লকডাউন ডায়েরি – ২২ এপ্রিল, ২০২০

২২.‌০৪.‌২০২০। বুধবার

সকাল ৬.‌৩০

ঘুম থেকে উঠেই টুইটারটা দেখা দীর্ঘকালীন অভ্যাস। আজও দেখছিলাম। এক ডাক্তারের টুইটে নজর গেল। কেউ একজন টুইট করেছিলেন, চিকিৎসক আর স্বাস্থ্যকর্মীদের পুরস্কৃত করা উচিত। তার জবাবে রোশন আর নামের ওই চিকিৎসক লিখেছেন, ‘নো নিড ফর অ্যাওয়ার্ডস। জাস্ট ডোন্ট অ্যাসল্ট অ্যান্ড কিল মি হোয়েন আ পেশেন্ট ডাইজ। অ্যান্ড ইফ ইউ ডু কিল মি, ডোন্ট টেক আ ভিডিও। আই হ্যাভ এইলিং পেরেন্টস, হু কুড নট বেয়ার হ্যাভিং ইট প্লেইড অন লুপ ইন দ্য নিউজ। ডে ডোন্ট ডিজার্ভ ইট’।

পুরস্কারের দরকার নেই। শুধু কোনো রোগী মারা গেলে আমায় পেটাবেন না বা প্রাণে মেরে ফেলবেন না। যদি মেরেও ফেলেন, ভিডিও তুলবেন না। আমার বাবা–মা অসুস্থ। সারাদিন ধরে নিউজ চ্যানেলে ওই ভিডিও ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চালানো হলে ওঁরা সেটা নিতে পারবেন না। সেটা ওঁদের প্রাপ্যও নয়।

তখনও চেন্নাইয়ের চিকিৎসক প্রদীপ কুমারের ঘটনাটা মাথা থেকে যায়নি। রোশনের টুইটটা পড়তে পড়তে মনে হল কেউ এসে সপাটে গালে একটা চড় মেরে গেল। ভোম্বল হয়ে বিছানায় অনেকক্ষণ বসে রইলাম।

সকাল ৭.‌৫১

গিটার বাজিয়ে গান গেয়েছেন চিকিৎসক অনির্বাণ দত্ত। সেই গানে সরাসরি মোকাবিলা করেছেন নচিকেতার ‘ও ডাক্তার’ গানটির। অনির্বাণের গানের মোদ্দা কথা হল, চিকিৎসকদের ভিলেন বানাবেন না। আর যাঁরা চিকিৎসকদের খলনায়ক বানান, তাঁরা বরং এই সঙ্কটসময়ে রাস্তায় নামুন। সুগায়ক চিকিৎসক গেয়েছেন, এমবিবিএস বা এফআরসিএস ডিগ্রিটা বাতেলা করে পাওয়া যায় না। রাত জেগে পড়াশোনা করে স্বীকৃতি পেতে হয়। বুদ্ধি বিক্রি করলে সেটা হয় না। প্লাস নচিকেতাকে সটান বলেছেন, ‘একদিন আপনিই বুকে আগুন জ্বালিয়েছিলেন। এবার সরাসরি পথে নেমে আসুন। পথেই বিচার হবে গানটার।’

শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, এটা একদিন না একদিন হওয়ারই ছিল। এতদিন ধরে চিকিৎসকদের একাংশের ব্যবসায়ী মনোভাবের জন্য যে সমবেত ক্রোধ তাঁদের উপর তৈরি হচ্ছিল, সেটা এবার উল্টোমুখে বইতে শুরু করেছে। এবার সৎ, ডেডিকেটেড এবং কর্মঠ চিকিৎসকরা ঘুরে দাঁড়িয়ে সমাজের কাছে কৈফিয়ত দাবি করবেন।

