লকডাউন ডায়েরি

৫.‌০৫.‌২০২০। মঙ্গলবার

সকাল ৮.‌৪৭

সকালটা একটা ভাল খবর দিয়ে শুরু হল বলে মনে হচ্ছে। টুইটারে একটা বিদেশি কাগজের হ্যান্ডলে দেখছি ইজরায়েল ইনস্টিটিউট অফ বায়োলজিক্যাল রিসার্চ নাকি কোভিড–১৯ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলেছে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘প্যাসিভ ভ্যাকসিন’। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক তেমনই দাবি করেছে। এখন তারা ওই অ্যান্টিবডির পেটেন্ট নেওয়ার কাজ শুরু করছে। যাতে এর কমার্শিয়াল বিপণন করা যায়।

এমন অনেক দাবিই অবশ্য চারদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অহরহ ঘুরছে। জানি না, এর সত্যতা কতটা। ফেক নিউজ কিনা তা–ও বলতে পারব না। হয়ত কোনও জ্ঞানী এবং ওয়াকিবহাল জানাবেন, এটা আদৌ ঠিক নয়। কিন্তু দেশটা ইজরায়েল বলেই অত সহজে উড়িয়ে দিতে পারা যাচ্ছে না। পাশাপাশি একটা আশাও তো কাজ করে। মনে হয়, কতদিন চলবে এই পরিস্থিতি। আরও কতদিন?‌ এই ধরিত্রীর কেউ কি কোনও সুরাহা করতে পারবে না?‌ অনেকদিন তো হল!‌

সকাল ৮.‌৫০

সত্রাজিৎ ফেসবুক স্টেটাসে একটা পোস্টার শেয়ার করেছে। দেখে এই ঘনঘোর অবস্থাতেও হাসি পেল— ‘পাত্র আইআইটি ইঞ্জিনিয়ার, সুদর্শন, বয়স ৩৬, মধ্য কলকাতায় বাড়ি, দাবিহীন। অনূর্ধ্ব ২৫, সুশ্রী, স্নাতকোত্তর, গ্রিন জোন নিবাসী পাত্রী চাই’।

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু এটুকু লিখতেই হচ্ছে যে, এমন বিপদেও মানুষের রসবোধ চলে যায়নি। আমার কাছে এটা একটা পজিটিভিটি তো বটেই। হতে পারে, যাঁরা এই পোস্টারগুলো তৈরি করছেন, তাঁদের অবস্থা তুলনায় ভাল। কিন্তু আসলে তো মোটের উপর কারওরই অবস্থা ভাল নয়। তার মধ্যেও যাঁরা লঘু রসিকতা সম্পৃক্ত মস্তিষ্কটি সজাগ এবং সচল রেখেছেন, তাঁদের স্যালুট।

সকাল ৯.‌৩২

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর ভিডিও কনফারেন্স দেখলাম। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বললেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিককে সাময়িক রেশনকার্ড দেওয়া উচিত। আরও বললেন, লকডাউনের জেরে দেশ জুড়ে যে ভয়াবহ দারিদ্র দেখা দেবে, তার মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এবং গ্রামীণ এলাকায় বিশেষ নজর দিতে হবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে।

এগুলো সবই প্রয়োজনীয় এবং জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু রাহুলের সঙ্গে আলোচনায় উনি যে পরামর্শ দিলেন, তা কি কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ গ্রাহ্য করবে?‌ আমাদের দেশে কি রাজনৈতিক দলগুলো এতটা উদার হতে পারে?‌

অন আ লাইটার নোট, লকডাউনের সময় রাহুল যেভাবে পরপর বিশিষ্টদের ভিডিও সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করেছেন, তাতে এরপর টিভি অ্যাঙ্করদের চাকরি নিয়ে টানাটানি না পড়ে!‌ তবে রাহুলের শোয়ে অতিথিদেরই বেশি কথা বলতে দেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও আজ অভিজিৎ ইউটিউবে একটি ভিডিওবার্তা দিয়েছেন। ২ মিনিট ৮ সেকেন্ডের সেই বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘এই লড়াইয়ে জিত নিশ্চিত। তবে হয়তো এখনই জয় হবে না। কয়েকমাস লাগবে।’ করোনা সংক্রমণ রুখতে প্রাথমিক করণীয়গুলি আবার মনে করিয়ে দিয়ে অভিজিৎ বলেছেন, ‘কাশি বা জ্বর হলেই করোনা নয়। কিন্তু তেমনকিছু হলে তা সঙ্গে সঙ্গে জানান। সুস্বাস্থ্যে থাকবেন। আশা হারাবেন না। আমার নমস্কার নেবেন।’

