লকডাউন ডায়েরি – ১৫ এপ্রিল, ২০২০

১৫.‌০৪.‌২০২০

সকাল ‌৮.‌১৩

মিডিয়ায় চাকরি যাওয়া শুরু হল। সাবেক সিএনএন–আইবিএনের কর্মী অনুভা ভোঁসলে গতকাল রাতে টুইট করেছিল, ওর একটা স্টার্ট–আপ কোম্পানি আছে। যারা চাকরি খুইয়েছে, তারা যেন ওই টাইমলাইনে যোগাযোগ করে। ও একটা লিস্ট তৈরি করছে। সেই তালিকা দেখে কাজ দেওয়ার চেষ্টা করবে। সমস্যা হল, অনুভা প্রথমে ‘মিডিয়ার কর্মী’ কথাটা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিল। ফলে যা দেখছি, ওর টুইটার থ্রেডে আছড়ে পড়েছে দেশজুড়ে বেকারের স্রোত। যেমন একজন লিখেছে, ‘প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংস্থার কাছে কর্মী ছাঁটাই না করার আবেদন জানালেন ঠিকই। কিন্তু আমাদের টেলিকম কোম্পানি লকডাউন ঘোষণার পর গতমাসেই ৫০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছে।’

দৈত্যটা এবার ঘাড়ের উপর এসে পড়ল। ছায়াটা লম্বা হয়ে পড়ছে। দেখতে পাচ্ছি।

অন আ লাইটার নোট, কাল রাতে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিলাম। রান্না করার ছিল। প্রচুর বাসনপত্রও মাজার ছিল। সেটা করতে করতেই বিশ্বজিৎ ফোন করল। তখনও বাসন মাজা চলছে। ঠং–ঠং শব্দ শুনে বলল, ‘তুমি তো দেখছি একেবারে কাজের মেসো হয়ে গিয়েছ!‌’ ওকে বললাম, যা দিন আসছে, ভাবছি কাগজে ‘গৃহকর্মনিপুণ’ বলে বিজ্ঞাপন দেব। যদি কেউ রাখে!

‌সকাল ৯.‌১৩

সৌরভ সকাল সকাল একটা ভিডিও টুইট করেছে। ২০০১ সালে ইডেনে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পর ড্রেসিংরুমে সেলিব্রেশনের দৃশ্য। শচীন, রাহুল, সৌরভরা শ্যাম্পেনের ফোয়ারা ছেটাচ্ছে। তারপর ইডেনে ভিকট্রি ল্যাপ। এসব এখন গত জন্মের ঘটনা বলে মনে হয়।

সকাল ৯.‌২০

ট্রাম্প ‘হু’র অনুদান বন্ধ করে দিল!‌ এই রে, সত্যি সত্যি খেপেছে লোকটা এবার। কমপ্লিট মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে। পাগলা ঘোড়া খেপেছে, বন্দুক ছুড়ে মেরেছে!‌

সকাল ৯.‌৪৫

মুম্বইয়ের ওই পরিযায়ী শ্রমিকরা কোথায় গেলেন?‌ কোথায় গেল তাঁদের ভয়ার্ত, মরিয়া মুখগুলো?‌ যাঁরা বান্দ্রা স্টেশনের কাছে ভিড় জমিয়েছিলেন। পুলিশের লাঠি খেয়ে যাঁরা ছড়িয়ে পড়ছিলেন চারদিকে। দেশে ট্রেন চলছে না জেনেও যাঁদের বিভ্রান্ত করে স্টেশনে পাঠানো হয়েছিল।

কমল হাসানের টুইটের সঙ্গে একমত— পরিযায়ী শ্রমিকদের সমস্যাটা কিন্তু একটা টাইমবোমার মতো টিকটিক করে চলছে। যাঁরা ব্যালকনির নিরাপদ দূরত্ব থেকে দাঁড়িয়ে দেখছেন, তাঁরা মাটির কাছাকাছি নজর দিন। এই টাইমবোমা অবিলম্বে নিষ্ক্রিয় না করলে কিন্তু গোটা দেশের কপালে অশেষ দুঃখ আছে।

সকালে উদ্ধব ঠাকরের বিবৃতি দেখলাম। তিনি বলেছেন, ওই পরিযায়ী শ্রমিকদের কে বা কারা বলেছিল, বান্দ্রা থেকে বিশেষ ট্রেন ছাড়বে। তাঁরা ওই ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরতে পারবেন। তাই তাঁরা ওখানে জমায়েত হয়েছিলেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেছেন, যারা গুজব রটিয়েছিল, তাদের কাউকে ছাড়া হবে না। ছাড়া না হয় না হল। কিন্তু ধরার পর কী করা হবে?‌ প্রকাশ্যে চাবকানো যায় না?‌

সকাল ১০.‌৩০

নাট্য পরিচালক দেবেশ দেখলাম ফেসবুকে স্টেটাস দিয়েছে, ‘ঝড় থেমে যাবে একদিন শীর্ষক একটি ফিল্ম দেখলাম। ঝড় তো থামবে। কিন্তু এই মধ্যমেধার মহাযজ্ঞ থামবে কবে?‌’ এইটুকুই।

