লকডাউন ডায়েরি – ৩০ এপ্রিল, ২০২০

৩০.‌০৪.‌২০২০। বৃহস্পতিবার

সকাল ১০.‌০০

সময় কখন আর কাটতেই চায় না?‌ যখন আমি এক্সারসাইজ করি। বাকি সময় বলি, ‘হাউ টাইম ফ্লাইজ!‌ চোখের পলক ফেলার আগে সময় চলে গেল।’ কিন্তু ইদানীং সকাল ৯টা থেকে ১০টা যে কী আস্তে আস্তে কাটে, তা আর কহতব্য নয়। কোঁকাতে কোঁকাতে বারবার বাঁ’হাতের কব্জিতে বাঁধা ফিটনেস ট্র্যাকার তথা ঘড়ির দিকে তাকাই। হতাশ হই। তারপর আবার পেঁচার মতো মুখ করে যোগা ম্যাটের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ি।

সকাল ১০.‌০৫

আজ ঋষি কাপুর!‌

কাল গভীর রাতে শেষবার টুইটার চেক করার সময় দেখেছিলাম, কাল সকালে ৬৭ বছরের ঋষিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। নীতু সিং সঙ্গে আছেন। দাদা রণধীর কাপুর রাতেই বলেছেন, ‘ও ভাল নেই। হি ইজ নট ওয়েল অ্যাট অল।’ কিন্তু আজ সকালেই যে সদাহাস্যময়, দিলখোলা এবং একদা চকোলেট বয় ধরাধাম ছেড়ে যাবেন, কে জানত! ‌ইরফান খানের মৃত্যুর ২৪ ঘন্টার মধ্যে ঋষি কাপুরের মৃত্যু। একই ব্যাধিতে। টু মাচ অফ আ কো ইনসিডেন্স হতো না ভাবার পক্ষে?‌ কিন্তু দেখছি সেটাই হল। ২০২০ সালটা এক আশ্চর্য বছর!‌

সকাল ৯টা ৩২ মিনিটে অমিতাভ বচ্চন টুইট করেছেন, ‘হি ইজ গন..! ‌ঋষি কাপুর..‌গন‌..‌জাস্ট পাস্‌ড অ্যাওয়ে..‌ আই অ্যাম ডেস্ট্রয়েড’। সম্ভবত সেখান থেকেই খবরটা ছড়িয়েছে। কিন্তু ‘ডেস্ট্রয়েড‌’?‌ ধ্বংস? কেন?‌ উনি কি আসলে ‘ডেভাস্টেটেড’ বলতে চেয়েছেন?‌ ‘বিধ্বস্ত’?‌ হতে পারে। না–ও পারে। কিন্তু এখন কি আর এসব নিয়ে ভাবাভাবির সময়?‌ টুইট এবং শ্রদ্ধার্ঘ্যের ঢল নেমেছে। ফেসবুক ইতিমধ্যেই ফ্লাডেড। অনেকে ইরফান আর ঋষির একসঙ্গে ছবি দিয়ে পোস্ট করছেন। অদ্ভুত সমাপতনই বটে!‌

এই লোকটা আমার যৌবনের অনেকগুলো দিন সঙ্গে নিয়ে চলে গেল। অভিনেতা হিসেবে নয়, ঋষি কাপুরকে মনে রাখব এক হস্টেল–ফেরত এবং হিন্দি ছবি সম্পর্কে নাদান নাবালকের বলিউড সম্পর্কে সাবালক হয়ে ওঠার সিঁড়ি হিসেবে।

বেলা ১১.‌০৫

স্নান করে নিলাম। আজ একটু তাড়াতাড়িই অফিসে পৌঁছব ভাবছি। তার আগে মাছ ভাজতে হবে। আলুও সেদ্ধ করতে হবে।