সকাল ৯.‌০৫

জে টি লুইস বলে কোনও এক পশ্চাৎপক্ক টুইট করেছে, ‘আনপপুলার টেক:‌ ডিডন্ট নার্সেস অ্যান্ড ডক্টর্‌স সাইন আপ ফর দিস?‌ আই হ্যাভ রেসপেক্ট ফর দ্য গ্রেট জব দে আর ডুইং। বাট দিস ইজ এগজ্যাক্টলি হোয়াট দে আর সাইন্‌ড আপ ফর’।

যার জবাবে পেশায় সার্জন জেমি কোলম্যান সরাসরি থিওডোর রুজভেল্টকে কোট করে লিখেছেন, ‘দ্য ক্রেডিট বিলংস টু দ্য ম্যান হু ইজ অ্যাকচুয়্যালি ইন দ্য এরিনা, হুজ ফেস ইজ মার্‌ড বাই ডাস্ট অ্যান্ড সোয়েট অ্যান্ড ব্লাড। জে টি লুইস, ইওর ফেস ইজ নট মার্‌ড বাই ডাস্ট, সোয়েট অর অ্যান এন–৯৫। দিস ইজ নট ইয়োর এরিনা’।

ঠিক বলেছেন জেমি। স্যালুট!‌

সকাল ৯.‌৩০

কাল রাত থেকে বাবুল সুপ্রিয়র টুইট করা একটা ভিডিও নিয়ে বেজায় তরজা শুরু হয়েছে। ওটা কয়েকদিন আগে পেয়েছিলাম। এক কোভিড–১৯ সন্দেহভাজন এম আর বাঙ্গুর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের মধ্যে ঘুরে ঘুরে ভিডিওটি তুলেছেন। যাতে দেখানো হয়েছে, ডেডবডি পড়ে আছে। বিভিন্ন বেডের মধ্যে নিয়মমাফিক দূরত্ব নেই ইত্যাদি। বাবুল ওই ভিডিও টুইট করে চ্যালেঞ্জ করেছেন, এটা মিথ্যে হয়ে থাকলে বলুক পশ্চিমবঙ্গ সরকার!‌ তারপরেই ধুন্ধুমার।

সকাল ৯.‌৪৮

কাল বেশি রাতে খবরটা পেয়েছিলাম। আজ দেখলাম, রাতেই একটা নিউজ পোর্টাল খবরটা করেছে। এখন থেকে কোনও করোনা হাসপাতালের ভিতরে মোবাইল ফোন নিয়ে ঢোকা যাবে না বলে নির্দেশ জারি করেছে নবান্ন। পুলিশ, প্রশাসন, ডাক্তার, নার্স, কর্মী, রোগী, তাদের পরিজন— কেউ না। কারণ, করোনাভাইরাস নাকি মোবাইল ফোনে বাহিত হয়ে সংক্রমণ ছড়াতে পারে। রোগী বা অন্যদের হাসপাতালে ঢোকার আগে বাইরে মোবাইল জমা দিয়ে রসিদ নিতে হবে। বেরোনর পর রসিদ দিলে ফোন ফেরত পাওয়া যাবে। হাসপাতালের প্রশাসন চালানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালগুলিতে ইন্টারকম বসানো হবে। রোগীদের জন্য এসটিডি সংযোগ–সহ ল্যান্ডলাইনও বসানো হবে।

সকাল ৯.‌৫৪

প্রযুক্তিক্ষেত্রে জিও–তে বিনিয়োগ করল ফেসবুক। বিনিয়োগের পরিমাণ ৪৩,৫৭৪ কোটি টাকা!‌ এ এক এতবড় সংখ্যা যে ১ থেকে গুনতে শুরু করলে শেষ করতে করতে সারা জীবন কেটে যাবে। মুকেশ আম্বানি–মার্ক জুকেরবার্গের এই বিবাহ নাকি ভারতের করোনা–উত্তর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করবে।

সকাল ১০.‌৪৫

রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে, কেন্দ্রীয় দলের সঙ্গে সমস্ত রকমের সহযোগিতা করা হচ্ছে। মুখ্যসচিব নিজে প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁরা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনেও গিয়েছেন। কেন্দ্রীয় সরকারও রাজ্য সরকারকে স্বাগত জানিয়েছে।

