সুরাহার একটাই উপায় ছিল। ভদ্দরলোকেদের হাত থেকে বাঁচাতে ওদের সটান বাড়িতে নিয়ে আসা। বেওয়ারিশ প্রাণীকে সকলে খেদিয়ে দেয়। তার গায়ে গৃহপালিতের তকমা লাগলে সমীহ করে। রোডেশিয়ান হলেও। অতএব কাজলকালো চোখের ইনস্টু আর সাড়ে তিন পায়ে দৌড়ে বেড়ানো ট্রাইপডের একটা ঠিকানা জুটল।

মায়া। বড় মায়া।

সকাল ৯.‌১৫

কাল রাতে বেডরুমের সমস্ত জানালা–দরজা খুলে দিয়েছিলাম। যাতে ক্রস ভেন্টিলেশন হয়। একপশলা বৃষ্টির পর হু হু করে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল। অবিকল সমুদ্রতীরের মতো। হাওয়ার ঝাপটায় জানালার পর্দাগুলো উড়ে যাচ্ছিল দূরদূরান্তে। মাথার কাছের জানালাটা দিয়ে হাওয়ার দমক আসছিল। বারান্দার পাশে গাছের পাতা থেকে জল ঝরে পড়ার নীচু টুপটাপ শব্দ। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা আসলে তত খারাপও নয়।

শুধু তাল কাটছিল রাস্তার সোডিয়াম ভেপার ল্যাম্পটা। ওই হাওয়া, ওই নৈঃশব্দ্য, ওই নীরবতা আরও একটু অন্ধকার দাবি করে।

সকাল ৯.‌৪৯

কলকাতায় কনটেনমেন্ট জোনের সংখ্যা বেড়েছে। অনেকটাই বেড়েছে। এখন ৩৪০। কেন এমন হচ্ছে কে জানে! ‌এত কড়াকড়ি। এত নজরদারি। এত নাকা চেকিং। তারপরেও কেন এই অবস্থা?‌ কোথাও কি তাহলে কোনও ফাঁক রয়ে যাচ্ছে?‌ গেলেও সেটা ভরাট করা যাচ্ছে না কেন?‌ ‌

ভাবতে ভাবতেই সেই বন্ধুর কথাটা এসে ধাক্কা মারল। তার এক পরিচিতের মা করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তি ছিলেন শহরের বেসরকারি হাসপাতালে। কয়েকদিন পর মারা যান। খবর আসে হাসপাতাল থেকে। ফোন করে মৃত্যুসংবাদ দেওয়ার পাশাপাশি জানতে চাওয়া হয়, দেহ দাহ করা হবে না কবর দেওয়া হবে?‌ ‘দাহ’ বলার পর ফোন কেটে যায়। তারপর আর কিছু জানা নেই।

জানি এমনই হয়। এমনই হচ্ছে। তাছাড়া উপায়ও নেই। কোভিড প্রটোকল তেমনই বলে। বলে, নিকটাত্মীয়দের হাতে মরদেহ তুলে দেওয়া যাবে না। প্রশাসন থেকেই সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে উপযুক্ত প্রোটেকশন–সহ। অযথা সেন্টিমেন্টাল হয়ে লাভ নেই। সবই বুঝি। কিন্তু মাতৃহারা সন্তান যখন নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার অক্ষম চেষ্টায় প্রশ্ন করে, ‘মায়ের কাজটা ওরা ঠিকঠাকই করেছে। তাই না?‌’ তখন মাথা নেড়ে আশ্বাস দেওয়া ছাড়া কিছু বলার থাকে না। তথ্যকে ডিনায়ালে রাখতে হয়। আর মা, বাবা, বন্ধু, আত্মীয়, পরিজন— সকলে ‘বডি’ হয়ে কোথায় কোন তেপান্তরের মাঠে মিলিয়ে যায়।

মনে হয়, রাস্তায় আঁকা গোল গোল চুনের দাগের মতো আমাদের প্রত্যেকের জীবনে এখন এক অদৃশ্য গণ্ডি এসে হাজির। তার মধ্যেই আমাদের নিত্য বসবাস। কখনও সে গণ্ডি সামাজিক দূরত্বের। কখনও তথ্যগত দূরত্বের। কখনও সেই গণ্ডি আটকে রাখছে ব্যক্তিগত আবেগকে। কখনও তৈরি করছে সম্পর্কের মধ্যে দুস্তর ব্যবধান।