কাল রাতে ফিরে একটা এক্সপেরিমেন্ট করেছিলাম। চিকেন ভাজা। ভেবেছিলাম, সাকসেসফুল হলে মা–বাবা’কে খাওয়াব। অনেকদিন হয়ে গেল। এবার ওদেরও একটু স্বাদবদল দরকার। খারাপ হয়নি। পেঁয়াজ সাঁতলে নিয়ে তার মধ্যে ফেলে হাল্কা ফ্রাই করে। তার আগে খানিকটা সময় তেল, মরিচ আর নুন দিয়ে ম্যারিনেট করেছিলাম। আরও অনেক বেশি করা উচিত ছিল। আদা, রসুন আর লেবু থাকলেও ভাল হতো। কিন্তু এখন আর ওসব হুট বলতেই পাব কোথায়?‌ আর গিনিপিগ তো আমি। এক্সপেরিমেন্ট ব্যর্থ হলে তার দায় আমার উপর দিয়েই যাবে। দেখলাম, খেতে মন্দ হয়নি। বাবা–মা’কে দেওয়া যেতে পারে। কারণ, পরেরবার আরও বেটার করব বলে বিশ্বাস রাখি।

আস্তে আস্তে সল্টলেকে ফুল সেট আপ চালু করে দিতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে কি আবার এখানেই আস্তানা গাড়তে হবে?‌ নাকি বর্তমানটাকে টেনে আরও অনেক, অনেক লম্বা করতে হবে?‌

বেলা ১১.‌৩৬

ব্যাডমিন্টনের গ্রুপে রাজু একটা মেসেজ ফরওয়ার্ড করেছে। চিন নাকি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আর মার্কিন ডলার নয়। এবার থেকে চিনের স্টক মার্কেট নিয়ন্ত্রিত হবে এবং সেখানে আদানপ্রদান হবে চিনের মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে। এটা বিশ্বের অর্থনীতিতে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। এর অর্থ, চিনের বাণিজ্যিক লেনদেনে মার্কিন ডলার অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়বে। চিনের ইউয়ানের প্রেক্ষিতে ডলারের দাম পড়বে। যা সামগ্রিকভাবে গোটা বিশ্বের অর্থনীতিতে বিশাল প্রভাব ফেলবে। বিশ্বের বাজার চিনের এই সিদ্ধান্তে হতচকিত। সকলে বলছে, এটা এমন এক অর্থনৈতিক যুদ্ধ, যাতে গোটা দুনিয়ার বাজার জড়িয়ে পড়বে।

সত্যিই। এমন একটা ঘটনা যে চুপিচুপি ঘটে গিয়েছে, জানতামই না! ‌

বেলা ১১.‌৪৯

মৃত্যুসংবাদ বলতে গেলে কোনও কোনও নিউজ অ্যাঙ্কর এমন ছলোছলো চোখ এবং ধরা ধরা গলায় কথা বলতে থাকেন, মনে হয় তাঁদেরই আত্মীয়বিয়োগ হয়েছে। টিভি–তে ঋষি কাপুরের মৃত্যুসংবাদ সম্প্রচার দেখতে দেখতে ‘ইজাজত’–এ নাসিরুদ্দিন শাহের চরিত্রের কথা মনে পড়ছিল। দূরদর্শনে খবর পড়ার চাকরি করতে গিয়ে নৌকাডুবির খবরে আবেগ ঢেলে ইনভল্‌ভমেন্ট আনতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে খবর পড়েছিলেন। সেদিনই বা পরদিন চাকরি নট হয়ে যায়।

এখানে তেমনকিছু হবে না। এমনিতে আমি অডিও ভিস্যুয়াল খুব একটা বুঝি না। মনে হয়, ট্রেনিংটাই এইরকম দেওয়া হয়। অবশ্য বাংলা নিউজ চ্যানেলের ইতিহাসে তো এমন দৃষ্টান্তও আছে, যেখানে অ্যাঙ্কর ঘোষণা করছেন, ‘এতক্ষণ যে খবরের জন্য আপনারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন, সেই খবর এসে পৌঁছেছে। সুভাষ চক্রবর্তী মারা গিয়েছেন।’

