লকডাউন ডায়েরি – ১০ মে, ২০২০

১০.‌০৫.‌২০২০। রবিবার

সকাল ৮.‌১০

গত কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুমোনর আগে খুব মহাভারত পড়তে ইচ্ছে করছে। ব্যাসদেবের নয়। রাজশেখর বসুর। অভীকবাবু পড়তে বলেছিলেন। তাঁর কথাতেই রাজশেখর বসুর লেখা রামায়ণ আর মহাভারত কিনেছিলাম। রামায়ণটা বেশ সহজ–সরল। বানরসেনাও বুঝতে পারবে। কিন্তু মহাভারতটা একেবারে অন্য লেভেলের। কতবার যে পড়েছি!‌ একটা সময় তো বেডসাইড টেবিলে রাখা থাকত। রোজ রাতে পড়তাম। যতবার পড়তাম, ততবার নতুন নতুন দিক খুলে যেত।

দুটো বই–ই হারিয়ে ফেলেছি। কী করে হারাল কে জানে!‌ অবশ্য জানলে তো আর হারাত না। নাকি হারায়নি?‌ নিজেই কোথাও খুব যত্ন করে তুলে রেখেছি?‌ সল্টলেকের বাড়ির বুককেসে খুঁজলাম। পেলাম না। চেতলার বাড়িতে তো বই রাখার জো প্রায় নেই। বাচ্চারা দাঁত ওঠার সময় বই, জুতো, অফিসের চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদির উপর দাঁতের ধার পরীক্ষা করে। মাঝে মাঝে নখেরও। একবার ভুল করে ড্রয়িংরুমে অফিসের চামড়ার ব্যাগ ফেলে আসার পর সারারাত ধরে আঁচড়েছিল নুটু। তারপর থেকে ডবল সতর্ক হয়ে গিয়েছি।

কিন্তু তাহলে কি বইদুটো অফিসে কোথাও রেখেছি?‌ খুঁজতে হবে আবার ভাল করে। মহাভারতটা এখন দরকার ছিল। খুব মিস্‌ করছি। একবার কি অ্যামাজনে ট্রাই নিয়ে দেখব?‌ পরে কখনও পুরনোটা খুঁজে পাওয়া গেলে না–হয় দুটোই থাকবে। কিছু কিছু জিনিসের বাহুল্যে কোনও ক্ষতি হয় না। যেমন আন্দ্রে আগাসির অটোবায়োগ্রাফি ‘ওপেন’। আমার পড়া অদ্যাবধি শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনী। যে কোনও পর্যায়ে। তিনটে কেনা আছে। যখনই সময় পাই, একটু করে পড়ি। ছোটবেলায় যেমন একটু একটু করে আইসক্রিম চাখতাম।

মহাভারত পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, অর্জুন আর কর্ণের মধ্যে হরেদরে কোনও ফারাক নেই। দু’জনেই বীর। দু’জনেই অতুলনীয় যোদ্ধা। গ্রেট ওয়ারিয়র। দু’জনেরই অসীম গরিমা। দু’জনেই কৌন্তেয়। এবং দু’জনেই সমানভাবে দ্রৌপদীতে আসক্ত।

তাহলে অর্জুন কোথায় কর্ণকে মেরে বেরিয়ে গেলেন?‌ কোন ফ্যাক্টরে?

‌কৃষ্ণ!‌

কর্ণের কোনও কৃষ্ণ ছিল না। যে তাকে ঠিক সময়ে ঠিক দিকটা দেখাতে পারবে। বাস্তবের মতোই জীবনেও সারথি হবে। সঠিক পথে জীবনের রথ চালনা করতে পারবে। কৃষ্ণকে সখা হিসেবে না পেলে অর্জুন কর্ণের পাল্লা টানতে পারতেন কিনা, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ জন্মেছে রাজশেখর বসু পড়তে পড়তেই। কৃষ্ণ না থাকলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে অর্জুন তো গিল্টের চোটে গাণ্ডীব–টাণ্ডীব ফেলে রথের মেঝেতে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছিলেন!‌ অতবড় বীর। ধনুর্ধরশ্রেষ্ঠ। তাঁরও কী রকম একটা ভেবলে যাওয়া অবস্থা হয়েছিল। তখন কৃষ্ণ না থাকলে তো কেলেঙ্কারি হতো!‌

