লকডাউন ডায়েরি – ২৭ মার্চ, ২০২০

‌২৭.‌০৩.‌২০২০। শুক্রবার

সকাল ৯.‌১৩

খানিকক্ষণ আগে ঘুম ভাঙল। ‌বাইরে কটকটে রোদ। সামনের দক্ষিণখোলা রাস্তায় গাড়িটা রোদে ভাজা ভাজা হচ্ছে। প্রতিদিন দুপুরে যখন বেরোই, বাকেলাইটের স্টিয়ারিংয়ের উপর চড়ানো চামড়ার কভারও আগুনের মতো গরম হয়ে থাকে। হাত দিলে ছ্যাঁকা লাগে। কিন্তু এখন আর ওসব মনে হয় না। বরং মনে হয়, কারা যেন বলেছিল, গরমে কোভিড–১৯ মরে যায়?‌ ভাবতে ভাবতেই মনে হল, জীবনের সমস্ত চিন্তাভাবনা কীভাবে করোনা–কেন্দ্রিক হয়ে গেল!‌ সকাল থেকে রাত আবার রাত থেকে সকাল— করোনা ভাইরাস খেয়ে নিল। যাকগে, আপাতত চা বানাই। তারপর কাল রাতের বাসন মাজতে হবে। ভিজিয়ে রাখা জামাকাপড় কাচতে হবে। ঘর ডাস্টিং করতে হবে। প্রচুর কাজ আছে।

বেলা ১১.‌৩০

খাওয়া হল না। বাড়িতে চাল–ডাল আছে। কিন্তু সেগুলো বাবা–মায়ের জন্য রেখেছি। নিজে গত কয়েকদিন ব্রেকফাস্টে বিস্কুট আর লাঞ্চ–ডিনারে ম্যাগির উপর ছিলাম। যদিও প্রচেত’দা আর রাজীব কাল বলছিল, বিস্কুট বেশি খাওয়া ভাল নয়। প্রচুর গ্লুটেন যায় বডিতে। ডায়েট চার্ট মেনে চলার সময় আমিও নিউট্রিশনিস্টের পরামর্শে বিস্কুট ত্যাগ করেছিলাম। কিন্তু এখন তো আপৎকালীন সময়!‌ বিস্কুট, ম্যাগি সব চলবে। কিন্তু ভুলে গিয়েছিলাম, কাল রাতে ম্যাগির লাস্ট প্যাকেটটা খেয়ে ফেলেছি!‌ ঠিক আছে। অফিস যাওয়ার পথে জিডি মার্কেট থেকে কিনে নিলেই হবে। আপাতত থিন অ্যারারুট জিন্দাবাদ!‌

‌দুপুর ১২.‌১০

ম্যাগি কেনা হল না!‌ অফিসে আসার পথে জিডি মার্কেটে গিয়েছিলাম। চমৎকার বন্দোবস্ত। মাত্র একটাই গেট খোলা। সেখানে লাইন পড়েছে। বাইরে দেখলাম একটা সাদা ‘জিপ কম্পাস’ দাঁড়ানো। পিছনে বিশাল স্টিকার— ‘এমএলএ’। মনে হল, এখন আবার কোন এমএলএ এলেন বাজার করতে!‌ তারপর মনে হল, জনপ্রতিনিধি কি আর এই করোনা–বাজারে নিজে বেরোবেন?‌ নিশ্চয়ই কোনও সাইডকিককে পাঠিয়েছেন কলাটা–মুলোটা তুলে আনার জন্য। দেখলাম, মাটিতে চুনের দাগ পাঁচ ফুট অন্তর অন্তর। সেখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে। মুখোশে মুখ–ঢাকা পুলিশকর্মী হাতের খেঁটে লাঠি তুলে দেখালেন, ওইখানে দাঁড়ান। দেখে মনে পড়ল, বেচাল দেখলে এই লাঠিই তো পড়ছে পিঠে এবং পশ্চাদ্দেশে। ফেসবুকে ভাইরাল ভিডিওয় দেখলাম। কিন্তু রিপোর্টারি করে এবং স্রেফ পেশার কারণে ফালতু প্রিভিলেজ পেতে পেতে জীবন গিয়েছে চলে ত্রিশ–ত্রিশ বছরের পার। সঙ্গে চলে গিয়েছে লাইনে দাঁড়ানোর অভ্যেস। মিনিটতিনেক ধৈর্য ছিল। তারপর মনে হল, এখন থাক। অফিসে গিয়ে শত্রুঘ্নকে বলব এনে দিতে। অফিস এখনও প্রায় ফাঁকা। সাফসুতরো হচ্ছে। স্যানিটাইজেশন চলছে। ইদানীং সময় পেলেই এই পুঁথি লেখায় বসে পড়ি। এখনও তেমনই বসেছি। আজ দুপুরে অশোক’দার মিটিং নেই। শুক্রবার থাকে না। রবিবার প্রকাশিতব্য ‘নেপথ্যভাষণ’ লেখেন। আমরা রসিকতা করে বলি, ‘জুম্মাবার’।

