লকডাউন ডায়েরি – ৯ মে, ২০২০

০৯.‌০৫.‌২০২০। শনিবার

সকাল ৯.‌৪৫

শেষপর্যন্ত গতকাল সত্যিকথাটা বলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব— ভবিষ্যতে করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। একদিক থেকে এটা হাল ছেড়ে দেওয়া। অন্যদিক থেকে এটাই শাশ্বত সত্য। কারণ, আমাদের মতো দেশে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না। কতদিন এই লকডাউন চলবে?‌ গোটা দেশ থেমে আছে। সব ওলটপালট। কোনও না কোনওদিন তো স্বাভাবিকতায় ফিরতে হবে। সেটা যতই অস্বাভাবিক হোক।

আর শুধু আমাদের মতো দেশই বা কেন?‌ সিঙ্গাপুরও তো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারেনি। ওইরকম একটা বজ্র আঁটুনির দেশ। যেখানে মাদক পাচারের শাস্তি মৃত্যু। রাস্তায় থুতু ফেললে জেল। আইন ভাঙলে পশ্চাদ্দেশে বেত্রাঘাত। সেখানেও ধমকে–চমকে করোনার সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। আবার পাশাপাশিই মনে হয়, তাহলে কেরল কী করে পারল?‌ ওই রাজ্যটাও তো আমাদেরই দেশের অঙ্গ।

তাহলে কি মানুষ চাইলে সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?‌ তার হাতেই থাকে ভবিষ্যতের চাবিকাঠি?‌ সত্যি সত্যিই ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়?‌

সকাল ১০.‌০৩

অমিত শাহের চিঠি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে। বক্তব্য, পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ওই শ্রমিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ট্রেন দেওয়ার আবেদন করছে না তারা। ভিন রাজ্য থেকে ট্রেন ঢোকার অনুমতিও দিচ্ছে না রাজ্য প্রশাসন। কারণ, আসলে তারা সংক্রমণের ভয়ে বিভিন্ন রাজ্যে আটকে–পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছেন, গোটা দেশেই পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজের রাজ্যে ফিরছেন। কেন্দ্রীয় সরকার সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ২ লাখ শ্রমিক ফিরে গিয়েছেন। আরও ফিরছেন। সব রাজ্যই নাকি তাদের বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানোর জন্য ট্রেন চেয়ে চিঠি লিখছে। একমাত্র ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। এবং পশ্চিমবঙ্গের এই ভূমিকায় অমিত ব্যথিত। তাঁর যন্ত্রণা হচ্ছে!‌

এই চিঠির অভিঘাত কিন্তু বহুদূর যাবে। তৃণমূলের তরফে কড়া প্রতিক্রিয়া এল বলে। তারপর দেখা যাক কোথাকার রেল কোথায় গড়ায়।

বেলা ১১.‌২৫

যা ভেবেছিলাম। লড়াই জমে গিয়েছে। সৌগত রায় ইতিমধ্যেই বলেছেন, অমিত শাহ অসত্য বলছেন। অভিষেক ব্যানার্জি টুইট করে দাবি করেছেন, অসত্যভাষণের জন্য অমিত শাহকে ক্ষমা চাইতে হবে। আপাতত ঠিক হয়েছে, দুপুরে ভিডিও প্রেস কনফারেন্স করে ডেরেক ও’ব্রায়েন, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন। সোজা কথায়, অমিত শাহকে ঝাড়বেন।

দুপুর ১২.‌১৮

আমার এদিকেও খেলা জমেছে।

ওয়ার্কআউট করতে করতে তিনটে ফোন এল। প্রথমটা জনসংযোগমূলক। খেজুরে। বললাম, পরে কর‌ছি। দ্বিতীয়টা জিডি মার্কেট থেকে। পার্কারের রোলার রিফিল এসে গিয়েছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকবে। চাইলে গিয়ে নিয়ে নিতে পারি। খুবই জরুরি ইনফর্মেশন। প্রভূত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম, আজ আর যাচ্ছি না। কাল সকালে গিয়ে নিয়ে নেব। তৃতীয় ফোনটা সুভাষ ভৌমিকের। ধরতেই হল। ‘বলুন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা গলা বলল, ‘কী করছো?‌ হাঁফাচ্ছো কেন?‌’

বললাম, ভয় পাবেন না। কোভিড হয়নি। এটা শ্বাসকষ্ট নয়। আসলে আউটডোর গেম্‌স আর অ্যাক্টিভিটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে কিছুদিন ধরে বাড়িতেই ওয়ার্কআউট শুরু করেছি। সেটাই করছিলাম। তাই হাঁফাচ্ছি।