অস্যার্থ— সফল হতে গেলে সব মহাযোদ্ধারই জীবনে একটা কৃষ্ণ দরকার। খুব দরকার।

সকাল ৯.‌১৫

কাল রাতে অন্তরার সঙ্গে মেসেঞ্জারে লম্বা কথা হল। যার অপারেটিভ পার্ট হল—

১.‌ ‘লকডাউন ডায়েরিটা বই হওয়া উচিত। এবং লকডাউন উঠে গেলেও ডায়েরিটা কিছুদিন চলা উচিত। দিস ডায়েরি আই বিলিভ ইজ ওয়ান অফ আ কাইন্ড। বিকজ ইট্‌স আ প্রেশাস টেক অন হাউ থিংস আর গোয়িং অ্যান্ড অলসো বিকজ নো ওয়ান এলস ইজ ডুয়িং ইট দ্য ওয়ে ইউ আর।’

২.‌ ‘আই ডোন্ট সে দিস মাচ। কিন্তু সাহস করে কিছু করাটা তোমার থেকেই শেখা। অনেক গালাগালের বিনিময়ে শিখেছি। কিন্তু শিখেছি। এবেলা থেকে বেরোনর পর বহুবার আমরা প্রত্যেকেই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিকবার বলেছি, অনিন্দ্যদা থাকলে দেখতিস। সামটাইম্‌স ইট মেন্‌ট, অনিন্দ্যদা উড হ্যাভ ডান ইট ডিফারেন্টলি। সামটাইমস ইট মেন্‌ট, হি উড হ্যাভ ফট হার্ডার। আদার টাইমস ইট মেন্‌ট, ওহ্‌ শিট!‌ হি উড হ্যাভ স্ক্রুড আস ওভার দিস মিসটেক অ্যান্ড অ্যাট টাইম্‌স ইট অলসো মেন্‌ট, হি উড হ্যাভ শিল্ডেড আস ফ্রম দ্য সোর্স অফ ট্রাবল্‌স। এগুলো নিজেদের মধ্যে দেখা করে ছাড়াও অন্যান্য জায়গাতেও বলেছি দৃষ্টান্ত হিসেবে। মাথায় কিন্তু সকলের একটাই কথা ঘুরত, হি উড ফিল প্রাউড অফ আস ইফ হি ওয়াজ হিয়ার।’

৩.‌ ‘আমার নতুন কাজের জায়গাতেও সমস্ত সহকর্মীরা তোমায় চেনে। আগে থেকেই চিনত। আমার বস্‌ হিসেবে নয়। বাট নাউ দে ডু অ্যান্ড দে নো হাউ প্রাউড আই ফিল টু সে, আই ওয়ার্কড উইথ অনিন্দ্য জানা!‌ ওঁর থেকে এগুলো শিখেছি। এভাবে করতে হয়। এভাবে ভাবতে হয়। সাহস নিয়ে কাজ করতে হয়।’

৪.‌ ‘#‌মেন্টরফরএভার। পৃথা হ্যাজ পুট ইট ইন ওয়ার্ডস হোয়াট অল অফ আস ফেল্ট ইনসাইড।’

অন্তরাকে বললাম, তোদের নিয়ে আমার বড্ড গর্ব। একটা কথা আমি ভিতর থেকে বিশ্বাস করি— অর্জুন না থাকলে দ্রোণাচার্য কোনওদিন দ্রোণাচার্য হতেন না।

মনে হচ্ছিল, এই মধ্যবয়সে পৌঁছে অনেক বস্তুগত সঞ্চয় হেলাফেলায় স্যাক্রিফাইস করে এসেও ভাল থাকি এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর জন্যই। এই সার্টিফিকেটগুলো মনের‌ ম্যান্টলপিসের উপর যত্নে সাজিয়ে রাখি আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখি। জোর পাই। মনে হয়, ভুল করিনি। মনে হয়, ভাগ্যিস সেই সময়টা জীবনে এসেছিল!‌ এই মণিমুক্তোগুলো তো কুড়িয়ে নেওয়া গেল। ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বেরোন ঝকঝকে ছেলেমেয়েগুলোকে বলেছিলাম, আগে ভাল মানুষ হতে হবে। সৎ হতে হবে। তারপর ভাল পেশাদার।

বলেছিলাম, কাউকে ভয় পাবি না। তোরা কারও চেয়ে ছোট নোস। মনে রাখবি, সততার একটা আলাদা তেজ থাকে। সেটা ক্ষাত্রতেজের মতো বিচ্ছুরিত হয়। আর অসৎ লোকদের গায়ে গিয়ে কাঁটার মতো বেঁধে। তাই তারা সৎ আর পরিশ্রমীদের টেনে নিজেদের লেভেলে নামানোর চেষ্টা করে। তোদেরও করবে। পাত্তা দিবি না।