সকাল ১০.‌০৫

পুত্রসন্তানের মা হয়েছেন কোয়েল মল্লিক। অর্থাৎ, বাবা হলেন নিসপাল সিং, দাদু হলেন রঞ্জিত মল্লিক এবং দিদা হলেন রঞ্জিতের স্ত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় সদ্যোজাত সন্তানের সঙ্গে একটি মিষ্টি ছবি–সহ পোস্টার শেয়ার করেছেন সদ্যোজাত বাবা–মা। সকলে কোয়েল এবং নিসপালকে অগাধ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কিন্তু সস্ত্রীক রঞ্জিতকেও শুভেচ্ছা জানানো উচিত। কোয়েলের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। চোখেও দেখিনি কখনও। তবে শুনেছি, তাঁর সহবত দৃষ্টান্তযোগ্য। এবং তার কৃতিত্ব তাঁর মায়ের। তিনি নাকি খুবই কঠোর অনুশাসনে মেয়েকে বড় করেছেন। বাবা হিসেবে রঞ্জিতও অতুলনীয় বলেই শুনেছি।

এমনিতে কোয়েলের ইন্টারভিউ নেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্নরা বলে থাকেন, তিনি ভীষণরকমের পলিটিক্যালি কারেক্ট। কোনও বিতর্কিত মন্তব্য করেন না। তেমন কোনও প্রশ্ন করলে কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাটের কায়দায় এড়িয়ে যান। আর প্রায় সব কথাতেই ঐশ্বর্য রাইয়ের মতো হেসে গড়িয়ে পড়েন। যাকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা ‘গিগলিং’ বলে অভিহিত করি। কিন্তু সাক্ষাৎকারের বাইরে ব্যক্তিগত পরিসরেও কোয়েল খুবই ‘সর্টেড’ বলে এক সম্পাদক অনেক আগে জানিয়েছিলেন।

আশা করব, কোয়েল তাঁর পুত্রকেও ঠিক সেভাবেই বড় করবেন, যেভাবে তাঁর মা তাঁকে করেছিলেন। এক অভূতপূর্ব সময়ে জন্ম নিয়েছে তাঁর সন্তান। এক কঠিন সময়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে সে। যে আলো এমনিতেই খুব আশাপ্রদ নয়। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। নবাগতকে বেঁচে থাকতে হবে এই অসুস্থ পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে। ফলে তার এবং তার জনক–জননীর বাড়তি শুভেচ্ছা প্রাপ্য এবং প্রয়োজনীয়।

বেলা ১১.‌১১

ছোটবেলার পাড়ার জুনিয়র শান্তু ফেসবুকে স্টেটাস লিখেছে, ‘সুখবর। কাল যাঁরা দোকানে দোকানে লাইন দিয়ে মদ কিনেছেন, তাঁদের জন্য আজ হেলিকপ্টার থেকে চানাচুর ছড়ানো হবে’।

দেখে হাসি পেল ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি ওই ছবিটাও মনে পড়ে গেল। দেশের কোনও এক এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সন্তান আর বোঁচকা–বুঁচকি নিয়ে হেঁটে আসছে এক পরিবার। দুই মহিলার একজনের কাঁধ থেকে একটা গ্যাদা বাচ্চা মোটা করে কাজল–পরা চোখে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে। অন্য এক মহিলার কাঁখ থেকে ঝুলছে আরেকটি শিশু। সেই মহিলার মাথায় একটা নোংরা বস্তা। তাঁর পাশে কাঁধে ওইরকমই একটা বস্তা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশে দেখছেন একজন। কারণ, তাঁদের মাথার ঠিক উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ভারতীয় বায়ুসেনার দানবীয় এমআই–১৬ হেলিকপ্টার। সেখান থেকে নীচে ঝরে পড়ছে রক্তগোলাপের হাজার হাজার পাপড়ি।