দুপুর ১.‌৫৭

অফিসের ব্যালকনিটা চমৎকার। হাওয়াবাতাস আসে। একা একা অনেকক্ষণ সময় কাটানো যায়। সামনে অনেকটা খোলা জমি। আগাছা হলেও সবুজের জঙ্গল। অনেকটা দূর পর্যন্ত খোলা আকাশ দেখা যায় উঁচু উঁচু বাড়ির মাথা ছাড়িয়ে। ‌দক্ষিণের জানালার মতো। কিছুক্ষণ আগে সেই ভাবনা–বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, আমাদের মতো এই বিশাল দেশে কি এই ঘোষণাটা কখনও কোনওদিন করা যাবে যে— ভারত সম্পূর্ণ করোনামুক্ত!‌ চিনের মতো দেশ হয়তো পারে। মুক্তি না পেলেও কঠোরভাবে একদলীয় শাসনাধীন চিন হয়তো খবরটাই বাইরে বেরোতে দেবে না!‌ ভারতের মতো এই বিশাল এবং গণতান্ত্রিক দেশে তো সেই বজ্র আঁটুনি নেই। কোনওদিন হবেও না। হতে পারে, শহর ঝুম মেরে যাওয়ায় প্রকৃতি জেগে উঠেছে। বাড়ির জানালায় এসে বসছে বসন্তবৌরি পাখি। এই সেদিন রাতে সাদার্ন অ্যাভিনিউ ধরে বাড়ি ফেরার সময় হেডলাইটের আলোয় দেখলাম, রাস্তায় একেবারে মাঝখানে বসে আছে একটা আস্ত লক্ষ্মীপ্যাঁচা। কিন্তু বাকি জীবনটা কি এই করোনা–আতঙ্কের ছায়ায় কাটাতে হবে?‌ যতদিন বাঁচব, ততদিন কাটাতে হবে সন্দিগ্ধ চোখে পাশের লোকগুলোর দিকে তাকিয়ে?‌ তারা কেউ হাঁচলে–কাশলে ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠতে হবে?‌ মানুষের ভিতর থেকে শয়তান আর ইতর বেরিয়ে আসবে?‌ করোনা–আক্রান্তদের চিকিৎসারত ডাক্তার–নার্সদের বাড়ি থেকে তাড়াবে বাড়িওয়ালা?‌ আবাসনে ঢুকতে দেওয়া হবে না বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালে কর্তব্যরত থাকার অপরাধে?‌ এই সোশ্যাল স্টিগমার সঙ্গে তাঁদের বসবাস করতে হবে আজীবন?‌ এই আমাদের ভবিষ্যৎ?‌ এই–ই কি আমাদের ভবিতব্য?