‘বাহ্‌, কিন্তু কোর এক্সারসাইজগুলো বেশি করে করো। যেন ভুঁড়িটা না হয়।’

বললাম, সেই চেষ্টাতেই রোজ এই প্রাণপাত করে পলাশির প্রান্তরে খাপ খুলতে অবতীর্ণ হওয়া। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সুভাষ’দা বললেন, ‘গানটা কি এখনও গাওয়া হয়?‌’ আমি নিরুত্তর। ওপাশ থেকে ভেসে এল, ‘এসব লকডাউন–টাউন উঠে যাওয়ার পর একদিন বাড়িতে এসো। অনেকদিন তোমার গান শুনি না।’

হে ধরণি!‌ আবার দ্বিধা হও।

সুভাষ’দার ফোন ছেড়ে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। রিফিলটা নেওয়ার জন্য কি কাল পর্যন্ত ওয়েট করব?‌ নাকি আজই নিয়ে আসব?‌ এখন বাকি ওয়ার্কআউটটা করে নেব?‌ মনের ভিতরে শুম্ভ–নিশুম্ভের লড়াই শুরু হল।

শুম্ভ বলল, শরীরের চেয়ে মেধা এবং মননকে বেশি গুরুত্ব দাও। তুমি সলমন খান নও। শরীরের সঙ্গে তোমার চাকরির কোনও সম্পর্ক নেই। তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় মেধা বিক্রি করে। তোমার হাতিয়ার কলম। তাতে কালি না থাকলে যুদ্ধে জিতবে কী করে?‌ তাছাড়া জিডি মার্কেট এবং সুভাষ’দার ফোনে ওয়ার্কআউটের তাল কেটে গিয়েছে। কথা বলতে বলতে ফ্যানের হাওয়ায় ঘাম ইতিমধ্যেই কিছু জুড়িয়ে গিয়েছে। কয়লার ইঞ্জিন আবার চালু করতে সময় লাগবে। সেই সময়টা দিতে দিতে বাবা–মা’কে খেতে দেওয়া এবং ঘর মোছার সময় চলে আসবে। তখন আবার রিফিলের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। কাল যদি না যাওয়া হয়?‌ রিস্ক নিয়ে কী হবে?‌ ফলে এখন রিফিল কিনতে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নিশুম্ভ বলল, এ যুক্তি ফাঁকিবাজের। আসলে তুমি ওয়ার্কআউটটা পুরো করতে চাইছো না। এখনই গরমে কেলিয়ে পড়েছো। তাই রিফিলের অজুহাত দিয়ে কেটে যেতে চাইছো। রুটিনটা ফলো করো। জীবনে শৃঙ্খলা রাখো। ‘সুলতান’–এর সলমন খান বা ‘গজনি’–র আমির খান হতে হবে না। সেটা তোমার ধকে কুলোবেও না। কিন্তু ফিটনেস রেজিমটা রাখা জরুরি। দিনে এই একটা ঘন্টা নিজেকে দাও। ঝরঝরে থাকো। মহাজ্ঞানীরা বলে গিয়েছেন। কথা শোনো।

আরও দু’মিনিট যুদ্ধ হল। তারপর যা হওয়ার ছিল, তা–ই হল। শুম্ভ জিতে গেল।

একলম্ফে নীচে গিয়ে গাড়ি বার করে জিডি মার্কেটে চলে গেলাম। চার–চারটে রোলার রিফিল কিনেছি। যদিও দরকার ছিল কালো আর নীল কালির ‘আল্ট্রা ফাইন’। ওটাই প্রথম পছন্দ। সেটা আসেনি। তবে সেটাও চলে আসবে বলে জানা গেল। ওই দোকানেই কুইকফিক্স পাওয়া গেল। স্নিকার্সের সোল সারাতে কাজে লাগবে।

ঘামতে ঘামতে বিজয়দর্পে ফিরেছি।

দুপুর ১.‌৩২

লেগে গিয়েছে নারদ–নারদ। ডেরেক, কাকলি’দি আর রাজীব ধুনে দিচ্ছেন অমিত শাহকে। তাঁরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী লকডাউন ঘোষণার অব্যবহিত পরেই ১৮টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের দেখভাল করতে এবং সুরক্ষিত রাখতে। সেটা জানানোর পাশাপাশিই তাঁরা বলছেন, ইতিমধ্যেই দুটো ট্রেন রাজ্যে এসে পৌঁছেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে। আরও আটটি ট্রেন ছাড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চারটি রাজ্য থেকে। সেগুলো পরপর ঢুকবে। কত শ্রমিক রাজ্যে ফিরেছেন, আরও কতজন আসছেন— সমস্ত তালিকা হাতে করে বসেছেন ডেরেক। সেটাই করা উচিত।

