লকডাউন ডায়েরি – ৩ এপ্রিল, ২০২০

০৩.‌০৪.‌২০২০‌। শুক্রবার

সকাল ৮.‌৫৬

রাত ৩টেয় ঘুম ভেঙে গেল। প্রবল দন্তশূল। এটা আমার প্রতি সিজ্‌নে হয়। গরমকালে এসি চালালে কান দিয়ে ঠাণ্ডা ঢুকে পড়ে। তারপর শুরু হয় বাবারে–মা’রে দাঁতের ব্যথা। তফাত হল, অন্যান্য সিজ্‌নে লকডাউন থাকে না। কাল সন্ধ্যা থেকেই ব্যথাটা শুরু হয়েছিল। মাথা ঝনঝন করছিল ব্যথার চোটে। এতটাই যে, রাতে ফেরার সময় ড্রাইভওয়েতে গাড়ি ঢোকাতে গিয়ে বিশ্রি লম্বা কিছু স্ক্র্যাচ পড়ল। তুলকালাম অবস্থা। পেনকিলার ছাড়া উপায় ছিল না। একটু ব্যথা কমায় একটা স্কাল ক্যাপ পরে ঘুমোতে গেলাম। কিন্তু তাতে কোনও লাভ হল না। গভীর রাতে সেই মারুনে ব্যথাটা আবার শুরু হল। আবার পেনকিলার।

পেনকিলারটা খেয়ে ভোরের দিকে একটু ঘুম এসেছিল। অ্যালার্ম বাজায় উঠে পড়েছি। ৯টায় মোদির বার্তা।

তার ফাঁকে আমার দীর্ঘদিনের ডেন্টিস্ট সমিতকে ফোনে ধরলাম। ছোটবেলা থেকে চিনি। আগে ওর বাবার পেশেন্ট ছিলাম। এখন ওর। চমৎকার হাত। আমার দাঁত সম্পর্কে সব জানে। শুনেই বলল, অ্যান্টিবায়োটিক চালু করে দাও। তিনটে করে সাতদিন। ব্যথা হলে পেনকিলার খেও। আর জানাল, সব হাসপাতালের আউটডোর বন্ধ। ফলে কাজে যাওয়া হচ্ছে না। খুব ইমার্জেন্সি কেস, মানে মুখ–টুখ ফুলে গিয়েছে এমন হলে বাড়ির কাছের চেম্বারের তালা খুলে এককালীন ট্রিটমেন্ট করছে।

সকাল ৯.‌১১

আগামী ৫ এপ্রিল, রবিবার রাত ৯টায় ঘরের আলো বন্ধ করে বাড়ির ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে মোমবাতি,প্রদীপ, টর্চ বা মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালাতে হবে। সেটাতেই নাকি সারা দেশের প্রকাশের মহাশক্তি ধরা দেবে। যা বলবে, করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেউ একলা নয়। সারা দেশ জোটবদ্ধ। এই হল প্রধানমন্ত্রীর ৯ মিনিটের ভিডিও বার্তার বক্তব্য। সঙ্গে অনুরোধ, ‘কেউ কিন্তু রাস্তায় বেরিয়ে মোমবাতি মিছিল করবেন না।’ স্বাভাবিক। জনতা কার্ফুর বিকেলে থালা বাজাতে বাজাতে দেশ জুড়ে রসক্ষ্যাপার দল রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিল তো।

ব্যাডমিন্টনের হোযাট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে রাজু ব্যাখ্যা দিল, ‘পিএম বক্তৃতা শুরু করলেন ৯টায়। বললেন ৯ মিনিট। যে তারিখের কথা বললেন, সেটা ৫ এপ্রিল (‌বছরের চতুর্থ মাস)‌ অর্থাৎ, ৫+‌৪=‌৯, রাত ৯টার সময় ৯ মিনিটের জন্য টাস্ক দিলেন, আজ লকডাউনের নবম দিন, ৫ এপ্রিল লকডাউনের ৯ দিন বাকি থাকবে। ৯ নম্বরটা হল বুধের। যা হল আলোক এবং অগ্নির গ্রহ। অর্থাৎ, প্রধানমন্ত্রী গ্রহের এনার্জিকে জাগ্রত করছেন। পাশাপাশিই উনি প্রাণ বাঁচানোর জন্য নবগ্রহকে সন্তুষ্ট করছেন।’

ওহ্‌, তাই এত ৯–এর ছড়াছড়ি!‌ টেরিফিক!‌ ভুলেই যাচ্ছিলাম যে এটা ২০২০ সাল।

টুইটার বলছে, গতকাল আমেরিকায় একদিনে সর্বাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ১,১৬৯ জন। স্পেনে মৃত্যু ছাড়িয়েছে ১০,০০০। ইতালিতে মৃত ১৩,৯১৫। সারা পৃথিবীতে মারা গিয়েছেন ৫৩ হাজারের বেশি মানুষ। আপাতত। ডোনাল্ড ট্রাম্পদের ঝুলিতে তো আর নবগ্রহ নেই।