দুপুর ১২.‌৩৫

ঋষি কাপুরের পরিবারের তরফে প্রচারিত বার্তাটা হাতে এল—

‘টানা দু–বছর লিউকেমিয়ার সঙ্গে লড়াই করার পর আমাদের প্রিয় ঋষি কাপুর আজ সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে শান্তিতে চলে গিয়েছেন। হাসপাতালের চিকিৎসক এবং অন্য কর্মীরা জানিয়েছেন, শেষমুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের এন্টারটেইন করেছেন উনি।

‘গতবছর দুই মহাদেশে তাঁর চিকিৎসা চলাকালীনও তিনি হাসিমুখে থেকেছেন। পরিবার, বন্ধুবান্ধব, খাবার আর ফিল্মেই ছিল তাঁর ফোকাস। যাঁদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে, তাঁরাই বলেছেন, কীভাবে উনি কখনও অসুস্থতাকে মাথায় চড়ে বসতে দেননি।

‘উনি কৃতজ্ঞ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে থাকা তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছে। তাঁরাও নিশ্চয়ই জানেন, উনি সবসময় চেয়েছেন চোখের জলে নয়, হইহুল্লোড়ের মধ্য দিয়েই তাঁকে মনে রাখা হোক।

‘এই ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তেও আমরা মনে রেখেছি যে, সারা দুনিয়া এক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে চলছে। নিষেধাজ্ঞা আছে লোকচলাচল এবং লোকসমাগমের উপর। ওঁর ভক্ত, হিতৈষী এবং পারিবারিক বন্ধুদের কাছে অনুরোধ, আইন মেনে চলুন। ঋষি নিজেও এটাই চাইতেন।

পড়তে পড়তে মনে হল, এই হল ক্লাস। কাপুর খানদানের ক্লাস।

দুপুর ২.‌২০

আজ মাছভাজাটা ঠিকঠাক হয়েছিল। আগেরদিনের চেয়ে বেটার। নিজেই বুঝলাম। আজ অফিসে খুব চাপ আছে। কাল অবশ্য ছুটি। মে দিবস। পৃথিবীর বেশিরভাগ চাকরের ছুটির দিন। গৌরবার্থে যাদের ‘শ্রমিক’ বলা হয়। বিশেষত, প্রিন্ট সাংবাদিক ও সংবাদকর্মীরা। সুব্রত’দা বলত, ‘তোমরা তো বিড়িশ্রমিকেরও অধম!‌’ ঠিকই বলত।

টিভি বলছে, মার্কিন একটা সংস্থা নাকি করোনাভাইরাসের বংশবৃদ্ধি রুখে দেওয়ার দাওয়াই বার করেছে। এবার তো ট্রাম্পের কাছ থেকে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইনের বদলে ওটা চাইতে হবে।

করোনা–পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে রঘুরাম রাজনের সঙ্গে আজ আলোচনা করেছেন রাহুল গান্ধী।

রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় আবার একটা রাজ্য প্রশাসনের হাড়–জ্বালানো টুইট করেছেন।

বিকেল ৪.‌১০

ঋষির কন্যা রিদ্ধিমাকে দিল্লি থেকে মুম্বই যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যাতে বাবার শেষকৃত্যে থাকতে পারেন। নিশ্চয়ই তাঁকে কার্গো ফ্লাইটে যেতে হবে। তাছাড়া আর উপায়ই বা কী?‌ ঋষির দেহ হাসপাতাল থেকে সোজা চন্দনবাড়ি শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। শ্মশানে নীতু আর রণবীরের সঙ্গেই আছেন আলিয়া, অভিষেক, সইফ, করিনারা। পরিবারের মোট ১৫ জনকে শেষকৃত্যে উপস্থিত থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালে তোলা ঋষির একটা ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। বেডে শোওয়া প্রবীণ অভিনেতাকে মোবাইলের ফ্রেমে রেখে এক চিকিৎসক গান গাইছেন। বলতে নেই, চমৎকার গাইছেন। গানের পর তরুণ চিকিৎসকের মাথায় হাত রেখে ঋষি বলছেন, ‘ভাল করে মেহনত করো। পরিশ্রম করলেই সাফল্য আসে। আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সঙ্গে আছে। থাকবে। যব হাম নহি রহেঙ্গে তো থোড়াসা মিস্‌ করনা মুঝে।’

