লকডাউন ডায়েরি – ৪ এপ্রিল, ২০২০

০৪.০৪.২০২০।শনিবার 

সকাল ৯.৫৭ 

আজ অনেক ভোরে ঘুম ভেঙেছে। অ্যালার্ম ছাড়াই। দাঁতের যন্ত্রণায়। কাল রাতে ব্যথার চোটে অফিস থেকে তাড়াতাড়ি চলে এসেছিলাম। তারপর রাতে জোরালো ব্যথাহরা ট্যাবলেট খেয়ে শুয়ে পড়েছি। আজ সকালে সেই ব্যথাটাই ফিরে এসে আবার টেনে তুলল ঘুম থেকে। 

মাথা ভোঁ-ভোঁ করছিল। আয়নায় দেখলাম, ডান গাল ফুলে রাবণের মা ! দ্রুত বাবা-মাকে চা দিয়ে নিজে চা-বিস্কুট খেয়ে আরেকটা অ্যান্টিবায়োটিক এবং পেনকিলারের প্রলেপ দিলাম। এইসব পেনকিলারে বোধহয় সেডেটিভ থাকে। ফলে আবার ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এই উঠেছি। 

সকাল ১০.১৪ 

মহিলাদের আন্ডার সেভেন্টিন ওয়ার্ল্ড কাপ ফুটবল ভারতে হওয়ার কথা ছিল। স্থগিত হয়ে গেল। বিবৃতি দিল ফিফা। 

সকাল ১০.১৬ 

টুইটারে দেখছি ক্রিস এভার্ট  বলেছে, ‘আমি আর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাংবাদিক বৈঠক দেখব বাঁ শুনব না। ঠিকঠাক প্রশ্ন করলেই লোকটা যেমন রুঢ়ভাবে জবাব দেয়, তাতে ঘেন্নায় আমার শরীর কুঁকড়ে যায়।’ কিন্তু যুগে যুগে, কালে কালে কী এটাই হয়ে আসেনি? বা আসছে না ?

সকাল ১০.৩৯

টিভি বলছে এক মার্কিন সংস্থা নাকি সমীক্ষা করে বলেছে, ভারতের যা জনঘনত্ব তাতে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লকডাউন থাকা উচিত। এটা কি সত্যি? এখন তো সবে এপ্রিলের শুরু ! এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ? ৬ মাস ? 

বেলা ১১.০৩ 

পাওয়ার গ্রিডের একটা অফিশিয়াল নির্দেশ ফেসবুকে আপলোড করেছে প্রদীপ্ত। যাতে আঞ্চলিক গ্রিডগুলোকে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ মেনে রবিবার রাত ৯টায় সারা দেশ আলো নেভালে তখন বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় শূন্য হয়ে যেতে পারে। আবার যখন ৯ মিনিট পর যখন গোটা দেশে ঝপ ঝপ করে আলো জ্বলবে তখন আবার দুম করে এক ধাক্কায় ভোল্টেজ বেড়ে যাবে। তাতে গ্রিডের ক্ষতি হতে পারে। সেজন্য সমস্ত আঞ্চলিক গ্রিড যেন সতর্ক থাকে। বোঝো কাণ্ড ! এ তো নতুন ফ্যাকড়া দেখা দিল। 

এক ভদ্রমহিলা দেখলাম লিখেছেন, ‘এই জন্যই শিক্ষিত লোকেদের মন্ত্রিত্বে আনা উচিত’ । 

বেলা ১১.২৮

বিভিন্ন চ্যানেলে ডাক্তারদের কাছে প্রেগন্যান্ট মায়েরা আকুল হয়ে জানতে চাইছেন, তাঁরা কী করবেন। অনাগত সন্তানের কি কোনও বিপদ হতে পারে ? কেউ জানতে চাইছেন, ভ্যাক্সিন ডিউ আছে পরের সপ্তাহে। কী করবেন ? এখন দেওয়াবেন না লকডাউন খুললে ? শুনতে শুনতে এত কষ্ট হচ্ছিল!

দুপুর ১২.১০

রাবণের মা এখন একটি পুরুষ্টু গলকম্বলে পরিণত হয়েছে। তাই নিয়েই কোনওমতে আগামী কয়েকদিনের জন্য ডাল ভাত সেদ্ধ করে রাখলাম।

পেশাগত সহকর্মীরাও লকডাউন নিয়ে লিখছে দেখে ভালো লাগছে। বিতনুর পোর্টালে লিখেছে মৌপিয়া। কাল লেখাটা পাঠিয়েছিল মতামত জানতে চেয়ে। বললাম, চমৎকার হয়েছে। যেন চালিয়ে যায়। কিংশুকও রোজ লিখছে ফেসবুকে। বেশ ভালো লিখছে। ঠিকই  করছে। এই সময়টার একটা দলিল থাকা প্রয়োজন।

দুপুর ১২.২৫

সৌরভ আজ ইস্কনে গেল চাল দিতে। প্যাকেটের ওপরে একটা লেবেলে লেখা ‘সৌরভ গাঙ্গুলি ফাউন্ডেশন ইন অ্যাসোসিয়েশন উইথ ইস্কন’।