বাবুল সুপ্রিয়র অবশ্য দাবি, ‘অমিত শাহের চিঠির পরেই আটটা ট্রেনকে ঢুকতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ আর অধীর চৌধুরির বক্তব্য, ‘আমি অমিত শাহের সঙ্গে কথা বলার পর আটটা ট্রেন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আটটা ট্রেনে হবে না। লাখো লাখো বাংলার মানুষ আটকে রয়েছেন। তাঁদের ফেরাতে অবিলম্বে আরও ট্রেন দরকার।’

ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, এটা বিজেপি–র ব্যাড পলিটিক্স। যেখানে অলরেডি পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে এসে পৌঁছে গিয়েছেন এবং ঘটনাচক্রে, তাঁদের মধ্যে চারজনের দেহে সংক্রমণ ধরাও পড়েছে, সেখানে এই চিঠি লেখা অর্থহীন। তবে মনে হচ্ছে এটা আরও বড় গোলমালের দিকে যাবে। রাজনীতি রাজনীতির মতো চলবে। মাঝখান থেকে লোকগুলো এ–দরজা ও–দরজায় ঠোক্কর খেতে থাকবে। যেমন হয়ে এসেছে। কেউ বলবে না যে, একটা কল্যাণকামী গণতন্ত্রে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাঁচানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বলবে না যে, মাত্র চারঘন্টার নোটিশে দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা করার সময় এঁদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। কারণ, এঁদের নিয়ে কেউ ভাবে না। ভাবেনি কোনওদিন। চিরকাল এঁদের ভেড়ার পাল হিসেবে ট্রিট করা হয়েছে। রাজনীতির চৌষট্টি খোপের খেলায় এঁদের ব্যবহার করা হয়েছে বটে। কিন্তু নিছক বোড়ে হিসেবে, যা দাবাখেলায় সবচেয়ে কমদামী ঘুঁটি। বাকি সময়ে এঁদের আগাছার মতো দেখা হয়েছে। যাদের জন্ম, যাপন এবং মৃত্যু সবই রাস্তার নর্দমার পাশে।

কাল একটা টুইট করেছিল বীর সাংভি— ‘ইজ এনিওয়ান গোয়িং টু মেক আ মুভি অন দ্য ম্যাসিভ হিউম্যান ট্র্যাজেডি অফ দিস মাইগ্র্যান্ট এক্সোডাস?‌ অর ইজ বলিউড টু বল–লেস অ্যান্ড সোল্ড আউট নাউ?‌’

বীর প্রতিভাশালী সম্পাদক। ওর লেখার আমি ভক্ত। এত লুসিড ইংরেজি খুব কম পড়েছি। এমনকী, খাবার নিয়ে লেখা সাপ্তাহিক কলাম ‘রুড ফুড’ও আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। পাশাপাশি, বীর বলিউডের অন্দরমহলের ঘাঁতঘোঁত নিয়েও খবর রাখে। তাই এই টুইট আরও অর্থবহ। সম্ভবত ও ঠিকই ভেবেছে। বলিউডে আরও গোটাকয়েক ‘উরি’ তৈরি হবে। কিন্তু এই লোকগুলোর যন্ত্রণাটা কেউ ঘাঁটতে যাবে না। কারণ, ‘ওনলি সেক্স অ্যান্ড এসআরকে সেল্‌স ইন ইন্ডিয়া’।

অথচ এতদিন টানা লকডাউনের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অভিঘাত তৈরি করেছে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের লড়াই। তাদের জীবন এবং তাদের অন্তহীন মরিয়া যাত্রা। চেন্নাইয়ে লাঠির বাড়ি। সুরাতে কাঁদানে গ্যাস। আর কত মারবে জীবন!‌ যখন বিরক্ত বা একঘেয়ে লাগে, তখন ওদের ছবিগুলোর দিকে তাকাই। আকুতি আর অসহায়তা ভরা দৃষ্টিগুলো তিরের মতো এসে বেঁধে। ভাবি, অনেক ভাল আছি। অনেক!‌

দুপুর ১.‌৩৫

সূর্যকান্ত মিশ্র বিবৃতি দিয়েছেন, ‘যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুস্থ আছেন’।