ভারতে আপাতত মৃত ৫৬ জন। আক্রান্ত আড়াই হাজার। গত ২৪ ঘন্টায় ২৩৪ জনের শরীরে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। টিভি–তে দেখে মোদির চেহারাটা একটু ঝটকেছে মনে হল। বডি ল্যাঙ্গোয়েজে সেই দার্ঢ্য আর রোয়াবটা নেই। একটু চিন্তিতই লাগছিল। তবে কংগ্রেসের এক্স এমএলএ মিঠু’দা (‌ডি পি রায়)‌ ফোন করে বলল, ‘মোদি গোটা দেশটাকে কীভাবে বোকা বানিয়ে দিয়েছে দেখেছো?‌ কেউ আর লড়াই করে না। ভোগবাদের এমন বড়ি খাইয়েছে, গোটা দেশটা স্টেরিলাইজ্‌ড হয়ে গিয়েছে। ও যা করতে বলছে, লোকে সেটাই করছে। টর্চও জ্বালাবে!‌’

পেনকিলারের এফেক্ট আবার কমে আসছে। ব্যথাটা আবার ঝিলিক দিচ্ছে মাঝেমাঝে। এটা একটা বাড়তি ঝামেলা হয়ে দাঁড়াল!‌

৯.‌৩৩

বিশ্বব্যাঙ্ক করোনা মোকাবিলায় ভারতকে ১ বিলিয়ন ডলার অর্থসাহায্য করবে। এত বড়মাপের অর্থসাহায্য ভারতকে এর আগে কখনও করেনি বিশ্বব্যাঙ্ক। এই অর্থ দেশের সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ব্যয় করা হবে। ভারত ছাড়াও আরও বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশকেও সাহায্য করছে বিশ্বব্যাঙ্ক।কিন্তু এটা সাহায্য না ঋণ ? সারা পৃথিবীতে মোট ২০৪টি দেশ করোনায় আক্রান্ত। ‘প্রভাবিত’ নয়। ‘আক্রান্ত’।

বেলা ১১.‌২৩

শচীন, সৌরভ, বিরাটদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বললেন মোদি। করোনা মোকাবিলায় পরামর্শ চাইলেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারও করতে বললেন। টিভি–তে সৌরভ বলছিল, মোট ৪০ জন ক্রীড়াবিদ ছিল কনফারেন্সে। তাদের মধ্যে আটজনের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। শচীন নাকি মোদিকে বলেছে, ‘আপনি আমায় ৪ নম্বরে বলতে ডাকলেন। ইন্ডিয়ার হয়ে খেলার সময় আমি ৪ নম্বরে ব্যাট করতে নামতাম। এই ম্যাচটাও আমরা দেশের হয়ে জিতব।’ বেশ।

দুপুর ১২.‌৩৫

গতকাল ফেসবুকের ওয়ালে একজন লিখেছিলেন, ‘বাবা–কে খেতে দেওয়ার ব্যাপারটা দেখলাম না। বাকিটা আনপুটডাউনেব্‌ল।’ তাঁকে জবাব দিয়েছিলাম, মেনুটা খুব বোরিং। তাছাড়া, কর্তব্যকে গ্লোরিফাই করাটা লজ্জার। কিন্তু তা–ও রেকর্ডে থাক যে, আজ বাবা–মা’কে খেতে দিয়েছি। বাসনও মেজে দিয়েছি। দাঁতে প্রবল ব্যথা নিয়েও নীচের ঘরটা মুছলাম।

দুপুর ৩.‌০৮

উপরে এসে রবার্ট ডি‘নিরোর ‘দ্য স্কোর’ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। উঠে দেখছি, শুভব্রত মেসেঞ্জারে লিখেছে, ময়দানের ঘোড়াটা ব্যাপারটা মানেকা গান্ধী পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছে। তিনি আবার পশ্চিমবঙ্গের চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলেছেন। যিনি মানেকাকে বলেছেন, স্থানীয় কাউন্সিলার ঘোড়াদের খাবারের টাকাটা দিতে পারেন। ময়দানে বেওয়ারিশ ঘুরতে–থাকা ঘোড়াগুলো যাতে অসহায় মৃত্যু না হয় তার একটা ব্যবস্থা হবে। ‘পিপ্‌ল ফর অ্যানিম্যাল্‌স’–এর অজয় দাগা ওদের খাবার দিতে শুরু করেছেন। লোকাল কাউন্সিলার জলের ব্যবস্থা করছেন। ব্রিটিশ কাউন্সিলও খাবার দিচ্ছে।