শেষটা দেখে অদ্ভুত লাগল। লোকটা দিব্যি ঠিকঠাক ছিল। আজ স্রেফ নেই হয়ে গেল।

বিকেল ৫.‌৩০

রাজ্যে করোনায় মৃত বেড়ে হল ৩৩। এখন আক্রান্তের সংখ্যা ৫৭২ জন। নতুন করে ৩৭ জনের শরীরে সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। নবান্নে জানালেন মুখ্যসচিব।

কেন্দ্রীয় সরকার পেট্রাপোলে সীমান্ত বাণিজ্যের দরজা খুলে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ পশ্চিমবঙ্গ সরকার।

সন্ধ্যা ৬.‌০০

চুনী গোস্বামী প্রয়াত!‌ এসব কী শুরু হয়েছে! ‌অন আ সেকেন্ড থট, আজকের মতো চ্যালেঞ্জিং দিন খবরের কাগজে বিশেষ আসে না। ঘটনাচক্রে, আজ আমাকেই কাগজ তৈরি করতে হবে। দেখা যাক, সমস্ত দিক সামলে সময়ে পেজ রিলিজ করতে পারি কিনা। কিন্তু আজ বোধহয় নিয়মিত ব্যবধানে ডায়েরিতে আর এন্ট্রি করা হবে না। কখন যে এসে আবার লিখতে বসতে পারব, নিজেই জানি না।

সন্ধ্যা ৬.‌৪৬

পুরোন পাড়ার অনুজ খোকন ফেসবুকের ওয়ালে লিখেছে, ‘এবার তোমায় আজ চুনী গোস্বামীকে নিয়ে লকডাউন ডায়েরিতে লিখতে হবে।’

জবাব দিলাম, ‘হ্যাঁ। এবার ভাবছি ডোম হয়ে যাব।’

সন্ধ্যা ৭.‌৩৬

এইমাত্র দেবাশিস এসে মোবাইল দেখাল। স্ক্রিনে লেখা মিঠুন চক্রবর্তী আর নাসিরুদ্দিন শাহ নাকি গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি!‌ এবার কিন্তু ‘যব উই মেট’–এর গীতের মতো হাতজোড় করে বলতে ইচ্ছে করছে, ‘ইস রাত কো বোরিং বনা দো। অওর এক্সাইটমেন্ট নহি চাহিয়ে!‌’

রাত ১০.‌২২

অবশেষে সবদিক সামলে–সুমলে ঠিক সময়েই কাগজ ছেড়েছি। আরও অনেক ভাল করা যেত নিশ্চয়ই। ভালর কি আর শেষ আছে!‌ কিন্তু তার জন্য আরও বেশি সময় দরকার। এইসব সময়ে কিন্তু টাইম জাস্ট ফ্লাইজ। আবার জানি, কাল সকালে এক্সারসাইজ করার সময়টা কাটতেই চাইবে না। এনিওয়ে।

কাগজ ছাড়ার পর বেশ খানিকক্ষণ ঝুম হয়ে বসেছিলাম। ঝড়ের মতো গেল দিনটা। ঋষি কাপুরের মৃত্যু সকালে একটা ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু চুনী’দার মৃত্যুটা কাজের সাপেক্ষে একটা বড় ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। বয়স হয়েছিল ৮২। যোধপুর পার্কের বাড়ির কাছেই এক নার্সিংহোমে ভর্তি করানো হয়েছিল। বিকেলে সব শেষ। প্রথম ফেসবুক মেসেঞ্জারে শান্তনু প্রশ্ন করল, ‘চুনী গোস্বামী?‌’ বললাম, খোঁজ নিচ্ছি। দ্রুত জানতে পারলাম, ঠিক। ওকে জানালাম। তারপর অশোক’দাকে একটা ফোন করে দৌড়োলাম কাগজের লে–আউট বদলাতে।