অর্থাৎ, ঝামেলাটা এখনকার মতো ধামাচাপা পড়তে চলেছে। বোধহয় পরে আবার চাগিয়ে ওঠার জন্য।

বেলা ১১.‌১৯

কালই অশোক’দাকে বলছিলাম, এখন যে লড়াইটা চলছে, সেটারই কোনও শেষ দেখা যাচ্ছে না। অথচ এই লড়াইটা শেষ হওয়ামাত্র আরেকটা লড়াই শুরু হবে— পুনর্নির্মাণের লড়াই। অর্থনীতির পুনর্নির্মাণ। জীবনের পুনর্নির্মাণ। বিশ্বাসের পুনর্নির্মাণ। মানসিকতার পুনর্নির্মাণ। সেই যুদ্ধটা আরও অনেক, অনেক বড় যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধটা বোধহয় সারাজীবন চলবে। আজীবন। অথবা আমৃত্যু।

সম্ভবত সেজন্যই চারদিকে তাকিয়ে এত হতাশ লাগছে। সাধারণত বলা হয়, দেয়ার ইজ অলওয়েজ লাইট অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য টানেল। কিন্তু এসব সময়ে মনে হয়, দ্য লাইট অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য টানেল ইজ অফ আ কামিং ট্রেন!‌

দুপুর ১২.‌১১

কাল রাতে গার্গল করার পর ইডিয়টের মতো একটা কাচের গ্লাস ভেঙেছি। আজ গার্গল করতে গিয়ে সেটা মনে পড়ল। জনশ্রুতি:‌ কাচের কিছু ভাঙাটা নাকি অশুভ সঙ্কেত করে। করে হয়ত। করলে করুক!‌ নাকি সেটা বলা হয়, হাত থেকে পড়ে আয়না ভেঙে গেলে?‌ কে জানে?‌ তাছাড়া আর কী অশুভ হবে এরপর?‌ হলে হোক!‌

দুপুর ১.‌১৫

চেতলায় গিয়েছিলাম। অনেকদিন পর। লবঙ্গর সঙ্গে দেখা হল। ছবিও তোলা হল। ওর সঙ্গে আমার প্রথম ছবি। ঠিক যেভাবে আমি বাড়িতে ঢুকলেই ও লাফিয়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে। ইদানীং অনেকদিন পরপর দেখা হয় বলে ওর বাঁধনটা আরও ঘন লাগে কি?‌ নাকি এটা আমারই বিভ্রম?‌ একটা ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছি। লবঙ্গ সুপারহিট!‌ দেখে খুব ভাল লাগছে। খু–উ–ব। মনে হচ্ছে, ইয়েস!‌ এভাবেও বেঁচে থাকা যায়।

অবশেষে আজ স্পিড লিমিট ভাঙার ফাইনটা দিতে পারলাম। একটা ব্যাপারে অন্তত শান্তি পাওয়া গেল। পাওনা টাকা না দিতে পারা পর্যন্ত বড্ড খচখচ করে।

দুপুর ৩.‌২০

স্বাস্থ্যকর্মীদের উপর হামলা জামিন–অযোগ্য অপরাধ হিসেবে নথিভুক্ত হল। অপরাধ প্রমাণে ৬ মাস থেকে ৭ বছর পর্যন্ত জেল। সঙ্গে বিপুল জরিমানা। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা বৈঠকে বসে এই অর্ডিন্যান্স এনেছে আজ। বেশ করেছে। এটা দরকার। তবে অ্যারেস্টের আগে পিটিয়ে পিঠের ছাল তোলাও দরকার বলে ব্যক্তিগতভাবে মনে করি।

দুপুর ৩.‌২৫

বাদুড়িয়ায় ত্রাণ না পেয়ে পথ অবরোধ। অবরোধ তুলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে গ্রামবাসীদের সংঘর্ষ। ওসি–র মাথা ফেটেছে। তাঁকে বাহিনীর থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করেছিল জনতা। পাল্টা পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে। এটা নতুন কিছু নয়। প্রায় প্রতিবছর বন্যার পর রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় হয়ে থাকে।