কপ্টারের রোটর ব্লেডের হাওয়ার ঝাপটায় সেই ফুলের পাপড়ি উড়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে। আর সেই দাপট থেকে মাথা বাঁচাতে সড়কের উপর ক্রমশ আরও জড়সড় হয়ে পড়ছে তিনটে ক্ষয়াটে চেহারার মানুষ।

ছবিটা টুইট করে একজন লিখেছিলেন, ‘মোদি’জ ইন্ডিয়া ফ্লাইজ হাই— ওভার দ্য রিয়েল ইন্ডিয়া’। ঠিকই। সকল দেশের রানি, সে যে আমার জন্মভূমি!‌

বেলা ১১.‌৩০

একটা রেলগাড়ি বারবার ঘুরেফিরে আসছে চিন্তায়। সেটা মাথায় ঢুকেছে ‘দ্য হাম্বলিং’ ছবি থেকে। সাইমন অ্যাক্সলার এক বয়স্ক থিয়েটার অভিনেতা। মনোরোগী। ভিডিওতে যার নিয়মিত থেরাপি হয়। পেল্লাই একটা বাড়িতে সে একা থাকে আর বিভিন্ন বিষয় হ্যালুসিনেট করতে থাকে। ঘটনাক্রমে সাইমন তার থেকে ৩২ বছরের ছোট একটি লেসবিয়ান মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মেয়েটির মা সাইমনের বন্ধু ছিলেন। মেয়েটির বয়স যখন ৮ বছর, তখন সাইমন ৪০। তখন থেকেই সাইমন তার হিউজ ক্রাশ। এতবছর পর বান্ধবীকে ছেড়ে এসে ৬৭ বছরের বৃদ্ধ সাইমনের সঙ্গে থাকতে শুরু করে সেই মেয়ে। যে এখন ডাগর যুবতী। বৃদ্ধ সাইমনকে সিডিউস করে সে প্রায় বাধ্য করে তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে।

সাইমনের রোলে আল পাচিনো। সেজন্যই দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু ছবিটা খুবই স্লো। দেখে খুব একটা ভালও লাগল না। শুধু একটা বিষয় ছাড়া। সাইমনের বাড়িতে মেয়েটি আসার পর প্রথমদিনই দু’জন মিলে সারা বাড়িতে খেলনা ট্রেনের লাইন পাতে। তারপর সেই ট্রেন চলতে থাকে খাটের তলা দিয়ে, ডাইনিং টেবিলের পাশ কাটিয়ে, সোফার ধার ঘেঁষে অথবা বই স্তূপ করে বানানো কৃত্রিম সেতুর উপর দিয়ে। আর নিবিষ্টমনে সেই যাত্রা নিরীক্ষণ করতে থাকে দুই অসমবয়সী প্রেমিক–প্রেমিকা।

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ছবিতে সাইমনের জীবনের মতোই বিরতিহীন এক যাত্রাপথে ট্রেনটা ঘুরে যাচ্ছে। ঘুরেই যাচ্ছে। গোল গোল। পথের শেষ নেই। প্রান্তিক স্টেশন নেই। কোথাও তার যাত্রা শেষ হচ্ছে না। একটু ডিস্টার্বিং। এই সময়টার মতো। অন্তহীন।

দুপুর ১২.‌২৩

রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আজমেড় থেকে প্রথম ট্রেনটি ডানকুনিতে পৌঁছেছে। আরোহীদের প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে স্প্রিঙ্কলার থেকে মিথাইল অ্যালকোহল ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সঙ্গে জল মেশানো জীবাণুনাশক আগাপাশতলা স্প্রে করে, থার্মাল স্ক্রিনিং করিয়ে এবং হাতে ১০টা করে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট ধরিয়ে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে কোয়ারেন্টিন বিধি মানার জন্য ছাপানো নির্দেশিকা। অর্থাৎ, বাড়ির কাছে পৌঁছেও তাঁদের বাড়ি ফেরা হল না। আরও কত দুর্গতি যে আছে এঁদের কপালে!‌‌

