লকডাউন ডায়েরি – ৭ এপ্রিল, ২০২০

০৭.‌০৪.‌২০২০। মঙ্গলবার

সকাল ৭.‌৪৩

আজ লকডাউনের চতুর্দশ দিন। দেখলাম, বডি ক্লক বদলে গিয়েছে। এখন আর ঘুম ভাঙাতে অ্যালার্ম দরকার হচ্ছে না। নিজে থেকেই সাড়ে ৭টায় উঠে পড়ছি। যেমন ব্যাডমিন্টন খেলার সময় ভোর সাড়ে ৪টেয় ঘুম ভেঙে যেত। আজও ভেঙে গেল। শরীর আসলে একটা যন্ত্র। যেমন চালানো হয় তেমনই চলে। চলছে। ঘুম ভেঙে প্রথমেই হাঁ করলাম। এখনও চোয়ালে একটু লাগছে। তবু মনে হল, আজ অফিস যাব। অনেকদিন হয়ে গেল। এবার বোর্‌ড লাগছে।

কাল রাতে অমিতাভ বচ্চন–সহ বিবিধ সেলিব্রিটি অভিনীত ‘ফ্যামিলি’ দেখলাম। লকডাউন সংক্রান্ত চার মিনিটের কিছু বেশি সময়ের সাদা–কালো ছবি। বচ্চন ছবির শেষে বললেন, তাঁরা সকলেই বাড়িতে বসে ছবিটি শ্যুট করেছেন। ছবির কেন্দ্রে একটি কালো চশমা। বচ্চনের সেটি এখন দরকার। কারণ, এটি আসলে এখন অপ্রয়োজনীয়। এই ধরনের কিছু একটা মূল বক্তব্য। রোদচশমা দরকার নেই। কারণ, রোদে বেরোনর প্রয়োজন নেই।

আজ সকাল থেকে সেই ছবি নিয়ে ফেসবুক জুড়ে উচ্ছ্বাস শুরু হয়েছে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মনে হয়েছে, খারাপ বললেও আন্ডারস্টেটমেন্ট। যেমন অখাদ্য স্ক্রিপ্ট, তেমনই দুর্বল তার এগজিকিউশন। লকডাউনের সময় বাইরে বেরোবেন না— এই কথাটা এই সমস্ত অভিনেতা–অভিনেত্রীরা আলাদা আলাদাভাবে বললেও পারতেন। জোর করে একটা জুভেনাইল গল্প খাড়া করে এক আপাত–দুর্বোধ্য বিবৃতিতে সেটা বলার যে কী দরকার ছিল কে জানে!‌ দ্বিতীয়ত, ছবির এতই জোর যে, শেষে অমিতাভকে বলেও দিতে হল যে, তাঁরা সকলেই নিজের নিজের বাড়িতে বসে ছবির দৃশ্যগুলো শ্যুট করছেন?‌ বলেই যদি দিবি, তাহলে আর এত কষ্ট করে ছবি বানানোর দরকার কী!‌ তাবড় তাবড় পেশাদারদের ভাবনাচিন্তাতেও লকডাউন হল নাকি?‌ নাকি তাঁরা ভাবলেন, এখন পাঁচ পাবলিক সবই গিলে নেবে?‌ অবশ্য নিচ্ছেও।বলিহারি যাই।

তথ্য:‌ ইতিমধ্যে আমেরিকায় মৃতের সংখ্যা ১০,০০০ ছাড়িয়েছে। সারা পৃথিবীতে ৭০,০০০। পাখির মতো মানুষ মরছে বিশ্বজুড়ে। উদ্বেগের হল, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সঙ্কটজনক। তাঁকে আইসিসিইউ–তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। জাপান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে চলেছে বা ঘোষণা করে দিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া আগামী সপ্তাহে লকডাউন খানিকটা শিথিল করতে পারে। কেনিয়া তাদের রাজধানী নাইরোবিতে এবং নাইরোবি থেকে অন্যত্র সড়ক, রেল এবং আকাশযাত্রা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

এর শেষ কোথায়?‌ কবে?‌ জানালার বাইরে ঝকঝক করছে সূর্য। কিন্তু এগুলো ভাবলে এই সকালেই ঘোর অন্ধকার করে আসছে।