কিন্তু এই ঘটনাটা মনে থাকবে অন্য একটা দৃশ্যের জন্য। গাছকোমর বেঁধে শাড়ি পরা এক ছিপছিপে চেহারার গ্রাম্য মহিলা হাতের ঝাঁটা দিয়েই পুলিশের লাঠির সঙ্গে তলোয়ারবাজি চালিয়ে গেলেন। তাঁকে পেড়ে ফেলা গেল না। বেশ কিছুক্ষণ লড়াই করে তিনি বড় রাস্তা ছেড়ে গ্রামের মধ্যে ঢুকে গেলেন। দেখার মতো।

বিকেল ৪.‌১০

নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক সেরেই বেরিয়ে পড়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সচেতনতার বার্তা প্রচারে। কালকের মতো। তার আগে পরিদর্শক দল পাঠানো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারকে হাল্কা খোঁচা দিয়েছেন। আর তীব্র কটাক্ষ করেছেন রাজ্যপালকে। যিনি গত কয়েকদিন ধরেই টুইটারে রেশন ব্যবস্থা নিয়ে রাজ্য সরকারকে ধুনে দিচ্ছেন।

সন্ধ্যা ৬.‌৩০

অর্ণবকে নিয়ে হেব্বি বাওয়াল শুরু হয়েছে। এতটাই যে #‌অ্যারেস্টঅ্যান্টিইন্ডিয়াঅর্ণব দিয়ে টুইটারে ক্যাম্পেন শুরু হয়ে গিয়েছে। পালগড়ে গণপ্রহারে মৃত্যুর ঘটনা রিপোর্ট করতে গিয়ে সোনিয়া গান্ধী সম্পর্কে একটা অর্ণব–সুলভ মন্তব্য করে বসেছে রিপাবলিক টিভি মিডিয়ার বস্‌। কেলেঙ্কারি শুরু হয়েছে। অর্ণবের বিভিন্ন বক্তব্য নিয়ে এর আগেও কড়া প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কিন্তু ওকে গ্রেফতারের দাবি এর আগে ওঠেনি। অর্ণব অবশ্য অকুতোভয়। ওকে মাঝ আকাশে কুণাল কামরাও দমাতে পারেনি। দেখা যাক, এই জল কতদূর গড়ায়।

সন্ধ্যা ৬.‌৪৪

দিল্লিতে এক কোভিড সেন্টারে আজ থেকে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের টেস্টিং শুরু হল। এটা ভাল পদক্ষেপ। আজই কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক সংবাদকর্মীদের সতর্ক করেছে। কারণ, ইতিমধ্যেই মুম্বইয়ের অন্তত ৫০ জন সাংবাদিক করোনায় সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে। একটি তামিল চ্যানেলের ২৫ জন আক্রান্ত। আরও কয়েকটি রাজ্যেও এমন ঘটনা ঘটেছে। পশ্চিমবঙ্গে অবশ্য এখনও পর্যন্ত এমনকিছু শোনা যায়নি। কিন্তু যে সহকর্মীরা বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের তো সত্যি সত্যিই হাই এক্সপোজার। যে কোনও সময় সংক্রমিত হয়ে যেতে পারে। এটা ভেবে বেশ চিন্তাই হচ্ছে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, কাজের সময় একটা জোশ থাকে। তখন খিদেতেষ্টার বোধ থাকে না। দেশেবিদেশে বহু অ্যাসাইমেন্টে গিয়ে খিদে পেয়েছে একেবারে রাতে। যখন কলকাতা অফিস কনফার্ম করেছে, কপি ঠিকঠাক পৌঁছেছে। কিন্তু এ তো আর খালিপেটে জল খেয়ে থাকা নয়। এ অন্য বিপদ। আশা করি, সকলে ঠিকঠাক থাকবে। সুস্থ থাকবে। সাবধানে থাকবে।