সেই দৌড় অবিশ্রান্ত চলল পরের সাড়ে ৩ ঘন্টা। একদিকে ঋষি কাপুর, অন্যদিকে চুনী’দাকে নিয়ে লেখা যোগাড় করা, ছবি বাছাই, পেজ লে–আউট বানানো। ভাগ্যিস অনির্বাণ আর অভীক ছিল। ওরাই স্পোর্টসের পাতার দায়িত্ব নিল। আমাকে আর তেমন তাকাতে হয়নি এদিকে। দিনের শেষে সবমিলিয়ে একটা খাড়া করা গিয়েছে। যদিও নাসির আর মিঠুনের খবরটা কনফার্মই করা গেল না। হয়তো মিস্‌ই করলাম।

সবকিছু থিতিয়ে যাওয়ার পর বসে বসে দিনটা রিওয়াইন্ড করছিলাম। আসলে ঋষি কাপুর আর চুনী গোস্বামীর কেরিয়ার ফিরে দেখার চেষ্টা করছিলাম। ঋষিকে জীবনে কোনওদিন কাছ থেকে দেখিনি। কিন্তু চুনী’দার সঙ্গে তো আলাপ ছিল। ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও টুকটাক কথাবার্তা তো হয়েছে। ঋষিকে মূলত চেনা তাঁর অটোবায়োগ্রাফি ‘খুল্লমখুল্লা’ পড়ে। অনুলিখন করেছিলেন সাংবাদিক মীনা আইয়ার। প্রচ্ছদে তাঁর নামও ছিল। অন্য অনেক সেলিব্রিটি আত্মজীবনীর চেয়ে বেশি সৎ, সোজাসাপ্টা এবং খোলামেলা। নার্গিসের সঙ্গে বাবা রাজ কাপুরের সম্পর্ক ও রোমান্স, ‘ববি’র সাফল্যের পর তাঁর নিজের জীবনের উন্মার্গগামিতা, হুইস্কির প্রতি আসক্তি, নীতু সিংয়ের সঙ্গে প্রেম তো বটেই। খোলাখুলি লিখেছিলেন, ‘ফিল্মফেয়ার পুরস্কার’ ২০ অথবা ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলেন। নাকি, কেনার অফার ছিল। কিন্তু কেনেননি?‌ এখন ঠিক মনে পড়ছে না। তবে নিজের প্রথম হিরোইন ডিম্পলের প্রতি যে একটু ‘ইয়ে’ ছিল, তা গোপন করেননি।

অভিনেতা হিসেবে ঋষিকে যতটা মনে থাকবে, তার চেয়ে তাঁর সঙ্গে অনেক বেশি অ্যাসোসিয়েশন তাঁর লিপে কালজয়ী সব গানের জন্য। মনে আছে, ‘জীবন কে দিন ছোটে সহি হাম ভি বড়ে দিলওয়ালে’ গানটার জন্য হাতিবাগানে গিয়ে পরপর পাঁচদিন ‘বড়ে দিলওয়ালা’ দেখেছিলাম। আর ‘সাগর’ যে কতবার দেখেছি, নিজেই ভুলে গিয়েছি। সামান্য পৃথুল শরীর, রংবেরংয়ের সোয়েটারে ঢাকা ভুঁড়ি নিয়ে ঋষি যেভাবে সেলুলয়েডে দীর্ঘদিন রোমান্স চালিয়ে গিয়েছেন, তা ঈর্ষণীয় তো বটেই। কেরিয়ারের শেষদিকে তিনি কিছু ছবিতে আশ্চর্য এক্সপেরিমেন্টাল চরিত্র করেছিলেন। কিন্তু তার মধ্যে আমার তাঁকে মনে থাকবে জোয়া আখতারের ‘লাক বাই চান্স’ ছবির প্রোডিউসারের ভূমিকার জন্য। দেখে মনে হয়েছিল, সুভাষ ঘাইয়ের নিখুঁত নকল করেছেন। ওই একটা ছবি ঋষির জন্য বারবার দেখতে পারি।