মনে হয়, গণ্ডির বাইরে কোথাও গুঁড়ি মেরে বসে আছে একটা প্রকাণ্ড বাঘ। সবসময় জরিপ করছে গতিবিধি। লক্ষ্ণণরেখা পেরোলেই লাফ দিয়ে ঘাড়ে পড়বে। প্রাণ না নিয়ে ছাড়বে না। সবসময় শরীরে বিঁধছে সেই অদৃশ্য অথচ প্রবল শক্তিধর শত্রুর দৃষ্টি।

সকাল ১০.‌৪৮

আজ লকডাউনের ৫০ তম দিন। হাওয়ার মতো সময় যাচ্ছে। টিভি–তে দেখছি, আবার রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি লিখেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব। বলেছেন..‌কী বলেছেন কে জানে!‌ হু ইজ বদার্ড?‌ এই চিঠিচাপাটি আর ভাল লাগছে না। এর সঙ্গে আমজনতার যোগাযোগ কোথায়?‌ একেক সময় মনে হয়, এই লকডাউন পিরিয়ডে এত লোক এত চিঠি লিখছে যে, এই শারদীয়াতে চাইলে একটা ‘লকডাউন পত্রাবলি’ ছাপা হতে পারে!‌

সকাল ১০.‌৫৪

ফেসবুকে এক চিকিৎসকের একটা পরামর্শমূলক পোস্ট দেখলাম। লিখেছেন, ‘ট্রেনের পর আস্তে আস্তে অনেককিছুই চালু হবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে বাইরে বেরোতে হলে কিছু জিনিস মাথায় রাখা দরকার। এই ভাইরাস আমাদের সঙ্গে বেশ কিছুদিন থাকতে চলেছে। বাড়ির বাইরে বেরোনর কিছু উপদেশ লিখলাম। এটি কোনও অফিশিয়াল উপদেশ নয়। আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাপ্রসূত। মূল কথা #‌দূরত্ব #‌পরিচ্ছন্নতা #‌মাস্ক’।

পড়তে পড়তে ভাবছিলাম, এর মধ্যে কী কী আমি করতে পারব।

১.‌ ঘড়ি এবং আংটি বর্জন।
— খুবই সম্ভব। বস্তুত, লকডাউনের প্রথমদিকে তো ঘড়ি–আংটি পরা ছেড়েই দিয়েছিলাম। আবার শুরু করেছি। কারণ, মাঝেমধ্যেই ঘড়ি দেখা আমার মুদ্রাদোষ। না পরলে কিছু একটা নেই বলে মনে হয়। তবে আবার ছেড়েও দিতে পারি। সমস্যা নেই।

২.‌ শুধু ক্রেডিট, ডেবিট কার্ড আর অল্পকিছু টাকা সঙ্গে রাখুন।
— নো প্রবলেম। ক্রেডিট কার্ড নেই। কারণ, ধারবাকিতে বিশ্বাস করি না। বাকিটা মূলত ডেবিট কার্ডেই সারি। নগদ টাকার চেয়ে খুচরো কাগজই বেশি থাকে ওয়ালেটে।

৩.‌ ফোন একটি স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেটে রাখুন। পরে বাড়ি ফিরে এসে প্লাস্টিক ফেলে দিন।
— এটায় চাপ আছে। অত স্বচ্ছ প্লাস্টিকের প্যাকেট পাব কোথায়?‌ বিশেষত, এখন যখন প্লাস্টিক বর্জনের নিদানও আছে পরিবেশের জন্য। তার চেয়ে বরং এখন যা করছি বাড়ি ফিরে সেটাই করব। স্যানিটাইজার দিয়ে ফোন প্রক্ষালন।

৪.‌ মাথা ঢাকা টুপি, ওড়না।
— অ্যাবসোলিউটলি ফাইন। এটা নিশ্চয়ই মাথার চুলে ভাইরাসের আটকে থাকা আটকাতে। চুল প্রায় সব উঠে যেতে বসেছে। টুপি পরলে সেটা ক্যামোফ্লাজ করা যাবে। গ্রেট আইডিয়া!‌ ঘাম মোছার জন্য এমনিতেই গলায় দোপাট্টা প্যাঁচানো থাকে। সেটাও মাথা ঢাকার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। আরও একটা কথা মনে হচ্ছে। চুলে ভাইরাসের অনুপ্রবেশ আটকাতে যদি চুলই বিসর্জন দিয়ে দেওয়া যায়?‌ ন্যাড়া হয়ে গেলেই তো হল। স্টাইলও হল। স্লিপারি সারফেসে ভাইরাসও পিছলে যাবে। নট ব্যাড।

৫.‌ মাস্ক নাকের উপর দিয়ে।
— এটা প্রায় কেউই করছে না। আমি করছি। চশমার তলা দিয়ে নাক ঢাকছি। মুখ তো বটেই।

