লকডাউন ডায়েরি – ১০ এপ্রিল, ২০২০

১০.৪.২০২০। শুক্রবার 

সকাল ৮.১৫ 

অর্ণব মেসেজ  করল, ‘রোজ তোমার লকডাউন ডায়েরি পড়ি। দারুণ হচ্ছে, চালিয়ে যাও।’ অনেকদিন পর ওর সঙ্গে কথা হয়ে ভাল লাগল। অর্ণব আমার ব্যাডমিন্টন শুরুর প্রথমদিকের বন্ধু। গোলগাল চেহারা। কিন্তু কোমর ঘুরিয়ে একটা ব্যাপক ক্রসকোর্ট শট নিতে পারে। এক্সেলেন্ট! 

অর্ণব একটা ওয়ার্ক আউট অ্যাপও পাঠাল। বলল, ও আজ থেকেই শুরু করেছে। আমিও যাতে শুরু করে দিই। লজ্জায় ওকে আর বলিনি যে, দু’দিন আগে গাড়িতে রাখা ব্যাডমিন্টনের কিট ব্যাগ থেকে যোগা ম্যাট বের করে এনেছি। কিন্তু এখনও মাটিতে পেতে উঠতে পারিনি। রোজ সকালে উঠে একবার ম্যাটটার দিকে তাকাই। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বলি, কাল থেকে মাস্ট! তারপর ছ’মাসে ঋত্বিক রোশন। গ্রিক গড। 

সকাল ১০.৫৮

আজ সকাল থেকে খুবই পরিশ্রম গেল। লকডাউনের সকাল কি এত ব্যস্ত যায় লোকের? বিশেষত আমার মতো অলস লোকের? একটু জিরিয়ে নিয়ে পরে আবার লিখছি। 

বেলা ১১.২৩

সকালে উঠে বাবা-মা’কে চা দিয়েই দৌড়েছিলাম চেতলা। আজকাল তো সবসময়ই ফুরফুরে রাস্তা। ‘মা’ ধরে চলে গেলাম। আজকালে জয়েন করার পর অনেকে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘চেতলা থেকে সল্টলেক তো অনেক দূর! নিশ্চয়ই অনেক সময় লাগে যেতে?’ প্রশ্নকারীর দিকে বিজ্ঞের মতো তাকিয়ে গলায় সামান্য আবেগ মিশিয়ে বলতাম, ‘মেরে পাস মা হ্যায়।’ 

এখন লকডাউনের বাজারে ‘মা’ যাকে বলে ‘দিদিমা’য় পরিণত। স্পিড গান কাজ করছে কিনা জানা নেই। যাবতীয় কেসও বোধহয় লকডাউনে গিয়েছে। 

বঙ্কু কিন্তু একেবারেই বেড়ালের মতো আচরণ করছে না। ওর অভিমান হয়েছে। যা মার্জার সমাজে প্রত্যাশিত নয়। রুলবুক বলে, বাড়ির কুকুররা কৃতার্থ থাকবে গৃহকর্তার প্রতি। তাদের সেন্স অফ গ্র্যাটিটিউড অনেক বেশি। কুকুররা সবসময় কৃতার্থ থাকে। বেড়ালরা কৃতার্থ করে। তাদের হাবভাবটা হল — ‘বাড়িটা আমার। তোমায় দয়া করে থাকতে দিয়েছি।’

লবঙ্গ, ট্রাইপড এবং ইন্সটু (ভাল নাম ‘ইন্সটাগ্রাম’। পেয়ার সে লোগ উসে ইন্সটু কহতে হ্যায়) সারমেয় সমাজের নিয়ম মেনেই লেজ নাড়তে নাড়তে ছুটে এল। কিন্তু বঙ্কুর দেখা মিলল না। পরে দেখা মিললেও সঙ্গ মিলছিল না। পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। একবার পাকড়াও করে কোলে নিলাম। বড় বড় চোখ পাকিয়ে এমন চিল চিৎকার শুরু করল, যে নামিয়ে দিতে হল। 

বাজারে গিয়ে বাচ্চাদের মাছ-মাংস নিয়ে এলাম। যাওয়া আসার পথে শুনলাম, মাইকে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তৃতা চলছে। বিষয় : এখন কীভাবে বাজার করা উচিত। উনি কি সমস্ত পাবলিক প্লেসে কেমন ব্যবহার করা উচিত, সে ব্যাপারে এইরকম ছোট ছোট সাউন্ড ক্যাপসুল বানিয়ে বাজারে ছেড়েছেন? ব্যাপারটা কিন্তু উপকারী। খোঁজ নিয়ে দেখব তো। 