ওরা দেয়নি। নিজেদের দাপটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওদের সাফল্যের সিঁড়ির কোনও একটা ধাপে আমার নামটা লেখা আছে দেখে মনে হয়, পরিশ্রম সার্থক। দিনের শেষে অন্তত কেউ না কেউ বলবে, ওই লোকটার সঙ্গে কাজ করে কিছু শিখতে পেরেছিলাম।

মেসেঞ্জারের কথোপকথন ডায়েরিতে লিখে দেওয়ায় অন্তরা কি কিছু মনে করবে?‌ নাহ্‌ বোধহয়। নিশ্চয়ই বুঝবে, এ হল আমার অক্সিজেন সিলিন্ডার। হুইচ আই অলওয়েজ ক্যারি অন মাই ব্যাক হোয়াইল আই ওয়াক অন দ্যাট আনট্রাভেল্‌ড পাথ। গড ব্লেস অন্তরা। গড ব্লেস অল।

বেলা ১১.‌০০

এইমাত্র ফিরলাম চেতলা থেকে। আগেরদিন যা আশঙ্কা করেছিলাম, গিয়ে দেখলাম সেটাই হয়েছে। সিআইটি মার্কেট সিল্‌ড। বড় বড় তালা ঝুলছে কোলাপ্‌সিবল গেটে। বাচ্চাদের মাছ–মাংস কিনতে গিয়ে ফিরে আসতে হল। বাইরে অবশ্য হাটবাজার বসেছে ঠিকঠাক।

ব্যাপার কী?‌

যা শোনা গেল, ব্যাপার গুরুচরণ। বারবার বলা সত্ত্বেও সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে মাছ–মাংসের বাজার বন্ধ হচ্ছিল না। শেষে পুলিশ এসে তালা মেরে দিয়েছে। সবকিছু লঘু এবং চপলভাবে নেওয়ার এটাই পরিণতি। সোজা আঙুলে ঘি ওঠেনি দেখেই বিদায়ী মেয়র আঙুল বাঁকিয়েছেন। বেশ করেছেন!‌

রক্ষে এই যে, বাজারের বাইরে একটা মাংসের দোকান খোলা ছিল। সেটা থেকে প্রয়োজন মিটল আপাতত। মাছটা অবশ্য হল না। চিন্তা রয়ে গেল। ব্যবস্থা করতে হবে কিছু একটা।

রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টি–শার্ট ভিজে গিয়েছিল। এরপর গাড়িতে ফুল ব্লাস্টে এসি চালালে ঘাম বসে ঠাণ্ডা লেগে গেলে হাঁচি অবধারিত। আর এখন হাঁচলে নিজেরই ভয় লাগছে। তাই এদিক–ওদিক তাকিয়ে রাস্তাতেই গাড়ির আবডালে টি–শার্ট বদলে নিয়েছি। জীবনে প্রথম। কিন্তু বেশ মজা লাগল।

দুপুর ১২.‌২৩

বীভৎস গরম। চেতলা থেকে ফিরে এসে ওয়ার্কআউট করতে গিয়ে কেলিয়ে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস এক বোতল ইলেকট্রলের জল বানিয়ে রেখেছিলাম। সেটাই কোঁত কোঁত করে গিললাম।

অশোক’দা একটা পোস্ট এডিট লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। যে করে হোক আজই লিখে ফেলতে হবে।

দুপুর ১২.‌৩৫

আমি কি হাফ দাড়ি রাখব?‌ নাকি চাঁছাপোঁছা মায়ের বাছা হয়ে থাকব?‌ এই গরমে ফুল দাড়ি রাখাটা খুব কামবারসাম। কুটকুট করে। তাছাড়া মাস্ক পরে থাকায় মুখে–গালে হাতও দেওয়া যাবে না। দাড়িতে হাত বোলানোর সুখ থেকে বঞ্চিত। ফলে ফুল দাড়ি রাখা যাবে না। আবার বেশি বড় হাফ দাড়িও রাখা যাবে না। সেটাও খুব বিশ্রি। অযথা পশ্চাৎপক্ক মনে হয়। আপাতত এই গুঁড়ি গুঁড়িটা থাকুক। স্টাব্‌ল। দেখা যাক, কতদিন মেনটেন করতে পারি। এটা অ্যাপারেন্টলি খুব চিন্তার বিষয় নয়। আবার ভেবে দেখলে চিন্তারও। গভীর চিন্তার।