৬.‌ মুখে, নাকে, মাস্কে একদম হাত দেওয়া নয়।
— এটাও সম্ভব। কিন্তু এইসব নিষেধাজ্ঞার সময়েই কে জানে কেন, মুখ–নাক বেশি বেশি চুলকোয়। যা হোক, ওটা ইগনোর করতে হবে।

৭.‌ আপ্রাণ চেষ্টা করুন পাশের লোকের সঙ্গে ৩ ফুট দূরত্ব রাখতে।
— খুবই চেষ্টা করব। কিন্তু এটায় প্রায়ই ভুল হয়ে যায়। বিশেষত, খবরের কাগজে পেজ প্রোডাকশনের কাজ করতে গেলে একটা ভৌগোলিক নৈকট্য দরকার হয়। তবু খেয়াল রাখতে হবে।

৮.‌ বারে বারে হাত ধোয়া অথবা স্যানিটাইজার ব্যবহার। প্লাস্টিকে মুড়ে পকেটে একটা ছোট সাবান রাখুন।
— প্রথম পয়েন্টটা সম্ভব। কিন্তু প্লাস্টিকে মুড়ে পকেটে সাবান বহন করাটা একটু কেমন যেন না?‌ ধরে নিচ্ছি, ট্রাউজার্সের পকেটের কথাই বলা হচ্ছে। প্যাকেট থেকে দুর্ঘটনাবশত সাবানে লেগে–থাকা জল বা ফেনা বেরিয়ে পকেট ভিজে গেলে খুব এমব্যারাসিং হবে। বিপ্লবের যেমন হয়েছিল। পকেটে রাখা স্যানিটাইজারের শিশির ছিপির প্যাঁচ খুলে গিয়ে কেলেঙ্কারি। তার চেয়ে বারবার হাত ধোয়া এবং স্যানিটাইজার ব্যবহার নিরাপদ।

৯.‌ প্লাস্টিকের চটি বা জুতো, যেটা ধোয়া যাবে। সেটা বাইরে ছেড়ে তবে বাড়িতে ঢোকা।
— কঠিন কাজ। জুতো যদি বাইরেই ছেড়ে রাখি, তাহলে আর ধোওয়ার কী দরকার?‌ ওদিকে জুতো না ধোওয়া হলে তো রোজ রোজ সেখানে ভাইরাসের বংশবৃদ্ধি হতে পারে। আবার ধুতে হলে বাড়ির বাইরে প্রথমে একটা জলের কল ফিট করতে হবে। বাড়ির বাইরে জুতো রেখে এলে কেউ যদি নিয়ে চলে যায়?‌

১০.‌ বাড়ি ফিরে এসে বাইরের জামাকাপড় কেচে দেওয়া। অথবা চার সেট জামাকাপড় রাখা। ১, ২, ৩, ৪। চতুর্থদিনের পর পর আবার প্রথমদিনের জামা পরা। প্রত্যেকদিন ফিরে এসে পারলে রোদে টাঙিয়ে দেওয়া।
— প্রথম ব্যাপারটা খুবই সম্ভব। কিন্তু পরের ব্যাপারটা আমার মতো মানুষের পক্ষে অসাধ্য। বাড়ি ফিরি কমপক্ষে রাত ১১টায়। তখন রোদ কোথায়?‌ সূর্যদেবতার কাছে কি লিখিত অ্যাপ্লিকেশন দেব?‌ ইয়ার্কি থাক। মনে হচ্ছে, উনি বলেছেন, বাইরে টাঙিয়ে দিতে। যাতে যখনই হোক তারা রোদ খেতে পারে।

১১.‌ ১ লিটার জলে দেড় চামচ ব্লিচিং পাউডার দিয়ে একটি দ্রবণ বা মিক্সচার বানান। এটি একটি শক্তিশালী জীবাণুনাশক। সাবধানে সেটি দিয়ে জুতো এবং সন্দেহজনক স্থান ভাইরাস মুক্ত করুন।
— এটা নিয়ে ভাবছি। ভিস্যুয়ালাইজ করছি, ব্লিচিং পাউডারের মিক্সচার ভর্তি বোতল রান্নাঘরের জানালার র‌্যাকে রাখা আছে আর রাতবিরেতে একহাতে সেই বোতল আর অন্যহাতে টর্চ নিয়ে সারা বাড়ি ঘুরে ঘুরে সন্দেহজনক স্থান খুঁজছি। মনে হলেই শান্তিজলের মতো ছিটিয়ে দিচ্ছি।