হঠাৎ?‌ কী খবর ছড়ানো হচ্ছিল?‌ কেনই বা?‌ এটা কী ধরনের বাঁদরামি?‌ বুদ্ধবাবু অসুস্থ। অনেকদিন ধরেই অসুস্থ। অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া ঘরেও হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। কিন্তু এমন কদর্য গুজব কেন রটানো হবে?‌ এবং সেই গুজব এতটাই ডালপালা মেলল যে, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদককে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে সেটা অস্বীকার করতে হল?‌ ছি–ছি!‌

দুপুর ১.‌৪৪

রুদ্রনীলের একটা বাচিক অভিনয়ের ভিডিও পেয়েছি। একটা কবিতা। ‘ভাল আছি’। চমৎকার!‌ খুব অনেস্ট লেখা। কোথাও কোথাও একটু কাঁচা। একটু ছন্দপতনও আছে। কিন্তু সৎ। এডিটিং ভাল। সাউন্ড ভাল। মিক্সিং ভাল। সবচেয়ে ভাল যে, সাদা–কালোয় বানানো। এই লকডাউনের মধ্যে অনেকের অনেক শিল্পকর্ম নজরে এসেছে। এখনও পর্যন্ত এটাই সেরা।

‘ফ্যাতাড়ু’ এবং পুরন্দর ভাট থেকেই রুদ্রর অভিনয়প্রতিভার ভক্ত আমি। মাঝখানে একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটা একেবারে সলিড নামিয়েছে। রুদ্রকে সেটা জানালাম। একটি ভালবাসা এবং চারটি ফুলের ইমোজি–সহ জবাব এল, ‘ধন্যবাদ গো’। অশোক’দা একবার লিখেছিলেন, অমুকের মুখের ওই ‘গো’টা তপ্ত বৈশাখে ফ্রিজ থেকে সদ্য বার করা থাম্‌স আপের মতো। রুদ্ররটাও তেমনই মনে হল। কারণ, গরমটা ফাটিয়ে পড়েছে। যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আদিখ্যেতা করে লিখছিলেন, মে মাসেও ফ্যান কম স্পিডে চালিয়ে গায়ে চাদর দিতে হচ্ছে, ছাতা ছাড়া এই রোদে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে তাঁদের ইন্টারভিউ নিতে ইচ্ছে করছে!‌

দুপুর ২.৩৮

চশমা খুললে নিজেকে ইদানীং ‘অন্ধা কানুন’–এর প্রেম চোপড়ার মতো লাগে। চারদিক ঝাপসা। প্রায় অন্ধ হওয়ার মতো। একটা সময়ে কেতা করে পাওয়ারলেস চশমা পরতাম। যাতে বয়সের তুলনায় একটু পাকা আর পরিণত লাগে। এখন বুঝতে পারি, কী গয়নার জন্য হা–হুতাশ করেছিলাম!‌ রাতে বেডসাইড টেবিলে চশমা রেখে শুতে হয়। রাতে ফোন এলে যাতে ঠিকঠাক নামটা দেখতে পারি।

দুপুর ৩.৩০

বীরভূমের নলহাটিতে প্রায় ঔরঙ্গাবাদের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছিল। লাইন ধরে হাঁটার সময় পাকুড় থেকে আসা ইন্সপেকশন ট্রেনের সামনে প্রায় পড়ে গিয়েছিলেন একদল শ্রমিক। ২০ জনের দলটা ১২০ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। কোনওক্রমে ব্রেক কষে ট্রেন থামিয়েছেন চালক। ভাগ্যিস!‌ তাঁদের উদ্ধার করে আপাতত প্রশাসনের আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। চেষ্টা হচ্ছে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার।

বিকেল ৪.‌০৫

আবার দৈনিক প্রেস ব্রিফিংয়ে আলাপন’দা। পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে বলছে। বলছে, রাজ্যের বিভিন্ন দিকের সীমান্তে পরিযায়ী শ্রমিকরা হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছেছেন বাড়ি ফেরার পথে। তাঁদের সরকারি বাস বা বেসরকারি বাস রিকুইজিশন করে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আলাপন’দা জানাচ্ছে, করোনা এবং কো–মর্বিডিটি মিলিয়ে রাজ্যে এখনও পর্যন্ত মৃত ১৭১ জন। গত ২৪ ঘন্টায় রাজ্যে মৃত ১১ জন।

স্কোরবোর্ড চালু আছে। সিঙ্গলসেই খেলছে। বড় শট নিচ্ছে না। কিন্তু আলাপন’দার ব্যাটে টুকটুক করে রান বাড়ছে।