সকালে বেরোনর সময় দেখলাম পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা গেট খুলে বাগানের ভিতরেই ঢুকে পড়েছেন ফুল তুলতে। ভাবেননি বোধহয় তখন আমি বেরিয়ে পড়ব। চোখাচোখি হতে একটু লাজুক হেসে বললেন, ‘ফুল নিচ্ছি একটু আপনাদের বাগান থেকে।’

আমি ওঁদের বাড়ির আমগাছের দিকে তাকিয়ে ভিতরে একটা হিংস্র আনন্দ অনুভব করতে করতে একগাল হেসে বললাম, নিন না। যতখুশি নিন।

দুপুর ২.‌৩০

বাইপাসের পরমা আইল্যান্ডের সামনে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়েছিল পুলিশ। মনে হল, আবার কেস খেলাম নাকি?‌ কিন্তু আজ তো স্পিড লিমিট ভাঙিনি!‌ রাস্তার পাশের স্পিড গান আর ড্যাশবোর্ডের স্পিডোমিটারের উপর কড়া নজর রেখেছিলাম। মুখে মাস্ক, হাতে সার্জিক্যাল গ্লাভসের সুঠাম চেহারার সার্জেন্ট এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, কোথায় যাচ্ছেন?‌

— অফিসে।

‘কোন অফিস?’‌

— আজকাল। আইডি দেখবেন?‌

ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটা দেখিয়ে ফেরত নেওয়ার সময় সামনে তাকিয়ে দেখলাম, এক পুলিশকর্মী মোবাইলে নম্বরপ্লেট–সহ গাড়ির ছবি তুলে রাখছেন। কার্ডটা ওয়ালেটে রেখে বললাম, এবার আমি জিজ্ঞাসা করতে পারি?

‘বলুন।’‌

— গাড়ির ছবি তুলছেন কেন?‌

‘আসলে আমরা এখানে নাকা চেকিং করছি। তার ডকুমেন্টেশনের জন্য।’

ছাড়া পেয়ে তাড়াহুড়োয় গাড়ি এগোতে যাচ্ছি, সার্জেন্ট বললেন, ‘সিগনালটা হলে যান।’ ভাল লাগল। লকডাউনে এমন নজরদারিই দরকার। কেউ কার্ড দেখতে চাইলে অনেক রিপোর্টারই কুপিত হন। অপমানিত বোধ করেন। কেন করেন কে জানে!‌ আমি কখনও করি না। কারণ মনে করি, কার্ডটা দেওয়া হয় দেখানোর জন্যই। ওটা আইনি এবং বৈধ পরিচয়পত্র। কার্ড দেখতে চাওয়া যেমন পুলিশ বা অন্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাজ, তেমনই আমার এবং সকলেরই কাজ বিনা বাক্যব্যয়ে কার্ডটা দেখানো। এটা শৃঙ্খলা। এটা নিয়ম। এর মধ্যে ফালতু ইগো আসে কোত্থেকে?‌

বিকেল ৪.‌‌৩০

কাল দুপুর তিনটেয় আবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের ভিডিও বৈঠক। সম্ভবত লকডাউন তোলা নিয়ে কথা হবে। ১৭ মে তো প্রায় এসেই গেল। লকডাউন থাকলে লোকে এবার না খেয়ে মরবে। আর লকডাউন তুললে করোনায়। এগোলে নির্বংশের ব্যাটা, পিছোলে আঁটকুড়োর। কী করবি এবার কর!‌

বিকেল ৫.‌২৭

সারা দেশে এখনও পর্যন্ত লকডাউনের বলি ৩৮৬ জন!‌ ভাবা যায়?‌ করোনায় আক্রান্ত হয়ে নয়। তার পরোক্ষ অভিঘাতে। এর মধ্যে প্রথমসারিতে সেই পরিযায়ী শ্রমিকরাই। গতকাল রাতেও মধ্যপ্রদেশে আম–বোঝাই লরি উল্টে পাঁচ পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর হাঁটতে হাঁটতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন আরও তিনজন।