সকাল ৮.‌৩৯

ইদানীং একটা কথা খুব মনে হয়। এই সময়টা অধিকাংশ মানুষকে অনেক বেশি অনেক বেশি লিন, ট্রিম অ্যান্ড মিন করে দেবে। বাড়তি কোনও মেদ, কোনও খাদ, অতিরিক্ত কোনওকিছু থাকবে না জীবনে। আগে একদিন এই ডায়েরিতে লিখেছিলাম যে, করোনা আমাদের মিনিম্যালিস্ট জীবন বাঁচাতে শেখাবে। আজকাল মনে হয় মিনিম্যালিস্ট নয়, আসল জীবন বাঁচতে শেখাবে। পৃথিবী তার নিজস্ব শর্তে আমাদের বাঁচিয়ে রাখবে। বাঁচিয়ে নেবে। সেটাই হবে বাঁচার মতো বাঁচা। নিজের ভিতরে তাকিয়ে দেখবে মানুষ। কিন্তু তার জন্য আরও রগড়ানি দরকার হবে। বোধিজ্ঞান তো আর একুশ দিনের লকডাউনে লাভ করা যায় না। তার জন্য আরও তপস্যা প্রয়োজন। অর্থাৎ, আরও লকডাউন!‌

সকাল ৯.‌১৭

নাম না–জানা একটা পাখি এসেছে বারান্দায়। খয়েরি রং। ঠোঁট আর লেজের কাছে উজ্জ্বল কমলা। বারবার ভিতরে ঢুকতে চাইছে আর দরজার বিশাল কাচে ধাক্কা খাচ্ছে। কিন্তু হাল ছাড়ছে না। কাক, চড়ুই এবং পায়রা ছাড়া কোনও পাখি চিনি না। সায়ন দেখলে নির্ঘাত চিনতে পারত। ও পাখি দেখে বেড়ায়। বার্ড ওয়াচার। সায়ন ত্রিপাঠির আগে আমি মাত্র একজন বার্ড ওয়াচারের নাম শুনেছিলাম— সালিম আলি।

পাশের বাড়ির আমগাছে নধর সব আম হয়েছে। ইচ্ছে করলেই হাত বাড়িয়ে ছিঁড়ে আনা যায়। কিন্তু কী লাভ এনে?‌ থাক গাছে। ভাল লাগছে দেখতে। বন্যের বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে, গাছের আম গাছে। এবং অচিন পাখি খাঁচার বাইরে।

বেলা ১১.‌৩৬

গাড়ি ধুলাম। নতুন একটা টেকনিক আবিষ্কার করেছি। সেটা অবশ্য বড় জায়গা না পেলে সম্ভব নয়। এখানে গাড়িটা উদোম রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকে বলে করতে পারলাম। চেতলার বাড়ির পার্কিংয়ে করতে গেলে নিশ্চয়ই মার খেতাম। প্রথমেই বালতি বালতি জল ঢেলে গাড়িটাকে আগাপাশতলা স্নান করিয়ে দিলাম। তারপর লাল শালু দিয়ে মুছে দিলাম। বাচ্চা স্নান করানোর মতো। সমস্যা হল, কিটকিটে রোদে গাড়ির গায়ে জল পড়তে না পড়তেই শুকিয়ে যাচ্ছে। তবে সেটা ম্যানেজেব্‌ল। যতদিন এখানে আছি, এটাই করব।

দুপুর ১২.‌৪৪

আজ মায়ের পেনশন তোলার একটা চান্স নিতে হবে। উল্টোডাঙার এলাহাবাদ ব্যাঙ্কে প্রতি মাসে যাই পেনশন তুলতে। তবে এই মাসটা আলাদা। দেখা যাক।

ওহ্‌, লিখতে ভুলে গিয়েছিলাম, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠক সবে শেষ হল। লকডাউন নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি। স্বাভাবিক। ভারতে ‘হটস্পট’ ক্রমশ বাড়ছে। রিপোর্টারের ‘গাট ফিলিং’ বলছে, লকডাউনের মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনাই বেশি। এবং আমার এই ‘গাট’ এখনও পর্যন্ত আমাকে কখনও ঝোলায়নি। পেশাগত ক্ষেত্রে হোক বা ব্যক্তিগত।