সন্ধ্যা ৭.‌০৫

পুনের রেললাইনে আবার একদল ক্লান্ত পরিযায়ী শ্রমিক। ধ্বস্ত অবস্থায় বসেছিলেন। দূর থেকে দেখতে পেয়ে ট্রেন থামিয়েছেন চালক। এটা কিন্তু একটা নিয়মিত ফিচার হয়ে গেল। পরিযায়ী শ্রমিক–ট্রেন–মৃত্যু। এই ত্রিভুজ থেকে কি কখনও মুক্তি পাওয়া যাবে?‌

রাত ৮.০৩

নাছোড় ‌রাজ্যপাল আবার কলকাতা পুরসভা নিয়ে টুইট করেছিলেন। এবার ব্যাপক চটেছেন কলকাতা পুরসভার মুখ্য প্রশাসক (‌এখন আর ‘মেয়র’ বলা যাবে না)‌ ফিরহাদ হাকিম। ঝোড়ো অতীত পিছনে ফেলে ববি এখন অনেকটাই মেলোড ডাউন করে গিয়েছেন। ঠান্ডামাথায় যাবতীয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। কিন্তু আজ যে উত্তেজিত গলায় তিনি জবাব দিলেন, তা সাম্প্রতিক অতীতে তাঁকে করতে দেখিনি।

গলা চড়িয়ে ক্যামেরার সামনে ফিরহাদ বললেন, ‘উনি তো দিব্যি আছেন!‌ দোতলা থেকে নেমে এসে গালাগাল দিয়ে আবার উঠে যাচ্ছেন। ওঁর তো আর কোনও কাজ নেই। আরে, আমি কি প্রশাসক হতে চেয়েছি?‌ নবান্ন করেছে। আমরা না থাকলে কাজগুলো কারা করত?‌ আছে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা?‌ এই সময়ে আমরা বাড়িতে বসে থাকলে আমাদের বাড়ির লোকও খুশি হতো। কিন্তু আমরা রাস্তায় বেরিয়ে কাজ না করলে কাজগুলো হবে কী করে?‌’

ববি কি একটু বিরক্ত হয়ে পড়ছেন?‌ তিনি কি জানেন না যে, রাজ্যপাল একটা স্নায়ুর লড়াইয়ে নেমেছেন?‌ কাজকর্ম দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, প্রশাসনকে ক্রমাগত ইরিটেট করে যাওয়াটাই তাঁর লক্ষ্য। ইট্‌স লাইক হু ব্লিঙ্কস ফার্স্ট। ফিরহাদের চোখের পলক কি পড়ে গেল?‌ নাকি তিনি জোরে বোলারকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গ্যালারিতে ফেলার স্ট্র্যাটেজি নিয়েছেন?‌

রাত ৯.৩২

আবার কেন্দ্রীয় দল আসছে রাজ্যে। অতএব, আবার গোলমাল। তবে শুধু এ রাজ্যে নয়। আরও ৮ টা রাজ্যে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় দল। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানা।

রাত ১০.‌০০

স্পেশাল ট্রেন ধরতে গিয়ে গতকাল ঔরঙ্গাবাদে মালগাড়ির চাকায় পিষ্ট শ্রমিকদের দেহাংশ তাঁদের মধ্যপ্রদেশের বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে একটি স্পেশাল ট্রেনে।

এই পরিহাসটাও হওয়ার ছিল!‌

4 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ৯ মে, ২০২০

  1. পরিযায়ী শ্রমিকদের দুর্দশা বড় যন্ত্রণার।
    সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল! মাত্র কয়েকদিনে।
    তবু গান শোনার ইচ্ছে থাকলো।

    Like

  2. Sei 2007 saal theke apnar lekhar bhakto. Amar bari jalpaiguri jelar DHUPGURI te. Prothom je lekhati pore chhilam. Seta chhilo ‘ swadhinata niye lekhai, 50 tamo swadhinata dibosh cover korbar smirity chabona diye suru. Tar por apnar anek lekha porechhi aar mugdho hoyechhi. Apni ebelar sampadok thanks kalin, sudhu apnake ekbar dyakhar jonyo dudin Ananda Bazar office er samne dariyechhilam. Ei lockdown cholakalin protidin sakal Bela, apnar lockdown diary poratai amar prothom kaj hoye uthechhe.. ebar boi melai jaini Tai apnake samne theke dyakhar sujog ta miss kore giyechhi.. khub valo thakben.. iti RANA KARMAKAR

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s