দুপুর ১.০৫

আজ লাঞ্চের মেনু দুধ-কর্নফ্লেক্স, অ্যান্টিবায়োটিক, পেনকিলার। তার আগে ফিনাইল সহযোগে একতলা মোছন এবং দোতলা ঝাঁটন। অশোক’দাকে টেক্সট পাঠিয়ে আজ অফিস থেকে ছুটি নিলাম। পাঁচ মিনিটে জবাব এল , ‘গেট ওয়েল বাবা’ ।

দুপুর ৩.৩২ 

হ্যারিসন ফোর্ড আর ব্র্যাড পিটের ‘দা ডেভিল’স ওন’ দেখতে  দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অদ্ভুত দুটো স্বপ্ন দেখলাম। প্রথমটা লবঙ্গকে নিয়ে। ঘুমনোর সময়ে লবঙ্গ সাধারণত আমার পায়ের তলায় বালিশের কাজ করে। স্বপ্নে দেখলাম, লবঙ্গ সল্টলেকের বাড়িতে চলে এসেছে। জিজ্ঞাসা করলাম, কী রে লবং, হঠাৎ চলে এলি ? লবঙ্গ পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, ‘তোমার পা-বালিশ না হলে আমার ঘুম হচ্ছে না।’ তারপর আমরা দুজনে দুজনের গলা জড়িয়ে খুব হ্যা-হ্যা করে হাসলাম আর আমি ওকে বললাম, তুই চেতলা থেকে সল্টলেক চলে এলি একা একা? তুই তো আর ন্যাকা নেই। বেশ স্মার্ট হয়ে গেছিস দেখছি ? এবার তোকে ইশকুলে দিতেই হবে। 

পরের স্বপ্নটা ভয়ের। অ্যাক্সিস ব্যাঙ্কের এটিএম থেকে টাকা তুলে বেরিয়ে দেখি বাইরের ফুটপাথে উলোঝুলো চেহারার একটা লোক বসে আছে। বিনা ভূমিকায় আমাকে সে বলল , ‘টাকা তুলেছিস?’ আমি অবাক হয়ে মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ বললাম। লোকটা বলল, ‘এবার ভাত দে হারামজাদা !’ 

ধড়মড় করে ঘুম ভাঙল। দেখলাম মাথার ঘামে বালিশ ভিজে গেছে। 

বিকেল ৪.১০ 

ফেসবুকে চমৎকার লিখেছে অগ্নি। ‘লকডাউন লাগাতার চললে আমাদের দেশ ভেতর থেকে ফেটে যাবে। মন্বন্তর তো ফিরবেই, সঙ্গে আরও অনেককিছু। স্রেফ না খেতে পেয়ে শব হয়ে যাওয়ার সংখ্যা, করোনায় মৃতের সংখ্যার চেয়ে বেশি না হোক , কম হবে না।’ 

আর মিঠু লিখেছে, আমরা যারা মধ্যবিত্ত, বিশেষ করে নিম্ন মধ্যবিত্ত, যারা সরকারি চাকরি নয়, বেসরকারি চাকরি বা ব্যবসা করে সংসার চালান, ভেবে দেখেছেন, দু’মাস পরে কীভাবে চলবে? গরিবদের সরকার আর অনেক সংস্থা দিচ্ছে। কিন্তু মধ্যবিত্তদের কে দেবে? তাঁরা তো ক্লাবে গিয়ে লাইন দিতেও পারবে না। দোকান বাজার খোলা থাকবে কিন্তু টাকা থাকবে তো ? জীবাণুতে মরব না, মরব পেটের জ্বালায়। 

সন্ধে ৭.৩৯ 

খুব জরুরি কথা বলল অদ্রিজা, ‘ইমিউনিটি বাড়িয়ে রাখো। কারণ কখনও না কখনও আমরা যে কেউ ইনফেক্টেড হতে পারি। ইমিউনিটি ভাল থাকলে উতরে যেতে পারি।’ 

সন্ধে ৮.৩৮ 

সারা বিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা এক মিলিয়ন ছাড়াল। মৃত ৫৭,০০০। সংখ্যা গুলো যত সহজে লিখি ততটা জোরেই কি ভিতরে গিয়ে ধাক্কা মারে ? আসলে কী নিয়ে চিন্তা হয় ? বেঁচে থাকা নিয়ে নাকি ভবিষ্যতে না-মানুষের মতো বাঁচা নিয়ে? 

রাত ৯.২১  

গলকম্বল এবং ব্যথাটা কালও সারবে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু পেনকিলার খেতে ভয় লাগছে। ট্যাবলেটের ভিতরের সেডেটিভ ঘুম পাড়িয়ে দিলে আবার যদি ওই লোকটা ফিরে এসে বলে, ‘ভাত দে হারামজাদা!’   

2 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ৪ এপ্রিল, ২০২০

  1. Lobongo ke giye dekhe asun. Aar moner kone oi lok gulo ke niye duschinta aar kichhu na korte parar asohayota thekei oram sopno dekhechhen. Dream lab bidesh e achhe “Misir Ali” r kono golpo te porechhilam. Get well soon Anindya.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s