আজ বাইপাস দিয়ে আসার সময় জনা ১০–১২ যুবককে হাঁটতে দেখলাম। সকলের পিঠে সস্তাদরের ব্যাকপ্যাক। মুখে রুমাল বাঁধা। ঠিক যেমন দেখি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছবিতে রোজ রোজ। অন্তহীন হাঁটছে। মনে হয়েছিল, একবার গাড়ি থামিয়ে কথা বলি। কিন্তু অফিসে আসার তাড়া ছিল। দ্বিতীয়ত, আমার ভিতরের শকুনি রিপোর্টারটাও বোধহয় মরে গিয়েছে। সেটা ভাল না খারাপ বুঝলাম না।

সন্ধ্যা ৭.‌৩৪

বিপ্লবের স্যানিটাইজার–বিপ্লব!‌ এতবার হাত ধোয় সারাদিন যে, বিরক্ত হয়ে বললাম, এবার থেকে হাত ধোয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু’চামচ করে খেয়েও নিস!‌ একটুও না রেগে প্রচণ্ড স্মার্ট গলায় বিপ্লব বলল, ‘খেয়েছিলাম তো একদিন।’

বলে কী?‌ খেয়েছিলাম?! ‌নাহ্‌, অতটাও নয়। প্রায় খেতে যাচ্ছিল। টেবিলে জলের বোতলের পাশে স্যানিটাইজারের বোতল রাখা ছিল। অন্যদিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে স্যানিটাইজারের বোতল তুলে গলায় ঢালতে গিয়ে শেষমুহূর্তে ব্রেক কষেছে। কিন্তু এর ফলে মানবসভ্যতা একটি যুগান্তকারী এক্সপেরিমেন্ট থেকে বঞ্চিত হল— মানব পাকস্থলিতে স্যানিটাইজারের প্রভাব। কে জানে, হয়ত এটা নিয়ে কত লোকে পিএইচডি–ও করে ফেলত আর বিপ্লবের নাম স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকত। বললাম, কী চান্স যে মিস্‌ করলি, বুঝতেও পারছিস না। বিপ্লব ওর সেই মিঠে হাসিটা হাসল। আমিও হাসলাম।

রাত ৯.‌‌০০

মঙ্গলবার থেকে ধাপে ধাপে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো শুরু হচ্ছে। তেমনই ঘোষণা করল রেলমন্ত্রক। ১৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হবে দিল্লি থেকে। ১৫টি প্রান্তিক স্টেশন পর্যন্ত। তার মধ্যে হাওড়াও আছে। সোমবার, মানে কাল থেকে অনলাইন বুকিং শুরু। স্টেশনে টিকিট কাটার গল্প নেই। প্ল্যাটফর্ম টিকিটও পাওয়া যাবে না। বৈধ টিকিট ছাড়া কাউকে ট্রেনে উঠতে দেওয়া হবে না। ট্রেনে ওঠার আগে সকলের স্বাস্থ্যপরীক্ষাও করা হবে।

এটা কি লকডাউন আংশিক তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত?‌ সম্ভবত তা–ই। এটা একটা পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। তেমন বুঝলে বোধহয় আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। আসিড টেস্ট। একেবারে অ্যাসিড টেস্ট।

রাত ১০.‌‌২০

বুকে ব্যথা নিয়ে মনমোহন সিংহ এইমসে ভর্তি। আপাতত কার্ডিওথোরাসিক ইউনিটে। প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়েই বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। তারপর থেকে হাত নাড়ার সময় উপরে তুলতে পারতেন না। দেহের সমান্তরালে হাত নাড়াতেন পুতুলের মতো। সেটা নিয়ে কত হাসাহাসি করেছি। নকল করেও দেখিয়েছি অনেককে।

কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পক্ষে এটা ভাল সময় নয়। কোনওমতে খবরটা পেজ ওয়ানে ধরালাম।

রাত ১০.‌৪০

একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেল একপশলা। আজ মাতৃদিবস ছিল। দীর্ঘ দগ্ধদিনের পর এই ধারাস্নানে ধরিত্রী মায়ের বুক একটু জুড়োল কি?‌

2 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ১০ মে, ২০২০

  1. ভাল মানুষ আর সৎ হওয়ার শিক্ষাটাই আসল। ওটা ছাড়া আর বাকি সব ফক্কা।
    বড় হয়ে বাচ্চারা যখন শিকড় ছুঁতে আসে, (সবাই না, কেউ কেউ) তখন বুঝি ওদের
    মনের কোনো এক কোণায় হয়তো বা একটু জায়গা পেয়েছি।
    আপনার মত ওটাই অক্সিজেন সিলিন্ডার।
    দিনের শেষে একটু বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি।

    তবে এমন মাস্টারমশাইদের পথচলা টা কিন্তু কঠিন।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s