দুপুর ১.‌৪৩

তাঁর আর স্ত্রী এস্থার দুফলোর ছবি নিয়ে টুইটারে আবির্ভূত হলেন অভিজিৎ বিনায়ক। সঙ্গে প্রথম টুইট, ‘আ বিট লেট। বাট ফাইনালি অন টুইটার টুডে’। টুইটার বায়োতে বলা হয়েছে, ‘অ্যান ইকনমিস্ট। নোবেল লরিয়েট। অফিশিয়াল টুইটার হ্যান্ডল। প্রোফাইল ম্যানেজ্ড বাই মি’। দেখছি ৫৭ মিনিট আগে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। এখনই ১৪৫ জন ফলোয়ার। দিন শেষ হওয়ার আগে নিশ্চয়ই এই সংখ্যাটা দ্রত বাড়বে।

মনে হচ্ছে, রাহুল গান্ধী আজ সকালে অভিজিৎকে এই পরামর্শটি দিয়েছেন। কারণ, দলে দলে কংগ্রেসের লোক এবং প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি ওই হ্যান্ডলে হাজির হচ্ছে। তারা সকলেই তাঁর সঙ্গে রাহুলের কথোপকথন আপলোড করেছে। অভিজিৎ আবার সেগুলো রিটুইট করেছেন।

বিকেল ৪.১৫

আজ নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করছে আলাপন’দা। স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যসচিব রাজীব সিন্‌হা নন। এটা ইন্টারেস্টিং। আলাপন’‌দা স্পষ্টভাষায়, কেটে কেটে বাছাই শব্দচয়নে কথা বলে। সেভাবেই বলছে, ‘রাজ্যে এখনও পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ৬৮। কাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯০৮। আজ ৯৪০ জন।’ যেটা আরও ইন্টারেস্টিং, আলাপন’দা বলছে, ‘সমস্ত তথ্য গতকাল রাতে সওয়া ১১টার মধ্যে ‘এগিয়ে বাংলা’ ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা যথাসম্ভব স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করছি। ইট্‌স আ ট্রুথফুল অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্ট শেয়ারিং অফ ডেটা উইথ দ্য পাবলিক অ্যাট লার্জ।’

এটা কি সংখ্যা নিয়ে শাসক–বিরোধী চাপানউতোরের ফল?‌ কাল রাতেই সিপিএম দাবি করেছিল, নবান্ন থেকে মুখ্যসচিব যে তথ্য দিচ্ছেন, তার সঙ্গে স্বাস্থ্যভবনের ওয়েবসাইটের তথ্যের নাকি বিস্তর ফারাক। তারপরেই আজ সাংবাদিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিবের আগমন। মুখ্যসচিব কি অন্য কাজে ব্যস্ত?‌ অসুস্থ?‌ নইলে তাঁর পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্রসচিব ব্রিফ করছেন?‌ শাসনযন্ত্রের অন্দরে কি ভারসাম্যের কোনও বদল ঘটছে নিঃশব্দে?‌

বিকেল ৫.‌০০

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর করোনা মোকাবিলায় গুজরাতে একাধিক ওষুধের প্রয়োগমূলক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমেদাবাদের চারটি হাসপাতালে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। যার পোশাকি নাম ‘সলিডারিটি ট্রায়াল ফর কোভিড–১৯’। হাসপাতালে ভর্তি করোনা আক্রান্ত রোগীর শরীরে ওই ওষুধগুলো প্রয়োগ করা হবে। বস্তুত, সারা পৃথিবীতেই নাকি এমন প্রায়োগিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

বিকেল ৫.‌৪৫

মোবাইলের স্ক্রিনে ‘সুভাষ ভৌমিক’ নামটা ভাসছে। ধরলাম। অননুকরণীয় ভাঙা গলা ভেসে এল। চুনী’দার সঙ্গে একটা ছবি দরকার। যদি আজকালের আর্কাইভে থাকে। একটা ইংরেজি ম্যাগাজিনে তাঁর লেখার সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য দিতে হবে। বললেন, ‘প্রদীপদার সঙ্গে আমার প্রচুর ছবি আছে। কিন্তু চুনীদার সঙ্গে কোনও ছবি পাচ্ছি না। একটু দেখবে প্লিজ?‌’