মাছের দোকানে দিব্যি ভিড়। কারও কোনও তাড়া নেই। বাজারু বাঙালির পদচারণা অলস। মুখ মাস্কবদ্ধ। মন সংকল্পবদ্ধ – সোশ্যাল ডিস্টান্সিং মানব না। 

একটা বোধিজ্ঞান লাভ হল। অধিকাংশ গ্রসারি অ্যাপ বা ফ্যাশনেবল ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিন্তু এই লকডাউনের বাজারে ল্যাগব্যাগ করছে। বেঁচে আছে পাড়ার দোকান-বাজার। আমরা আবার সেই দিনগুলোয় ফিরছি, যখন বাজারে যেতে-আসতে পড়শির সঙ্গে দেখা হয়ে দুটো কুশল বিনিময় হত। এটা গুড। 

চেতলার কাজ সেরে সল্টলেকে ফিরে অদ্যাবধি দীর্ঘতম এন্ট্রি লিখলাম। এবার একটু বিশ্রাম না নিলেই নয়। বয়েস হচ্ছে তো।  

দুপুর ১২.০৮ 

চমৎকার টুইট করেছে তসলিমা। করোনা অতিমারী থেকে কী শিখলাম? 

১. ভগবান বলে কেউ নেই। 

২. শুধু মারণ ভাইরাসই নয়, ধর্মীয় মৌলবাদী ও ঈশ্বর ভক্তরাও মানবতার পক্ষে ঘোর বিপজ্জনক।

৩. দেশের সীমানা বলে কিছু হয় না। 

৪. আমেরিকা আর গ্লোবাল পাওয়ার নয়। 

৫. পৃথিবীর সকলেই আসলে একটি পরিবারের সদস্য – মানবিকতা। 

শুনেটুনে অনুত্তমা বলল, ‘৫ নম্বর পয়েন্টটা হতে পারতো,  পৃথিবীর সকলেই আসলে একটি পরিবারের সদস্য – করোনা।’ 

দুপুর ১২.২৪ 

এই রে ! লোডশেডিং হয়ে গেল তো। 

দুপুর ১২.২৫ 

এসে গেছে! এসে গেছে! যাক বাবা। তাই ভাবি, লকডাউনের মধ্যে আবার লোডশেডিং কীসের? নিশ্চয়ই ভুল করে নিভিয়ে দিয়েছিল। 

দুপুর ১.১৪ 

অনেকদিন পর দূরদর্শন দেখতে ইচ্ছে হল। দেখলাম, এতদিনেও নিজস্ব দর্শন থেকে দূরে যায়নি। ভরদুপুরে কীর্তন হচ্ছে। এক সুদর্শনা তরুণী এক গা গয়না পরে কপালে রসকলি এঁকে ভক্তিভরে গাইছেন। খোল, করতাল, বাঁশি বাজছে সঙ্গে। ভক্তিবিনম্র পরিবেশ। দু’টি কীর্তনের বিরতিতে গায়িকার সঙ্গে আলাপচারিতা হল সঞ্চালিকার। দেখলাম, গায়িকা কথাও বলেন কীর্তনের সুরেই। 

দুপুর ৩.২২ 

কীর্তন শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙল পরপর দুটো স্বপ্ন দেখে। ব্যাক টু ব্যাক।