ঋষির কাছে আরও একটা ব্যাপারে ঋণ থাকবে। তিনি এবং নীতু মিলে রণবীর নামের এক অত্যাশ্চর্য অভিনেতার জন্ম দিয়েছেন। ভারতীয় ছবিতে বহু, বহুদিন এমন প্রতিভাশীল এবং ন্যাচেরাল অভিনেতা আসেনি। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, রণবীর কাপুর অ্যান্ড আলিয়া ভাট আর দ্য বেস্ট থিংস টু হ্যাভ হ্যাপেন্ড টু ইন্ডিয়ান সিনেমা। এটা একেবারেই কাকতালীয় যে, তারা এখন প্রেম করে। বিয়েও নাকি হব–হব। জিন যদি ঠিকঠাক কথা বলে, তাদের সন্তান–সন্ততিরা বাবা–মা’কে ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এবং এলেম রাখবে।

জিন্‌সের ট্রাউজার্স এবং জিন্‌সেরই ফুলস্লিভ শার্ট পরিহিত রণবীর মুখে মাস্ক, হাতে সার্জিক্যাল গ্লাভস পরে বাবার শেষকৃত্য করছেন, এমন একটা ভিডিও ঘুরেফিরে আসছে। মনে পড়ছিল, ঋষি আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, রণবীরের সঙ্গে তাঁর বরাবর একটা দূরত্ব তিনি নিজেই বজায় রেখেছেন। যেমন তাঁর বাবার সঙ্গেও তাঁর একটা দূরত্ব ছিল আজীবন। লিখেছিলেন, তাঁদের পরিবারে ওটাই রীতি। বাবা ছেলের সঙ্গে বসে হ্যা–হ্যা করবে, ঠাট্টামস্করা করবে, বান্ধবী নিয়ে গল্প করবে, এটা তাঁদের পছন্দ নয়। একটা সম্ভ্রমাত্মক দূরত্ব থাকলে তবেই সেটা সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করে। আশ্চর্য নয় যে, রণবীর একেবারেই ‘মাম্মাজ বয়’।

আজ যখন পুরোহিতদের সমবেত সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যে গঙ্গাজলের মাটির কলসি ঘাড়ে নিয়ে বাঁশের চ্যাঙাড়ির উপরে শোওয়ানো বাবার দেহ প্রদক্ষিণ করছিলেন রণবীর, তখন কি তাঁর মনে হচ্ছিল, কেন আমুদে এবং রাশভারী বাবার আরেকটু কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলেন না?‌ একটাই তো জীবন। আর ঋষি কাপুরও তো একটাই।

চুনী’দার সঙ্গে শেষ দেখা কবে ভুলে গিয়েছি। সম্ভবত আনন্দবাজারে থাকতে। ওয়ার্ল্ড কাপ বা ওই ধরনের বড় ইভেন্টের সময় মাঝেমধ্যে স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে ফুরনের খাটুনি খাটতে যেতে হতো। তখনই অতিথি লেখক চুনী’দার সঙ্গে আলাপ। তার আগে আমি তাঁকে চিনতাম ‘আনন্দমেলা’য় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত তাঁর আত্মকথা ‘খেলতে খেলতে’ পড়ে। যার অনুলেখক ছিলেন আনন্দবাজারের তৎকালীন ক্রীড়া সম্পাদক মুকুল দত্ত। যে মুকুলবাবুর পুত্র, ধীমান দত্তর সঙ্গে এই সেদিন পর্যন্ত আজকালের ক্রীড়া দপ্তরে কাজ করেছি। জীবনের কী বিচিত্র গতি!‌