সকাল ১০.‌৪৬

অনেকক্ষণ ধরেই ভাবছি, গাড়ি ধুতে যাব। কিন্তু বিছানায় পড়ে পড়ে ল্যাদ খেয়েই যাচ্ছি। বাইরে বীভৎস গরম। বেরোতেই ভয় লাগছে।

সারা পৃথিবীতে করোনায় ১ লক্ষ ২৬ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। টিভি–তে বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, ‘মৃত্যুমিছিল’। শুনতে শুনতে ভাবছিলাম, ‘মিছিল’ শব্দটা কি মৃত্যুর সঙ্গে যায়?‌ মিছিল তো খুব জীবন্ত একটা বিষয়। মিছিল থেকে দাবি ওঠে। প্রতিবাদ তৈরি হয়। জনতার বজ্রনির্ঘোষ ধরা পড়ে। ‘মৃত্যুমিছিল’ বলা মানে কি অতি সরলীকরণ?‌ নাকি আমাদের শব্দভান্ডারের দৈন্য?‌ নাকি এটা বোঝানো যে, মানুষ মিছিল করে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?‌ কে ‌জানে!‌

সেন্ট্রাল হোম মিনিস্ট্রি আগামী ১৯ দিনের লকডাউনের জন্য গাউডলাইন ইস্যু করেছে। আগামী ২০ এপ্রিলের পর অত্যাবশ্যকীয় পণ্য উৎপাদন, আন্তঃরাজ্য পণ্য পরিবহণ, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু ছাড় আছে দেখছি।এই নিয়ে টিভি সারাদিন এবং তারপর রাত পর্যন্ত বিস্তারিত লেবু কচলাবে নিশ্চয়ই। এখন এখানে লিখতে বোর লাগছে।

দুপুর ১২.‌০৮

যাবতীয় আলস্য, ভয়–ভীতি ত্যাগ করে গাড়ি ধুলাম। এবং মনে পড়ে গেল অধুনাপ্রয়াত মুন্না আজিজের রফি–অনুকরণীয় গলায় ‘মর্দ’ সিনেমার সেই গান, ‘যাকো রাখে সাঁইয়া, মার সাকে না কোই’। কারণ, বালতি হাতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে গাড়ির কাছাকাছি যাওয়া মাত্র কোথা থেকে আকাশে একখানা বৃহৎ মেঘখণ্ড ভেসে এল। যতক্ষণ গাড়ি ধুলাম, রোদ উঠল না।

এ কি মায়া?‌ ‌এ কি অলীক স্বপ্ন?‌ এ কি ঈশ্বরপ্রেরিত বার্তা?‌ মোদি’জি জানেন হয়ত। তবে আমি এই লীলায় বিমোহিত।

দুপুর ১২.‌৩৩

আজও গাড়ি ধোওয়ার সময় সেই ছেলেটা পাশ দিয়ে চলে গেল। কাছাকাছিই থাকে বোধহয়। আজ আর তাকায়নি। উল্টে আজ আমি তাকালাম। এবং দেখলাম, মুখোশের উপর দিয়ে ছেলেটাকে অনেকটা অভিনেতা ঋত্বিক চক্রবর্তীর মতো দেখতে। আরও দেখলাম, ওর লো–ওয়েস্ট জিন্‌সের ট্রাউজারটা প্রায় খুলে পড়ে যাচ্ছে। অথচ খুলে পড়ছে না। একেই বলে ‘সঙ্কটজনক তবে স্থিতিশীল’।

এটা নিয়ে একটা ছোট অ্যানেকডোট আছে। আনন্দবাজার রিপোর্টিংয়ের মিটিংয়ে অমর্ত্য একবার প্রশ্ন করেছিল, ‘আচ্ছা কেউ অসুস্থ হলে আমরা যে কাগজে লিখি, অমুক এখন সঙ্কটজনক তবে স্থিতিশীল। এটার মানে কী?‌’ পাশে বসা সঞ্জয়’দা খুব সিরিয়াস গলায় বলেছিল, ‘যেমন তোর জিন্‌সটা। সবসময় মনে হচ্ছে, এই খুলে পড়ে গেল। অথচ যাচ্ছে না। আটকে আছে। সঙ্কটজনক। তবে স্থিতিশীল। বুঝলি?‌’

দুপুর ১.‌১৩

লকডাউনের পর কী কী করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে, তার একটা তালিকা বানাতে হবে। তবে একটা প্রস্তাব ফ্লোট করাতেই হবে— চশমায় ওয়াইপার লাগানোর। আমার মতো যারা প্রচণ্ড ঘামে, তারা কায়িক পরিশ্রমের কাজ করতে গেলে কপাল থেকে চশমার কাচে টপটপ করে ঘাম পড়ে। খুব ইরিটেটিং!‌