দুপুর ১.‌০৪

ট্রাম্প স্রেফ হুমকি দিয়ে ভারত থেকে আমেরিকায় হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন আমদানি করিয়ে নিল!‌ ভারত প্রথমে দেবে না বলেছিল। তারপর ‘দেখে নেব’ মোডে সরাসরি হুমকি আসে মার্কিন প্রেসিডেন্টের তরফে। তাতে কাজ হয়েছে। ধমকে কাজ হয়। বরাবর।

দুপুর ৩.‌২৭

এইমাত্র অফিসে ঢুকলাম। আসার আগের সময়টা ঘটনাবহুল। একে একে লিখি। মায়ের পেনশন তুলেছি। বিনা ভিড়ে। কার্যত বিনা লাইনে। মেজাজে গিয়ে রাজার মতো উল্টোডাঙার ক্যাপিটাল ইলেকট্রনিক্সের কাছে রাস্তার উপর গাড়ি রাখলাম। ঢুকে দেখলাম, চারদিক খাঁ–খাঁ। কর্মীরা বসে কাজ করছেন। কিন্তু গ্রাহক নেই। প্রশ্ন করায় বললেন, রোজ ১০টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত ব্যাঙ্ক খোলা থাকছে। সাধারণ সময়ের মতোই। বছরের প্রত্যেক মাসে এই সময়টায় ভিতরে একটা আস্ত জনসভার মতো ভিড় থাকে। চারদিকে কাঁউমাউ চিৎকার। আজ মৃত্যুপুরীর মতো লাগছিল। গুনে দেখলাম, আমায় নিয়ে চারজন গ্রাহক। প্রায়ই লিঙ্ক ফেল করছিল বলে খানিকক্ষণ দাঁড়াতে হল। কিন্তু মসৃণভাবে পেনশনটা তুলে ফেলা গেল। ব্যাঙ্ক থেকে বেরোতে বেরোতে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্বার্থপরের মতো মনে হচ্ছিল, লকডাউনটা পরের মাসেও চলুক না হয়। এমন বিনা আয়াসে এসে পেনশন তুলে নিয়ে যাব। ক্ষতি কী?‌ প্রত্যেক মাসের প্রথমে যে আতঙ্ক আর ব্যাঙ্ক–বিকর্ষণটা হয়, সেটা তো হবে না। তারপরেই মনে হল, ছি–ছি! ‌এসব কী ভাবছি। কত বয়স্ক মানুষকে দেখি প্রতি মাসে। লাঠি ঠুকে ঠুকে আসেন অবসরজীবনের প্রাপ্য অর্থটা নিয়ে মাস চালাতে। তাঁরা এখন কী করছেন কে জানে!‌ আর আমি আছি নিজের তালে। ছোঃ!‌ স্বার্থপরতারও একটা লিমিট থাকে।

ব্যাঙ্ক থেকে নির্জন রাজপথ ধরে সটান চেতলা। লবঙ্গদের বহুদিন দেখিনি। গরমে কাহিল বেচারারা। পৌঁছে দেখলাম, চেতলা গার্লস স্কুলের সামনে বিশাল ট্রাক দাঁড়িয়ে। সামনে ব্যানার ‘রিলিফ মেটিরিয়াল, রিলায়েন্স’। বোঝা গেল, মুকেশ আম্বানী ত্রাণবন্টনে নেমে পড়েছেন। বাচ্চাগুলোর সঙ্গে খানিক খেলাধুলো করে, কাছের গ্রসারি শপের অজিতকে ‘হাই’ বলে অফিসে রওনা হলাম। পৌঁছে দেখলাম, চাকরি আছে এবং আমার দাঁত প্রায় হাতির দাঁতের মতো মহার্ঘ হয়ে উঠেছে। সহকর্মীরা আশ্বস্ত যে, কিঞ্চিৎ ফোলা গাল এবং ক’দিনের বাসি দাড়ি ছাড়া দন্তশূল আমার মধ্যে বিশেষ পরিবর্তন আনতে পারেনি।