এই তাহলে জীবন হতে চলেছে?‌ এর চেয়ে লকডাউনই ভাল!‌

দুপুর ১২.‌১৪

সোশ্যাল মিডিয়ায় কাল থেকে কল্কি অবতারের উদয় হয়েছে। যিনি উকুলেলে বাজিয়ে গান গেয়ে তাঁর সদ্যোজাত সন্তানকে ঘুম পাড়াচ্ছেন। ওইপর্যন্ত ঠিকই আছে। চমক তার পরে। কারণ, গানটি হল বিশুদ্ধ বাংলায় ‘ঘুমপাড়ানি মাসি–পিসি মোদের বাড়ি এসো’। সেখানেই ক্যাচ। কারণ, অবতারের নাম কল্কি কেঁকলা। বলিউডের মিনিংফুল ছবির অভিনেত্রী এবং পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের প্রাক্তন স্ত্রী। জন্মসূত্রে ফরাসি। জন্মস্থান পুদুচেরি। আপাতত তাঁর পার্টনার গাই হার্শবার্গ। যিনি ইজরায়েলি ন্যাশনাল। তাঁদের কন্যা সাফোর জন্ম হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে।

এর মধ্যে পুদুচেরি তথা শ্রী অরবিন্দ ছাড়া কোথাও কল্কির বং কানেকশন আপাতদৃষ্টিতে দেখতে পেলাম না। ফলে বঙ্গসন্তান হিসেবে ভাল লাগার পাশাপাশিই ‘ঘুমপাড়ানি’ রহস্যটাও রয়ে গেল।

দুপুর ২.‌৫০

অফিসে আসার আগে ত্রিস্তরীয় সার্জিক্যাল মাস্ক পরার সময় মাথার পিছনের গিট্টুটা বাঁধতে গিয়ে খেয়াল করলাম, এটা দেখতে একেবারে সেরকম লাগছে, যেভাবে মহিলারা দু’হাত মাথার পিছনে নিয়ে গিয়ে খোঁপা বা পনিটেল বাঁধেন।

দুপুর ৩.‌০০

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীদের ভিডিও বৈঠক শুরু হল। যদিও সেটা লাইভ দেখানো হচ্ছে না কোথাও। সে যাক। পরে নিশ্চয়ই জানা যাবে কী হল।

ঘটনাচক্রে, আর একঘন্টা পরেই রেলের টিকিটের অনলাইন রিজার্ভেশন শুরু। কাল ১৫টি ট্রেন যাত্রা শুরু করবে দিল্লি থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। শুনলাম, একেকটি ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা ১,২০০ থেকে বাড়িয়ে ১,৭০০ করা হয়েছে। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংয়ের নিকুচি করে এই গাদাগাদি ভিড়ে–ঠাসা ট্রেন ছাড়া কেন?‌ টিকিটের টাকা তুলে নেওয়ার জন্য?‌ নাকি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এখনও আটকে–থাকা শ্রমিকদের বেড়ালপার করতে?‌

বিকেল ৫.‌০৫

এই যাহ্‌!‌ রেলের বুকিং শুরুই হয়নি। বলা হচ্ছে, সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হবে। কেন দু’ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়া হল?‌ রেলের বক্তব্য, কম্পিউটারে ডেটা আপডেট করা হচ্ছে। তাই দেরি। গোটা দেশ এই ট্রেনযাত্রা শুরুর দিকে তাকিয়ে আছে। দিল্লি থেকে যাত্রা শুরু করে এই ট্রেনগুলো দেশের ১৫টি প্রান্তিক স্টেশনে পৌঁছবে এবং আবার ফিরে যাবে দিল্লিতে। এখন দেখার, পথিমধ্যে তারা কোভিডের পরিবাহী হিসেবে কতটা কাজ করে এবং কোথায় কোথায় তার কী কী অভিঘাত হয়।

সন্ধ্যা ৭.‌৩০

অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু এবং মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন যাতে কাল থেকে যাত্রীট্রেন চালানো বন্ধ রাখা হয়। তাঁদের মতে, এর ফলে হু হু করে সংক্রমণ বেড়ে যাবে। যদিও মনে হচ্ছে না, ওই আপত্তিতে খুব একটা কাজ হবে। কেন্দ্র মোটামুটি সব ব্যবস্থা করে প্রস্তুতি নিয়েই ফেলেছে।

বস্তুত, চারটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রস্তাব দিয়েছেন লকডাউন অন্তত ৩১ ম পর্যন্ত চলুক। বলা হচ্ছে দু’তিন দিনের মধ্যে কেন্দ্র লকডাউনের নতুন গাইডলাইন ইস্যু করবে।