যতবার দেখা বা কথা হয়েছে, মনে হয়েছে, চুনী’দা একটা আলাদা আলোকবৃত্তের মধ্যে বিচরণ করেন। তিনি যেখানেই যান, অন্তরীক্ষ থেকে সেই আর্কল্যাম্পের আলোটা তাঁর উপর পড়ে। পড়েই থাকে। তাঁকে ছেড়ে যায় না কখনও। কোনওদিন কোনও শ্যাবি পোশাক পরতে দেখিনি। সবসময় নিজের সম্পর্কে সচেতন। দারণ সেন্স অফ হিউমার ছিল। প্রচুর গল্প বলতেন। একটা শিক্ষা দিয়েছিলেন। এখনও ভুলিনি— পার্টিতে যাবে সকলের পরে আর বেরিয়ে আসবে সকলের আগে।

প্রচুর গল্প শুনতাম চুনী’দাকে নিয়েও। অসামান্য সব অ্যানেকডোট্‌স। একটা বলেছিলেন অভীকবাবু। সাউথ ক্লাবে চুনী’দার বিরুদ্ধে তিনি যখন টেনিস খেলতে নামতেন, প্রথমদিকটা চুনী’দা একটু লুজ দিতেন। অভীকবাবু মনে করতেন, দারুণ খেলছেন। ক্রিকেট–ফুটবল বাদ দিলেও টেনিসটা চুনী’দা খুব খারাপ খেলতেন না। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে কয়েকটা গেম বা একটা সেট জিতলে অভীকবাবুর মধ্যে একটা অহং তৈরি হতো বৈকি। কিন্তু অভীকবাবু কোনওদিন ম্যাচ জিততে পারেননি। চুনী’দা যেই দেখতেন, ম্যাচ হারার সামান্যতম সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তখনই নিজের খেলা খেলতে শুরু করতেন।

জনশ্রুতি:‌ চুনী’দাকে একবার বলা হয়েছিল, অভীকবাবুর কাছে অন্তত একটা ম্যাচ না হারলে আনন্দবাজারের সঙ্গে তাঁর অতিথি লেখকের যে বার্ষিক চুক্তি আছে, তা রিনিউ করা হবে না। চুনী’দা নাকি রাজিও হয়ে গিয়েছিলেন দোনামোনা করে। কিন্তু তিন সেটের ম্যাচে প্রথম সেটটা ছেড়ে দিয়ে দ্বিতীয় সেট এবং ম্যাচ যখন প্রায় হারতে বসেছেন, তখনই ঘুরে দাঁড়ান। দ্বিতীয় এবং তৃতীয় সেট জিতে যখন তৃপ্ত হয়ে বেরোচ্ছেন, চুনী’দাকে বলা হয়েছিল, এবার কিন্তু কন্ট্র্যাক্টটা গেল!‌ আর রিনিউ হবে না। চুনী’দা থমকে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘না হলে না হবে। কোর্টে নেমে কাউকে ম্যাচ ছাড়তে পারব না!‌’

এই কাহিনি যিনি বলেছিলেন, তিনিই চুনী’দার কাছে সেই ম্যাচটা হেরেছিলেন। অভীকবাবু গল্পটা বলে স্বগতোক্তি করেছিলেন, ‘এই হল জাত প্লেয়ারের স্পিরিট। ওই ইগোটা না থাকলে অতদূর যাওয়া যায় না।’

আজ মনে হচ্ছিল, সেই চুনী’দাকে এমন একটা সময়ে যেতে হল, যখন তাঁকে শেষ বিদায় জানানোর পরিস্থিতিটাও রইল না। যিনি চাইতেন, তাঁর চারদিকে গুণমুগ্ধেরা ভিড় করে থাকুক, অতিমারী সম্পৃক্ত সময়ে তাঁকে বিদায় নিতে হল কার্যত লোকচক্ষুর অন্তরালে।

আরও একবার মনে হল, লাইফ ইজ আ গ্রেট লেভেলার। জীবন যতটুকু দেয়, ফিরিয়েও নেয় সুদে–আসলে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s