আলবাত দেখব!‌ কারণ, সুভাষ ভৌমিক হলেন সেই বিরল ক্রীড়াব্যক্তিত্ব যাঁর বুকের পাটা আছে। যা খুব বেশি স্পোর্টস সেলিব্রিটির দেখিনি।

১৯৯৪ সাল। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমায় ফুরনের খাটুনি খাটতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্পোর্টস ডেস্কে। প্রাথমিক অ্যাসাইনমেন্ট সুভাষ’দার ম্যাচ রিপোর্টের অনুলিখন। তখনও তাঁর সঙ্গে সামান্যতম আলাপও নেই। ভাবছি, লোকটা কেমন। কীভাবে ডিল করব। লেখার আগে একবার তো কথা বলা দরকার। সেটাই বা কবে বলব। এসবই রোজ ভাবতাম। কিন্তু কথা বলাটা আর হয়ে উঠত না।

বরাবরই সকাল সকাল অফিস পৌঁছে যাওয়া অভ্যেস। তেমনই একদিন গিয়ে স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে বসে কাগজপত্র পড়ছি। তখনও অন্যরা এসে পৌঁছয়নি। কিড়িং কিড়িং করে এক্সটেনশনটা বাজল।

— হ্যালো।

‘কে বলছেন?’‌

— আপনি কে বলছেন?‌ ফোনটা তো করেছেন আপনি। আগে তো আপনাকে নিজের পরিচয়টা দিতে হবে।

‘সুভাষ ভৌমিক!’‌

— অনিন্দ্য জানা। বলুন।

মুহূর্তে সহজ হয়ে গেলেন সুভাষ’দা, ‘আরে!‌ আমায় তো তোমার সঙ্গেই কাজ করতে হবে। আমি একদিন তোমাদের অফিসে যাব। তখন ডিটেইল্‌সে কথা বলে নেব।’

ঘটনাচক্রে, আমাদের জুড়ি সুপারহিট হয়ে গেল। টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করতেন সুভাষ’দা। নিজের পয়সায় বিদেশি কাগজ আর ম্যাগাজিন আনিয়ে নিজেকে আপডেটেড রাখতেন। ফোনে ম্যাচ রিপোর্ট বলার সময় সেগুলো ফাঁকে ফাঁকে জুড়ে দিতেন। তবে আমি কপিতে খুব বেশি টেকনিক্যাল কচকচি রাখতাম না। বরং চেষ্টা করতাম একটা সহজ চলন রাখার। সম্ভবত সেজন্য পড়তে ভাল লাগত। সুভাষ’দারও পছন্দ হতো। আমাদের টিউনিং হয়ে গেল। অসম্ভব দিলদরিয়া লোক ছিলেন। একদিন তো বাড়ি থেকে সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশমাছ রেঁধে পাঠিয়ে দিলেন ডিপার্টমেন্টের সকলের জন্য। আমার জন্য একটা বিদেশি টি–শার্ট পাঠালেন একদিন। নীতিগতভাবে পেশাগত ক্ষেত্রে কোনও উপহার নিই না। ওটা ফেরাইনি।

হইহই করে বিশ্বকাপ চলে গেল। সহজাত আলস্যে যোগাযোগটাও ক্ষীণ হয়ে গেল। কয়েকমাস পরে সুভাষ’দা ফোন করে নিউ আলিপুরের বাড়িতে গেট টুগেদারে ডাকলেন। সাধারণত কোথাও যাই না। ওটায় গেলাম। গিয়ে দেখি, ক্রীড়াজগতের প্রচুর লোক। ছাদে ম্যারাপ। বিশাল আয়োজন। গমগম করছে চারদিক। আমি তো নেহাতই নাদান। কাউকে খুব একটা চিনিও না। সরু হয়ে এদিক–ওদিক ঘুরঘুর করছি। আমন্ত্রিতরা সকলে আসার পর সুভাষ’দা নিচ থেকে গিয়ে মা’কে নিয়ে এলেন। তারপর গর্ভধারিনীকে জড়িয়ে ধরে অভ্যাগতদের বললেন, ‘সকলে শোনো। মা, তুমিও শোনো। তোমরা যে আনন্দবাজারে আমার বিশ্বকাপের লেখা পড়ে ধন্য ধন্য করেছো, তার সবগুলো ওই অনিন্দ্য জানা লিখেছে!‌’