বিকেল ৪.‌৩২

নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রথমে মুখ্যসচিব জানালেন, এখনও পর্যন্ত রাজ্যে অ্যাক্টিভ করোনা কেস ১৩২টি। মৃত এখনও ৭। টেস্ট এখনও পর্যন্ত করা হয়েছে ৩,৪৭০ জনের। আর ৪২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। তারপর মুখ্যমন্ত্রী শিক্ষাক্ষেত্র নিয়ে কিছু ঘোষণা করলেন। যেমন, একাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের পাশ করিয়ে দেওয়া হবে। কলেজের পড়ুয়ারা শুধু শেষ সেমেস্টারটা দেবে আর জুন মাসে উচ্চ মাধ্যমিকের বাকি পরীক্ষাগুলো নেওয়া হবে রাজ্যে।

ওহ্‌, লিখতে ভুলে যাচ্ছিলাম। আজ হাতেকলমে বিভিন্ন ধরনের মাস্ক তৈরি এবং তাদের ব্যবহারও শিখিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। রকমারি কাপড় গলায় ঝুলিয়েই সাংবাদিক বৈঠকে এসে বসেছিলেন। এক এক করে গলা থেকে খুলে দেখালেন কীভাবে নাক–মুখ ঢাকতে হবে। আর কী কী কাপড় দিয়ে মাস্ক তৈরি করা যায়। ব্রিলিয়ান্ট!‌ দেশের আর কোনও মুখ্যমন্ত্রী করোনায় এতটা ইনভল্‌ভড কি?‌ জানি না।

কেন্দ্রীয় সরকার জানাচ্ছে, সারা দেশে মোট ১৭০টা জেলা ‘করোনা হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে চারটি— কলকাতা, হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর। কলকাতা আমার পাশের জেলা। আর সল্টলেক উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যে পড়ে। এসব এলাকায় লকডাউন কার্যকর করতে আরও কড়াকড়ি করা হবে।

‌বিকেল ৫.‌৪৫

মেঘ করেছে। মেঘ করেছে। টিভি–তে বলছে, কিছুক্ষণের মধ্যে দক্ষিণবঙ্গের কয়েকটি জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ–সহ বৃষ্টির সম্ভাবনা। আগে এসব শুনে ভাল লাগত। এখন চিন্তা হল। যে জামাকাপড়গুলো কেচেছিলাম, সেগুলো কি বারান্দার রেলিংয়ে মেলেছি?‌ না ক্লোদ হ্যাঙারে একটু ভিতরে রেখেছি?‌ গভীর মনোযোগ দিয়ে চিন্তা করে আশ্বস্ত হলাম। কারণ, আমার মনে পড়েছে যে, জিন্‌সের ট্রাউজার্সটা প্রথমে রেলিংয়ে মেললেও বেরোনর ঠিক আগে তুলে হ্যাঙারে মেলেছি। সঙ্গে কাচার পর দু’টি তোয়ালেও। যাক বাবা বাঁচা গেল। কারণ ওগুলো একবার শুকোনর পর আবার ভিজে গেলে শুকোতে গোটা একটি দিন লাগত!‌

হুঁ হুঁ বাবা, যাকো রাখে সাঁইয়া, মার সাকে না কোই।

সন্ধ্যা ৭.‌৩৪

কিন্তু সাঁইয়া দেখা যাচ্ছে রাখার পাশাপাশি মারেও। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমেছে এবং আমার গাড়িটি অফিসের পোর্টিকোর তলায় দাঁড়িয়ে কাকভেজা ভিজছে। বাড়ি যাওয়ার সময় রাস্তায় বেরোলে তার সারা গায়ে ক্যাতক্যাতে কাদা হবে আর কাল আমায় আবার সাঁইয়ার ভরসায় গাড়ি ধুতে হবে।‌ আর ভাল লাগে না!‌

রাত ৯.‌৪১

টুইটারে দেখলাম, করোনাভাইরাস সংক্রমণের নতুন সিম্পটম ধরা পড়েছে। পায়ের বুড়ো এবং অন্যান্য আঙুলের উপর লালচে বা বেগুনি রঙের ছোটছোট ফুসকুড়ি। সাধারণত তরুণ–তরুণীদের দেহে বেশি দেখা যাচ্ছে। তবে আমেরিকার বিভিন্ন নার্সিংহোমে ভর্তি রোগীদের দেহেও এই লক্ষণ লক্ষ্য করা গিয়েছে।

রাত ১০.‌০৫

মাস্ক সংক্রান্ত তিনটি আবিষ্কার দিয়ে আজ ডায়েরি বন্ধ করব—
১.‌ মাস্ক পরলে জল কম খাওয়া হয়। অস্বাস্থ্যকর।
২.‌ মাস্ক পরে শ্বাস–প্রশ্বাস নিলে চশমার কাচ বহিরাগত বাষ্পে ঝাপসা হয়ে যায়। বিরক্তিকর।
৩.‌ মাস্ক পরলে একে অপরকে শুধু চোখ দেখে চিনতে হয়। অস্বস্তিকর 

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s