দুপুর ২.‌১৭

সনৎ এল। উস্কোখুস্কো চেহারা। প্রশ্ন করায় বলল, চারদিকের খবর পড়ে ওর স্ত্রী পাপড়ির প্যানিক অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে। কী করবে বুঝতে পারছে না। ডাক্তার নেই কোথাও। পাপড়ির মোবাইল থেকে যাবতীয় খবরের অ্যাপ ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। তাতেও কোনও কাজ হচ্ছে না। ওদের কয়েকদিন আগেই বলছিলাম, থ্যাঙ্ক গড এই পেশায় আছি। তাতে একদিকে যেমন বাড়িতে বসে বোর হতে হচ্ছে না। তেমনই সাংবাদিক হিসেবে এমন একটা লাইফটাইম এক্সপিরিয়েন্স হচ্ছে। এতদিন ব্যাপারটাকে সেই আলোতেই দেখার চেষ্টা করে এসেছি। যেমন দেখলাম একজন হোয়াট্‌সঅ্যাপ করেছে, ‘বাড়ির চিনির কৌটোয় ৯৩,৬৭৫টা চিনি আছে। কাল নুনটা গুনব। উফ, আমার দম ফেলার সময় নেই!’ ‌আরেকজন লিখেছে, ‘পাখার সুইচ বন্ধ করার পর ১ মিনিট ১৩ সেকেণ্ড পর্যন্ত পাখা ঘুরতে থাকে। আজই প্রথম লক্ষ্য করলাম।’ এসব দেখে–টেখে একটু হাসি আনার চেষ্টা করছিলাম। সনতের কথা শুনে করোনা–জীবনের আরেকটা দিক খুলে গেল। একটা অন্ধকার দিক। এটা কখনও ভেবে দেখিনি!‌

বিকেল ৫.৩৩

নিউজ পোর্টাল চেক করতে করতে ‌অনির্বাণ মজুমদার ঘোষণা করল, ‘ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও করোনা ভাইরাস পজেটিভ! ওর বান্ধবী আবার এখন অন্তঃসত্ত্বা!‌’‌ আমার কিউবিক্‌লের ডানপাশে রাখা টিভি–টা বলছে, সারা পৃথিবীতে মৃত্যুর সংখ্যা ২২,০০০ ছাড়িয়ে গিয়েছে। ধুঁকছে আমেরিকা। আক্রান্তের সংখ্যা ৮৫,০০০ ছাড়িয়েছে। নিউ ইয়র্কের সমস্ত হাসপাতালের মর্গ উপচে পড়ছে। উপায়ান্তর না দেখে রাস্তায় দাঁড় করানো ট্রাকে অস্থায়ী মর্গ বানাতে হয়েছে। সেই তুলনায় আপাতত ভারতে মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। আক্রান্ত ৮৬৩। সুস্থ হয়ে গিয়েছেন ৭৩ জন। জানি, ক্যালেণ্ডারে দিন বদলের আগে প্রথম দুটো সংখ্যা আরও বেড়ে যাবে। নয়াবাদের আক্রান্ত বৃদ্ধের পরিবারের নমুনা পরীক্ষায় পাঠানো হয়েছে। তিনি এখনও ভেন্টিলেশনে। সঙ্কটজনক। মাল্টি অর্গান ফেইলিওর হচ্ছে। আজ রাতটা কাটবে কিনা, কে জানে!‌

রাত ৮.‌৩২

এইমাত্র হেমন্ত এসে জানাল, নদিয়ার তেহট্টে একই পরিবারের পাঁচজনের দেহে করোনা ভাইরাস থাকার প্রমাণ মিলেছে!‌ তেহট্টের রিপোর্টার অমিতাভ আগেই জানিয়েছিল। এখন কলকাতার স্বাস্থ্যভবন থেকে সাগরিকাও কনফার্ম করছে। পরিবারের কোনও সদস্য নাকি সম্প্রতি দিল্লি থেকে ফিরেছিলেন। সারা রাজ্যে আক্রান্তের সংখ্যা এক ধাক্কায় ১০ থেকে বেড়ে হল ১৫। কেলেঙ্কারি!‌

রাত ৮.‌৫০

এবিপি আনন্দ তেহট্টের খবরটা ব্রেক করল এইমাত্র। বুঝতে পারছি, আতঙ্কের ঢেউ এবার আছড়ে পড়বে সারা রাজ্য জুড়ে। বিশ্বজিৎ বলছিল, ‘মহারাষ্ট্রের কোলাপুরে একই পরিবারের ২৩ জন সংক্রামিত হয়েছেন বলে এখনই একটা পোর্টালে পড়লাম।’ শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিল, এত করেও গণসংক্রমণ কি ঠেকানো গেল না?‌ অনির্বাণ বলছিল, ‘এ এক এমন লড়াই, যে বলা যাচ্ছে না এখন শুরু হল। বা এখন মাঝামাঝি। অথবা শেষ!‌’

নাহ্‌, আজ আর লিখতে ভাল লাগছে না।
‌‌‌

2 thoughts on “লকডাউন ডায়েরি – ২৭ মার্চ, ২০২০

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s