টিভি বলছে, প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, প্রথমত, এভাবে ট্রেন চালু করা উচিত নয়। তাতে সংক্রমণের আশঙ্কা আরও বাড়বে। তাঁর আরও অভিমত, পরিযায়ী শ্রমিকদের কাছ থেকে রেলের ভাড়া নেওয়া উচিত নয়। যদি ভাড়া নেওয়া হয়, তাহলে বাংলার শ্রমিকদের ভাড়া রাজ্য সরকার দিয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, তিনি বলেছেন কেন্দ্র যেমন একদিকে লকডাউন হাল্কা করছে, তেমনই আবার অন্যদিকে রাজ্যগুলোকে বলা হচ্ছে সংক্রমণ আটকাতে। এই দু–মুখো নীতি না নিয়ে বরং রাজ্যকেই দায়িত্ব দেওয়া হোক কোথায় কোথায় লকডাউন থাকবে আর কোথায় থাকবে না, সেটা ঠিক করার।

কেন্দ্রীয় দল নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বলেছেন, তাঁরা কেন্দ্রের নেতৃত্বেই করোনা মোকাবিলার কাজ করছেন। তাই কেন্দ্রীয় দল পাঠানোর কোনও দরকার নেই। আর কোন রাজ্যে কত সংক্রমণ, তা নিয়ে আঙুল তোলা উচিত নয়। এখন পারস্পরিক দোষারোপের সময় নয়। এখন হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করার সময়। কাল ট্রেন চালু হলে লাখ লাখ পরিযায়ী শ্রমিক ফিরে আসবেন রাজ্যে। তাছাড়াও, আরও ৯টি ‘শ্রমিক স্পেশাল’ ট্রেন রাজ্যে ঢুকবে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে। তখন সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের খাবার বা অন্য বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে সমস্যা তৈরি হবে। সেজন্য যে রাজ্য থেকে তাঁরা আসছেন, সেই রাজ্যের সঙ্গে সমণ্বয় রক্ষা করা প্রয়োজন।

রাজ্যের তরফে কেন্দ্রের কাছে অর্থের দাবিও জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। লিখে রাখি, আজ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে করোনা এবং কো–মর্বিডিটিতে মৃত ১৯০ জন। তার মধ্যে করোনায় মৃত ১১৮ জন। কো–মর্বিডিটিতে ৭২ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।

রাত ৮.‌৩০

টিভি–তে অভিজিৎ বিনায়ক ব্যানার্জির সাক্ষাৎকার হচ্ছে। বরাবরই ওঁর মতামত খুব স্পষ্ট। বেশি জ্ঞান দিতে যান না। জাহির করার কোনও চেষ্টা নেই। সেটা খুব ভাল লাগে। যেমন নোবেল পাওয়ার পর বলেছিলেন, ‘আমার প্রথমেই মনে হল, অনেকগুলো প্লেনের টিকিট ক্যানসেল করতে হবে।’ আজ যেমন বললেন, ‘করোনার প্রকোপে আমেরিকায় বহু লোকের চাকরি চলে গিয়েছে। আমার চাকরি আছে। বাড়ির পাশের পার্কে ফুটবল খেলা বন্ধ হয়ে গেলেও হাঁটাহাঁটি চালু আছে। সেটা করতে পারছি। ব্যাডমিন্টন খেলতে পারছি।’

সাধারণত অ্যাকাডেমিক্‌সের লোকজন খুব গেরামভারি, সিরিয়াস এবং গুরুগম্ভীর হন। আমাদের মতো পাঁচপেঁচিদের তাঁদের বিদ্যার পাহাড়ের তলায় চাপা পড়ার ভয় থাকে। কিন্তু অভিজিতের সেন্স অফ হিউমার তুলনারহিত। সেখানে কোথাও এই পণ্ডিতের সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পারি।

রাত ৯.‌‌ ১৩

মনমোহন সিংহ এখনও হাসপাতালে। স্থিতিশীল। ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানাচ্ছেন এইমস কর্তৃপক্ষ।

রাত ১০.‌২৩

লকডাউনের ৫০ তম দিনটা কেটে গেল। ঘুম আসছে না। কানে বাজছে মাতৃহারা কন্যার অনন্ত জিজ্ঞাসা, ‘মায়ের কাজটা ওরা ঠিকঠাকই করেছে। তাই না?‌’

বাঘটা গুঁড়ি মেরে বসে আছে কোথাও। ‌‌

2 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ১১ মে, ২০২০

  1. অন্য দিন তবু একটা ক্ষীণ হলেও আলোর রেখা থাকে।
    আজ সেটা ওই গুঁড়ি মারা বাঘটার আড়ালে সেঁধিয়ে গেল।
    😥

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s