হইচই থেমে গিয়ে চারদিক আচমকা নিঝুম হয়ে গেল। আমার তো ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা। এমব্যারাসমেন্টের চূড়ান্ত। সুভাষ’দা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন পালানোর ফাঁক খুঁজছি। সটান এসে খপাত করে ধরলেন। তারপর আমার ডানহাতটা উপরে তুলে ধরে বললেন, ‘এটা সোনার হাত। এই হাত না থাকলে লেখক সুভাষ ভৌমিককে কেউ চিনত না!‌’

ছাব্বিশ বছর কেটে গিয়েছে। ঘটনাটা ভুলতে পারিনি। তারপরেও বহু সেলিব্রিটির অনুলিখন করেছি। আমার সামনেই তাঁরা দিব্যি নিজেদের লেখার প্রশংসা গিলে নিয়েছেন। পাবলিকলি তো দূরস্থান, ব্যক্তিগত স্তরেও কখনও অ্যাকনলেজ করেননি। সুভাষ ভৌমিক কঠোর ব্যতিক্রম হয়ে রয়ে গিয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম।

সেই ব্যতিক্রমী উদারতার কাছে আর্কাইভ গরুখোঁজা করে চুনী গোস্বামী–সুভাষ ভৌমিকের ছবি বার করা আর এমন কী!‌ পাঠিয়ে দিলাম।

রাত ৮.‌১৩

৪২ বছর আইএএসের চাকরি করে অবসর–নেওয়া এবং প্রসার ভারতীর প্রাক্তন সিইও জহর সরকারের কয়েকদিন আগে করা একটা টুইট হঠাৎ ভেসে উঠল।

ভারতের আছে—
১টি হাসপাতালের বেড পিছু ১,৮২৬ জন রোগী
১ জন ডাক্তার পিছু ১১,৬০০ জন অসুস্থ
১টি আইসোলেশন বেড পিছু ৮৪,০০০ করোনা–সন্দেহভাজন

ভারত ব্যয় করেছে—
৬,০০০ কোটি বিজ্ঞাপনের জন্য
৯,১৩০ কোটি মূর্তি বসাতে
২,০২১ কোটি বিদেশযাত্রা বাবদে

ভারত যা গড়তে পারত—
১৭টি এইমস
৩৫টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ
৫০টি সরকারি হাসপাতাল

রাত ১০.‌২৫

এখনও জহর’দার টুইটটার কথা ভাবছি।

বিরতিহীন যাত্রাপথে ট্রেনটা ঘুরেই যাচ্ছে। গোল গোল। পথের শেষ নেই। প্রান্তিক স্টেশন নেই। ডিস্টার্বিং। এই সময়টার মতো। অন্তহীন।

3 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি

  1. আগের উত্তরটা কেন গুবলু(খুব পছন্দ হলো নামটা) হল জানি না। একটা ছবি
    পাঠিয়েছিলাম। ডালগোনা পায়রা।
    আপনার লেখায় ওই ডাউন টু আর্থ ব্যাপারটা টানে। বিষয়বস্তু, বা তার পরিবেশনা,
    রসবোধ এসব তো সন্দেহাতীত। কিন্তু এই যে ছোট ছোট তুচ্ছ ব্যাপারেও এত যত্ন…..
    সেটা ভারি ভাল লাগে। ঠিক আপাত সাধারণ কিন্তু ভীষণ মিষ্টি চড়ুই পাখির মত।
    (একটা ছবি পাঠাবার ইচ্ছে ছিল। এখানে কি attach করা যায়? তাহলে মাঝে মাঝে
    পাঠাতে পারি)

    নন্দিতা ভট্টাচার্য

    Like

    1. এই রে এখানে পাঠানো যায় কিনা তো আমিও জানি না। আপনি ফেসবুকে মেসেঞ্জারে পাঠাতে পারেন কিন্তু। আর ধন্যবাদ, চড়ুইপাখির উপমার জন্য।

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s