দেখে আশ্বস্ত হলাম। আরও আশ্বস্ত হলাম এটা দেখে যে, এখনও লিখে কিছু কাজ হয়!‌ এই পেশায় বেশিদিন থাকলে এমনিতেই লোকে সিনিক হয়ে যায়।

বিকেল ৫.‌০২

করোনা নিয়ে চিন্তার কারণ নেই। বলে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে পাশাপাশিই বললেন, সতর্ক থাকতে হবে। আজ তিনি যা পরিসংখ্যান দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী রাজ্যে মৃতের সংখ্যা বাড়েনি। এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত ৩৮ জন। করোনা থেকে মুক্ত হয়েছেন ১২ জন। আজই আরও ৯ জন সুস্থ হয়েছেন। সরকারি কোয়ারেন্টিন থেকে ছাড়া হয়েছে ৩,২১৮ জনকে। এখনও সরকারি কোয়ারেন্টিনে আছেন ১,৮৯২ জন।

বিকেল ৫.‌৩১

করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কারের দাবি পিট্‌সবার্গ স্কুল অফ মেডিসিনের। তাদের দাবি, ইঁদুরের উপর প্রয়োগ করে সাফল্য পাওয়া গিয়েছে। এখন মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ বিভাগের অনুমোদন পাওয়ার অপেক্ষা। যা শুনে টিভি–তে চিকিৎসক কুণাল সরকার বললেন, ‘খবরটা খুবই ভাল। পৃথিবীর ১৮–২০ টা ইনস্টিটিউট করোনার অ্যান্টিবডি তৈরির ভ্যাকসিন আবিষ্কারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ভারতেও একটা ইনস্টিটিউট করছে। তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়া পার হয়ে সেটা বাজারে আসতে আসতে ১৮ মাস থেকে দু–বছর সময় লেগে যায়।’

সন্ধ্যা ৬.‌৩৫

বালা সুব্রহ্মণ্যম লোগেশ। লকডাউনে হাঁটার বলি। বয়স মাত্র ২২ বছর। মহারাষ্ট্রের ওয়ার্ধায় পড়াশোনা করছিলেন। লকডাউনের পর বন্ধুদের সঙ্গে হেঁটে তামিলনাড়ুর বাড়িতে রওনা দিয়েছিলেন। খানিকটা ট্রাকে, বাকিটা হেঁটে বোয়েনপল্লিতে পৌঁছনোর পর পুলিশ আটকে মাইগ্র্যান্ট শ্রমিকদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। খাবারও দেওয়া হয়। সেখানেই বুধবার মাঝরাতে হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় লোগেশের। পোস্টমর্টেমের পর ডাক্তাররা বলেছেন, লোকেশের হার্ট হাঁটার ধকল নিতে পারেনি।চোখে জল এল।

রাত ৮.‌২৪

এবার রাজ্যসভার নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে গেল। অবশ্য এটা যে কেন এতদিন পিছোয়নি, সেটাই রহস্য!‌

রাত ৮.‌৩৯

টুইটারে একটা কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখলাম।

— আশা করি, লকডাউনে তুমি এবং তোমার পরিবার ঠিকঠাক আছো। আমি আবার বলছি, এ মাসের বাড়িভাড়াটা তুমি এখন না দিলেও চলবে। পরে তোমার সুবিধেমতো দিও। এখন টাকাটা জমিয়ে রাখো তোমার অন্য প্রয়োজনীয় জিনিস যা যা কিনতে হবে তার জন্য।
— থ্যাঙ্ক ইউ ফর বিয়িং কাইন্ড। আসলে আমি তিনমাসের ভাড়া রেডি রাখি। তাই ভাড়ার টাকাটা আমার কাছে আছে। থ্যাঙ্ক ইউ ওয়ান্‌স এগেন ফর দ্য অফার।
— নেহা, প্লিজ ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ। এটা আমার অফার নয়। এটা আমার রিকোয়েস্ট। অনুরোধ।

চোখে জল চলে এল।আবার।

5 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ৩ এপ্রিল, ২০২০

  1. Apni ek odvut manush Anindya. Please Amar comment ta public korben na. Just wanted to say u in person, j apner lekha te Logesh er incident ta pore chokhe jol o elo, Abar last paragraph ta janan dilo… J monushotyo ekhono beche ache. Maane kothao ekta churanto bastob ta ke dekhanor pasei abar chokher jol mochhanor khomota tao rakhen.

    Like

  2. সত্যিই অসাধারণ আপনার দিনপঞ্জি / প্রতিদিন পড়ছি এবং মুগ্ধ হচ্ছি/

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s