সন্ধ্যা ৬.‌৫০

পরলোকে মিঠুন চক্রবর্তীর বাবা বসন্তকুমার চক্রবর্তী। বয়স হয়েছিল ৯৫। কিডনির অসুখে ভুগছিলেন। মিঠুন বেঙ্গালুরুতে শ্যুটিং করতে গিয়েছিলেন। লকডাউনে সেখানেই আটক। শোনা যাচ্ছে, বাবার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে গাড়িতেই মুম্বইয়ের পথে রওনা দিয়েছেন।

সন্ধ্যা ৭.‌৩৩

আগামী ২৭ এপ্রিল আবার দেশের সব মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স। ৩ মে তারিখ লকডাউন তোলা হবে কিনা, তা নিয়েই সম্ভবত। প্রধানমন্ত্রী সকলের মতামত চাইবেন। জানতে চাইবেন, কারা কারা এখনও লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে। মন বলছে, সার্বিক লকডাউন তোলা হবে না। হয়তো আরও কিছু সেক্টরে ছাড় দেওয়া হবে। ধাপে ধাপে এমনই চলতে থাকবে জুন মাস পর্যন্ত।

সন্ধ্যা ৭.‌৫৫

কাজের চাপ কম থাকলে একদা এই সময়টায় রোজ অফিসের ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াতাম। আর দেখতাম, পেটের নীচে তীব্র আলো জ্বালিয়ে একের পর এক প্লেন ল্যান্ড করছে দমদমে। সেক্টর ফাইভের এই অফিস থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই রানওয়ে। অবাক হয়ে দেখতাম, প্লেনগুলো নামতে নামতে অতিকায় হয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে আকাশ। দারুণ লাগত। প্লেন ওড়া নিয়ে একটা শিশুসুলভ বিস্ময় আমার এখনও আছে। এয়ারপোর্টে গিয়ে হাঁ করে প্লেন ওঠানামা দেখি। এরো–ডায়নামিক্সের বিজ্ঞান বুঝি না। শুধু মনে হয়, ওই দানবীয় কাঠামোটা খোঁদলের মধ্যে অত লোকজন আর মালপত্তর নিয়ে হাওয়ায় ভেসে থাকে কী করে!‌ আরও আছে। উইন্ডো সিটের জন্য বাচ্চাদের মতো আব্দার করি। শেষ প্লেনে কবে উঠেছি মনে নেই। কিন্তু সেবারও নির্ঘাত জানালা নিয়ে ঝোলাঝুলি করেছিলাম।

এখনও বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াই। কিন্তু আর প্লেনের আলো দেখতে পাই না। কবে পাব, আদৌ পাব কিনা, তা–ও বুঝতে পারি না।

এক পাইলট বন্ধু বলছিল, ‘সিভিল অ্যাভিয়েশন সেক্টরকে সরকার বেইল আউট না করলে এ দেশে প্লেন ওড়া বন্ধ হয়ে যাবে। আর শুধু এ দেশেই বা কেন?‌ বিদেশেও।’ সত্যিমিথ্যে জানি না। কিন্তু ও–ই বলছিল, টারম্যাকে প্লেনের পার্কিংয়ের জন্য মিনিটে নাকি পাঁচ–ছ’হাজার টাকা লাগে। সেজন্যই লো কস্ট এয়ারলাইন্সগুলো প্যাসেঞ্জার নামাতে নামাতে এয়ারক্রাফ্টের ভিতরে ঝাঁট দিতে শুরু করে। আবার ঝাঁট দেওয়া শেষ হতে না হতেই প্যাসেঞ্জার ভরতে শুরু করে। যাতে বেশিক্ষণ টারম্যাকে থাকতে না হয়। তাহলেই দ্বিগুণ, চতুর্গুণ ভাড়া গুনতে হবে।

এই লকডাউন আরও একমাস জারি থাকলে কী হবে আমাদের দেশের এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রির?‌