প্রথম স্বপ্নের সময়টা সন্ধ্যাবেলা। চেতলার বাড়ির দিকে এগোচ্ছি। দেখলাম পুরো অ্যাপার্টমেন্টটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশের সমস্ত বাড়িতে, রাস্তায় আলো জ্বলছে। শুধু আমার বাড়িটা মনে হচ্ছে একটা অন্ধকার কাচের বাক্সের মধ্যে বসানো। সেই বাক্সের সিলিং থেকে বটের ঝুরির মতো ঝুলছে প্রচুর ইলেকট্রিক তার। দেখেই বুঝলাম, ওগুলো সিইএসসি-র তার। ছিঁড়ে গিয়েছে। অর্থাৎ খুব তাড়াতাড়ি আর আলো জ্বলবে না। বিল্ডিংয়ে ঢুকে দেখলাম, চারদিকে কেউ কোত্থাও নেই। এমনকী, পার্কিংয়ে একটা গাড়ি পর্যন্ত নেই। চারদিকে ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়ে আছে। ঝাঁঝালো গন্ধ। বাড়ির দেওয়ালগুলো সব ভেজা ভেজা। বুঝলাম, স্প্রিংকলার থেকে কীটনাশক ছড়ানো হয়েছে। কারেন্ট নেই তাই লিফট চলছে না। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে মনে হল, বাচ্চাগুলো কী করছে এই অন্ধকারে? তারপর একতলা আর দোতলার ল্যান্ডিংয়ে দাঁড়িয়ে একটা ইনক্রেডিবল দৃশ্য দেখলাম — লবঙ্গ স্পাইডারম্যানের মতো একলাফে দোতলা থেকে তিনতলায় উঠে গেল! তা প্রায় ১২ ফুট হাইট হবে।লবঙ্গ আর আগের মতো লতিকা নেই। গায়ে পেশির ঢেউ খেলছে। তিনতলার ল্যান্ডিংয়ের রেলিংয়ে বসে ও ঘাড় ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল। চোখ দুটো জ্বলছে। রেলিংয়ের অন্য পাশে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আমার মার্জার সন্তানেরা। দু’পায়ে। মাথার হ্যাট খুলে তারা লবঙ্গকে অভিবাদন জানাচ্ছে। 

সেখান থেকে কী করে যেন অফিসে চলে এলাম। তখন আবার দুপুর। দেখলাম অফিসটা অন্যরকম হয়ে গিয়েছে। স্কুলের ক্লাসের মতো ডিপার্টমেন্ট। পিঠোপিঠি ডেস্ক। কিন্তু সেগুলো একেবারে ছোটবেলার ইস্কুলের মতো। টেবিলের সঙ্গে বেঞ্চি জোড়া। সে বেঞ্চির তলা থেকে জলহস্তী মুখ হাঁ করলে যেমন আকার হয়, সেই গোছের একটা ট্রে বেরিয়ে আছে। তবে খুব ছোট। তার মধ্যে রাখা ক্যালকুলেটরের সাইজের ল্যাপটপ। আমি তো দেখে হাঁ ! সমস্যা হল, কিছুতেই ঢুকতে পারলাম না ডেস্কটার মধ্যে। পা-ফা অ্যাডজাস্ট করে অনেক চেষ্টা করলাম। তা-ও হল না । তখন পীতাম্বরকে বললাম, ‘আমাকে তো অন্য জায়গায় বসতে হবে’। পীতাম্বর বলল, ‘ তাহলে চলুন, আপনি ওইদিকটায় বসবেন’। বলে আমাকে ঘরটার কোণায় নিয়ে গেল। সেখানে দেখি একটা হেভি কেতার কাঠের তিনকোণা কর্নার টেবিল। চকচকে ব্রাউন রঙের। কিন্তু সাইজে আমার মতোই বেঁটে। তার দু’পাশে দুটো গদি আঁটা রাশভারি চেয়ার। তাদেরও বাদামি রঙের কায়দার হাতল। অনেকটা সোফা সোফা দেখতে। কিন্তু এত নীচু টেবিলে কম্পিউটার রেখে কাজ করব কীভাবে? স্পন্ডিলোসিস হয়ে যাবে তো! ততক্ষণে দেখি আমার এক্সটেনশন টেলিফোনটা নিয়ে শত্রুঘ্ন আসছে। ওকে বললাম, ‘এইটুকু টেবিলে কোথায় টেলিফোন রাখব?’ ও বলল , ‘ ওটা কোনও ব্যাপার না স্যর। দেওয়াল থেকে ঝুলিয়ে দেব।’ 

যতক্ষণ ওরা ওসব করছে, ততক্ষণে আমি আবার দোতলায় গেলাম। সেখানে দেখলাম প্রচুর ভিড়। তার মধ্যে অনির্বাণ মজুমদার কেপ্রি আর টি-শার্ট পরে কার সঙ্গে একটা কথা বলছে। ওকে বললাম, ‘কী রে, ডিপার্টমেন্টে যাবি না?’ ও মুচকি হেসে বলল, ‘এই একটু অগ্নিদার পেছনে লেগে নিই।’ 