বিকেল ৪.‌১০

অশোক’দার সঙ্গে দেখা হল এডিট মিটিংয়ে। চিন্তিত। সকলেই চিন্তিত।

বিকেল ৫.‌১৪

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে নবান্ন থেকে মুখ্যমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স। মুখ্যমন্ত্রী জানালেন, কাল থেকে ফুলবাজার চালু হচ্ছে। পাশাপাশিই জানালেন, রাজ্যের ৭টি জায়গা ‘হটস্পট’। সেগুলো কী, জানালেন না। ঠিকই করলেন। আতঙ্ক এবং সেই আতঙ্ক–জনিত স্টুপিডিটি যে হারে বাড়ছে, তাতে ওই ৭টি এলাকার মানুষের ধোপা–নাপিত অবিলম্বে বন্ধ হয়ে যেত। অভিজিৎ মুখ্যমন্ত্রীকে বললেন, ‘আপনি যেভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, তাতে তো আপনার শরীর নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।’ আর বললেন, ওই ৭টি এলাকায় র‌্যাপিড টেস্টিং এবং স্যানিটাইজিং করাতে। জানা গেল, এভাবেই ভিডিও কনফারেন্স হতে থাকবে।

বামপন্থী নেতাদের সঙ্গেও আজ নবান্নে বৈঠক হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, মনোজ ভট্টাচার্যরা ছিলেন। ফিশফ্রাই ছিল কিনা জানা হল না।

সন্ধ্যা ৬.‌৫৩

বলিউডের ছুটকো অভিনেতা, লন্ডনবাসী পূরব কোহলি সপরিবার করোনা–আক্রান্ত। সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ পোস্ট করেছেন। সেটা জানলাম ভাস্বতীর ওয়াল থেকে।

সন্ধ্যা ৭.‌৩০

ভারতে এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত ৪,৩৯২ জন। সবচেয়ে বেশি মহারাষ্ট্রে— ৮৬৮। মৃত ১৩৭ জন।

রাত ৮.‌২৭

ইন্দ্রনীলের ফোসবুক পোস্ট থেকে জানলাম, করোনা পরিস্থিতিতে আর্থির ক্ষতির মোকাবিলায় বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ৫০ লাখ টাকা তুলবে টেকনিশিয়ানদের জন্য। করোনাভাইরাস নিয়ে শর্ট ফিল্ম তৈরি হবে। ছবির সঙ্গে জড়িতদের লাইন আপ খুবই ইন্টারেস্টিং লাগল। রেকর্ডের খাতিরে এই ডায়েরিতে নথিভুক্ত থাকুক। যদি ভাবীকালের কাজে লাগে।
কনসেপ্ট:‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ডিরেক্টর:‌ অরিন্দম শীল
স্ক্রিপ্ট:‌ পদ্মনাভ দাশগুপ্ত ও অরিন্দম শীল
সং লিরিক্‌স:‌ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
কম্পোজ্‌ড বাই:‌ কবীর সুমন
মিউজিক:‌ বিক্রম ঘোষ
এডিট:‌ সংলাপ ভৌমিক
প্রোডিউসড বাই:‌ ক্যামেলিয়া
সাপোর্টেড বাই:‌ স্বরূপ বিশ্বাস, প্রেসিডেন্ট ফেডারেশন

রাত ৯.‌২৯

আকাশ জুড়ে থালার মতো পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে। জ্যোতির্বিজ্ঞান বলছে, আজ সন্ধ্যা থেকে কাল সকাল পর্যন্ত আকাশে থাকবে এই চাঁদ। এমনিতে পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব থাকে ৩,৮৪,৪০০ কিলোমিটার। আজ সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৩,০৫,০৩৪ কিলোমিটার। হবে হয়ত। এসব জটিল অঙ্কের কারণেই সায়েন্স পড়ায় ইতি দিয়েছিলাম সেই উচ্চমাধ্যমিকের পর।

সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখলাম, ঘরবন্দি রোমান্টিকরা বলছেন ‘পিঙ্ক মুন’। অফিসের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সাহিত্যের অকিঞ্চিৎকর ছাত্রের মনে হল ‘ঝলসানো রুটি’।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s