রাত ৯.‌১০

বিবিসি নিউজে উয়ানিটা নিটলার কথা পড়লাম। ৪২ বছরের এই সিনিয়র সিস্টার লন্ডনের রয়্যাল ফ্রি হাসপাতালের ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। আসল কথা হল, উয়ানিটা হলেন সেই নার্স, যিনি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করোনা–আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রীর জীবন থেকে ভেন্টিলেটর সাপোর্টটি সরিয়ে নিতেন। যিনি এখনও দুঃস্বপ্ন দেখেন। আর সেই মানুষগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে আক্ষেপ করেন— তিনিই তো প্রকারান্তরে তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী!‌

এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে সকালের শিফ্‌ট শুরুর সময় হাসপাতালের আইসিইউয়ের রেজিস্ট্রার উয়ানিটাকে বলেন, তাঁর প্রথম কাজ এক রোগীর ভেন্টিলেটর সাপোর্ট অফ করা। তখনও করোনা–আক্রান্তদের আত্মীয়রা তাঁদের প্রিয়জনকে মৃত্যুর আগে বিদায় জানাতে পারতেন না। সে রীতি এখন চালু হয়েছে ইংল্যান্ডে। ফলে উয়ানিটাকে সেই পঞ্চাশোর্ধ্ব নার্সের কন্যাকে ফোন করে বলতে হয়, তাঁর মায়ের কোনও যন্ত্রণা নেই। তিনি যথেষ্ট ‘কমফর্টেব্‌ল’ আছেন। প্রশ্ন করতে হয় তাঁর মায়ের শেষ ইচ্ছে এবং তাঁদের পরিবারের ধার্মিক রীতিনীতি নিয়ে।

উয়ানিটার পেশেন্টের আশেপাশে আরও সাতটি বেডে তখন পেশেন্টরা ভর্তি। সকলেই সংজ্ঞাহীন। প্রথমে মৃত্যুপথযাত্রী প্রৌঢ়ার বেডের চারদিকের পর্দা টেনে সব মেডিক্যাল অ্যালার্ম অফ করেন উয়ানিটা। কথা থামাতে বলেন আইসিইউয়ের মেডিক্যাল টিমকে। রোগীর কানের পাশে ফোন ধরেন উয়ানিটা। তারপর মেয়েকে বলেন মায়ের সঙ্গে কথা বলতে। তখন সেখানে মৃদুস্বরে বাজছে মেয়ের বলে দেওয়া মায়ের প্রিয় গানের সুর।

আস্তে আস্তে ভেন্টিলেটরের সাপোর্ট খুলে নেন উয়ানিটা। যিনি বলেছেন, ‘দেখলাম মনিটরের লাইটটা একবার দপ করে জ্বলে উঠে পুরো নিভে গেল। হার্টরেট শূন্য হয়ে গেল। স্ক্রিনে দেখলাম ফ্ল্যাট লাইন। যতক্ষণ না দেহ থেকে ওঁর প্রাণটা বেরিয়ে যায় ততক্ষণ আমি ওঁর পাশে দাঁড়িয়ে হাতটা ধরে ছিলাম। পাঁচমিনিটের মধ্যে সব শেষ। সেডেটিভ দেওয়ার টিউবগুলো খুলে নিলাম। তারপর ফোনটা তুলে শুনলাম, মেয়ে তখনও মায়ের সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছেন। আমি ওঁকে বললাম, আর দরকার নেই। সব শেষ।’ বিছানাতেই মৃতাকে ভাল করে স্নান করিয়ে সাদা কাপড়ে মুড়ে তাঁর দেহ বডি ব্যাগে শুইয়ে দেন উয়ানিটা। ব্যাগের জিপ বন্ধ করার আগে মৃতার কপালে এঁকে দেন ক্রস চিহ্ন।

রাত ১০.‌১৭

রাত বাড়ছে। আঁধার ঘনাচ্ছে আরও। প্রদীপ কুমার, রোশন আর, অনির্বাণ দত্ত, উয়ানিটা নিটলা…‌ দেশকালের ব্যবধান মুছে যাচ্ছে ক্রমশ।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s