ঘুম ভেঙে গেল।

বিকেল ৪.৩৭ 

টেলিগ্রাফ একটা স্টোরি করেছে দেখলাম, ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সেক্স ডিটারমিনেশনের ওপর ব্যান তুলে নেওয়া হল। ওসব ডকুমেন্ট সামলানো, রিপোর্ট পাঠানোর লোকের অভাব বলে নাকি এই সিদ্ধান্ত। এই ঘটনা ঐতিহাসিক। গোবলয়ের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এই পাপ এতদিন গোপনে করা হতো। এখন আর সেই আড়ালটুকুও থাকবে না। 

সন্ধে ৬.৫২ 

যদি কোনওদিন লকডাউন ওঠে, যদি কোনওদিন ভারতের বাইরে বেরোতে পারি আবার, তাহলে ওই লোকটাকে ইন্টারভিউ করবই। আর ইন্টারভিউয়ের শেষে গলা জড়িয়ে গালে একটা চুমুও খেয়ে আসব। ওই যে লোকটা নিজের দেশ ফ্রান্সে লকডাউনের ফলে সিগারেট না পাওয়ায় হেঁটে পাশের দেশ স্পেনে যাচ্ছিল। প্রথমে গাড়ি নিয়েই বেরিয়েছিল। পুলিশ চেকপোস্টে গাড়ি আটকে দেওয়ার পরেও দাবায়ে রাখা যায়নি। গাড়ি সেখানেই ফেলে রেখে হেঁটে পিরেনিজ পর্বতমালা পেরিয়ে স্পেনের দিকে যাচ্ছিল। মাঝপথে ঝর্নায় ভেসে গিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলে। তারপর নিজেই ইমারজেন্সি সার্ভিসে ফোন করে উদ্ধারকারী দলকে ডাকে। তারা হেলিকপ্টার নিয়ে এসে উদ্ধারও করে। সঙ্গে লকডাউন ভাঙায় ১৩৫ ইউরো জরিমানা। 

এ যদি চরিত্র না হয়, চরিত্রটা কে? চ্যাম্পিয়ন লোক। এদের জন্যেই বোধহয় লেখা হয়েছিল, ‘নশা শরাব সে হোতা তো নাচতি বোতল।’ একেই বলে ফ্যাশনের দেশের প্যাশন। 

রাত ৯.১৫ 

এখনও পর্যন্ত ভারতে আক্রান্ত ৬,১৯২। মৃত ২২৯। সারা পৃথিবীতে মৃত্যু, ৯৮,৩৮৭। আর দু’একদিনে শেষ সংখ্যাটা লাখ ছাড়াবে। 

রাত ১০.০২ 

কালই পরিষ্কার হয়ে যেতে পারে লকডাউনের ভাগ্য। কাল বেলা ১১টা নাগাদ দেশের সব মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স শুরু। লকডাউন উঠবে যে না , তা এখনই লিখে দেওয়া যায়। প্রশ্ন হল, কী ফর্মে থাকবে। 

রাত ১০.২১ 

হর্ষ গোয়েঙ্কা টুইট করেছেন, ‘আজ থেকেই লং উইকএন্ড শুরু হয়ে গেল। 

১০.৪.২০ – শুক্রবার, গুড ফ্রাইডে। 

১১.০৪.২০ – শনিবার। 

১২.০৪.২০ – রবিবার, ইস্টার সানডে। 

১৩.০৪.২০ – সোমবার, বৈশাখী।  

১৪.০৪.২০ – মঙ্গলবার, আম্বেদকর জয়ন্তী।

আমি যে কী অসম্ভব ব্যস্ততায় কাটাব। কত কিছু যে করার আছে — কিছু কাজের ফোন। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা। নেটফ্লিক্স। খাওয়া। ঘুম। আর তারপর সবচেয়ে জরুরি কাজ —- যেগুলো বললাম, সবক’টা রিপিট। লং উইকএন্ড আজ শুরু হল? নাকি চলছে?’

ঠিকই। লং উইকএন্ড এখন রেকারিং ডেসিমেল। 

4 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ১০ এপ্রিল, ২০২০

  1. নিজে নেশা করিনা তবে “ন্যসা শরাব সে…” লাইনটা পড়ে মনের অজান্তেই মুচকি হাসলাম।

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s